উত্তর কোরিয়ার কাছে ১০-০ গোলের হার। স্কোরলাইনটাই যেন বাংলাদেশের নারী ফুটবলের বর্তমান বাস্তবতার সবচেয়ে কঠিন ছবি। এশিয়ান গেমসের মতো বড় মঞ্চে এমন ব্যবধানের হার নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে কোচিং, কৌশল কিংবা একাদশ নিয়ে। তবে সংকটটা সম্ভবত আরও গভীরে।
বাংলাদেশের নারী ফুটবলে দীর্ঘদিনের বড় সমস্যা প্রতিযোগিতামূলক ঘরোয়া লিগের অভাব। প্রতিবছর লিগ আয়োজন হলেও তা খেলোয়াড়দের সারা বছর উচ্চমানের প্রতিযোগিতার মধ্যে রাখার মতো নিয়মিত ও শক্ত কাঠামো তৈরি করতে পারেনি। ফলে জাতীয় দলের প্রস্তুতি অনেকটাই ক্যাম্প আর আন্তর্জাতিক ম্যাচনির্ভর।
এতে জাতীয় দলে জায়গা পাওয়ার লড়াইটাও সীমিত হয়ে পড়ে। একজন খেলোয়াড়ের বিকল্প হিসেবে সমমানের আরেকজন নিয়মিত ম্যাচ খেলতে না পারলে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে কীভাবে?
নতুন খেলোয়াড় উঠে আসার প্রধান পথ অনূর্ধ্ব-১৭ ও অনূর্ধ্ব-২০ দল। কিন্তু সেখান থেকে সিনিয়র পর্যায়ে ওঠার পর নিজেদের প্রমাণ করার নিয়মিত মঞ্চ নেই। ফলে বয়সভিত্তিক দল থেকে জাতীয় দলে যাওয়ার মাঝের ধাপটিই দুর্বল থেকে যাচ্ছে।
শুধু খেলোয়াড় তৈরির কাঠামো নয়, প্রশ্ন আছে খেলোয়াড়দের জীবনযাপন নিয়েও।
বাফুফে ভবনে খেলোয়াড়দের আবাসন ও কক্ষের পরিবেশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্যের জন্য শুধু মাঠের অনুশীলন যথেষ্ট নয়। পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, বিশ্রাম, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগও একজন ফুটবলারের প্রস্তুতির অংশ।
একজন খেলোয়াড় কোথায় থাকছেন, কী খাচ্ছেন এবং অনুশীলনের পর কতটা ভালোভাবে পুনরুদ্ধার করতে পারছেন—এসবের ওপরও তার পারফরম্যান্স নির্ভর করে।
এই জায়গায় নিয়মিত ও কাঠামোবদ্ধ নারী লিগের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়। ১০ দলের একটি প্রতিযোগিতামূলক লিগ দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। ক্লাবগুলোতে জাতীয় দলের খেলোয়াড়ের সংখ্যা সীমিত করা হলে তরুণদের সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে জাতীয় দলের জন্য তৈরি হবে বড় খেলোয়াড় পুল।
আর্মি, পুলিশ ও বিকেএসপির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যে নারী ফুটবলার তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। তাদের কার্যক্রমকে একটি সমন্বিত উন্নয়ন কাঠামোর মধ্যে আনা গেলে বয়সভিত্তিক দল থেকে সিনিয়র পর্যায়ে খেলোয়াড় তুলে আনার প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হতে পারে।
জাতীয় দলের ক্যাম্পে এসে কয়েক সপ্তাহ অনুশীলনের চেয়ে সারা বছর ক্লাব ফুটবলে নিয়মিত ম্যাচ খেলার সুযোগ একজন খেলোয়াড়ের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ম্যাচের চাপ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বিভিন্ন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার অভিজ্ঞতা সেখানেই তৈরি হয়।
কোচিং কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন আছে। কোচদের লাইসেন্স পাওয়ার পর নিয়মিত মাঠে কাজ করা, উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেওয়া এবং নিজেদের দক্ষতা উন্নত করার সুযোগ কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে, সেটিও দেখা দরকার। খেলোয়াড় তৈরির পাশাপাশি কোচ তৈরির ধারাবাহিক ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের নারী ফুটবলের সমস্যা শুধু জাতীয় দলের একটি ম্যাচ বা একজন কোচকে ঘিরে নয়। স্কুল ও একাডেমি থেকে খেলোয়াড় উঠে আসবে, অনূর্ধ্ব-১৭ ও অনূর্ধ্ব-২০ পেরিয়ে নিয়মিত সিনিয়র ক্লাব ফুটবল খেলবে, সেখান থেকে জাতীয় দলে জায়গার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে—এমন একটি পূর্ণাঙ্গ পথ তৈরি করা দরকার।
উত্তর কোরিয়ার কাছে ১০-০ গোলের হার সেই দুর্বলতাগুলোই আবার সামনে এনেছে। কোচ বদলালে কৌশল বদলাতে পারে, একাদশেও পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু ঘরোয়া প্রতিযোগিতা, খেলোয়াড় তৈরির কাঠামো, কোচিং ব্যবস্থা ও জীবনযাপনের পরিবেশে পরিবর্তন না এলে এশিয়ার শীর্ষ দলগুলোর সঙ্গে ব্যবধান কমানো কঠিন।
তাই এখন শুধু পরের ম্যাচের প্রস্তুতি নয়, ভাবতে হবে পরের প্রজন্মের কথাও। বাংলাদেশের নারী ফুটবলের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তার ওপর।
সময়ের আলো/টিকে