অব্যবস্থাপনায় অস্তিত্ব সংকটে ঝিনাইদহের রেশম উন্নয়ন বোর্ড। একসময় প্রতি মৌসুমে প্রায় ৩ হাজার রেশম পোকার ডিম নিয়ে উৎপাদন কার্যক্রম চলত ঝিনাইদহের হলিধানী রেশম উন্নয়ন বোর্ডে। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছিল তুঁতবাগান, তিনটি ভবনে চলত রেশম পোকা পালন ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম। এখন সেই কর্মচাঞ্চল্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে। বর্তমানে মাত্র ২০০ ডিমের চাষ হচ্ছে। পরিত্যক্ত পড়ে আছে তুঁতবাগানের বড় একটি অংশ। অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে রেশম চাষের জন্য নির্মিত একাধিক ভবন। অব্যবস্থাপনা, তদারকির অভাব ও প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতার সংকটে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নেমে এসেছে সীমিত পর্যায়ে।
ঝিনাইদহ-চুয়াডাঙ্গা মহাসড়কের পাশে ৭২ বিঘা জমির ওপর ১৯৮৩ সালে গড়ে ওঠে হলিধানী রেশম উন্নয়ন বোর্ড। রেশম চাষ সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্য ছিল প্রতিষ্ঠানটির। মোট জমির মধ্যে ৫৪ বিঘা ছিল চাষযোগ্য। একসময় পুরো চাষযোগ্য জমিতেই ছিল রেশম পোকার প্রধান খাদ্য তুঁতগাছের বাগান। তুঁতপাতা সংগ্রহ করে রেশম পোকার খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
পরবর্তীতে রেশম বীজ উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হলে একই স্থানে ২০১৬ সালে রেশম বীজাগার কার্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে কমেছে রেশম চাষের পরিধি। বর্তমানে একটি ভবনে কোনোরকমে মৌসুমি রেশম পোকার চাষ চলছে। বাকি অবকাঠামোর অধিকাংশই ব্যবহার হচ্ছে না।
স্থানীয় কৃষক মিজান মিয়া বলেন, ‘সরকার যদি তুঁত চাষ ও রেশম পালনের জন্য কৃষকদের উৎসাহ দেয় এবং বাজারজাতের নিশ্চয়তা দেয়, তা হলে অনেকেই আবার এই চাষে ফিরতে চাইবেন। এতে পতিত জমি কাজে লাগবে, বাড়বে কর্মসংস্থান।’
স্থানীয় বাসিন্দা বজলুর রহমান বলেন, ‘এত বড় জায়গা ও অবকাঠামো থাকার পরও যদি কার্যক্রম সীমিত থাকে, তা হলে এটি সম্পদের অপচয়। পুরোনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া দরকার।’
আমিন হোসেন বলেন, ‘একসময় এই এলাকায় এলেই রেশম খামারের কর্মচাঞ্চল্য চোখে পড়ত। এখন অনেক জায়গা পড়ে আছে। নিয়মিত কার্যক্রম বাড়ানো গেলে প্রতিষ্ঠানটি আবারও আগের অবস্থানে ফিরতে পারে।’
স্থানীয় যুবক মনি মিয়া বলেন, ‘রেশম চাষ অনেক মানুষের আয়ের পথ তৈরি করতে পারে। সরকারি সহযোগিতা ও নিয়মিত তদারকি থাকলে তুঁতবাগান আবার গড়ে তোলা সম্ভব। একই সঙ্গে বাড়ানো সম্ভব রেশম পোকার ডিম ও সুতা উৎপাদন।’
সংশ্লিষ্টদের মতে, রেশম শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে পর্যাপ্ত তুঁতবাগান, উন্নত জাতের রেশম পোকার ডিম, আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পরিত্যক্ত বাগান পুনরায় চাষের আওতায় আনা এবং অব্যবহৃত ভবন সংস্কারের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। তবে প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে নতুন আশার কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আগে যেখানে ৮ জন শ্রমিক কাজ করতেন, সেখানে নতুন করে জনবল বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপনও জারি হয়েছে। নতুন কাঠামো অনুযায়ী নিয়মিত ১৮ জন শ্রমিক কাজ করার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে আগের মতো বড় পরিসরে রেশম চাষের আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ঝিনাইদহের হলিধানী রেশম উন্নয়ন বোর্ডের ফার্ম ম্যানেজার মো. স্বপন মিয়া বলেন, আগে এখানে অনেক বড় পরিসরে রেশম চাষ ও পলুপালন হতো। বর্তমানে কার্যক্রম সীমিত থাকলেও সরকার নতুনভাবে জনবল বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন জনবল যুক্ত হলে আগের মতো পরিসর বাড়িয়ে রেশম চাষের কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ৩৯৬ জন শ্রমিক ফার্মের বিভিন্ন কাজে যুক্ত থাকেন। নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে কার্যক্রম ও কর্মসংস্থান আরও বাড়বে।
সময়ের আলো/আতা