বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দায়ের করা রাজনৈতিক মামলা এখনও সব প্রত্যাহার না হওয়ায় ভোগান্তিতে রয়েছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। মামলা প্রত্যাহারের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেও প্রতিকার না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা।
তাদের ভাষ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মামলা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু হলেও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন-সংক্রান্ত মামলার বাইরে বিএনপি নেতাকর্মীদের মামলা প্রত্যাহারে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ফলে অনেক মামলা এখনও রয়ে গেছে। স্ব স্ব জেলায় আবেদন করেও সাড়া না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন তারা। জেলা পর্যায় থেকে মামলার নথি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে গড়িমসি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিএনপি সরকার গঠনের ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও সব রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
বিএনপির নয়াপল্টন দফতর সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের মামলা প্রত্যাহারের জন্য বর্তমান ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, সহ-দফতর সম্পাদক তারিকুল আলম তেনজিংসহ পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির তত্ত্বাবধানে ২০ হাজার মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে, অর্থাৎ ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত দায়ের করা রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার দুটি কমিটি গঠন করে। জেলা পর্যায়ে মামলা পর্যবেক্ষণের জন্য জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) নেতৃত্বে জেলা কমিটি গঠন করা হয়। মামলার তালিকা নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি একাধিক সভা করে। পরে মামলাগুলো নিষ্পত্তির জন্য চলতি বছরের ৫ মে জেলা প্রশাসককে সভাপতি করে আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়। তবে এ কমিটি এখন পর্যন্ত কোনো সভা করতে পারেনি বলে জানা গেছে।
দলীয় সূত্র জানায়, বর্তমানে মামলা প্রত্যাহারের জন্য জেলা পর্যায়ে নির্ধারিত ফর্ম পূরণ করে আবেদন করতে হচ্ছে। জেলা পর্যায়ের কমিটিতে ডিসি সভাপতি, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) সদস্য সচিব এবং পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) সদস্য হিসেবে রয়েছেন। এই কমিটির কাছে আবেদন জমা দেওয়ার পর তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর কথা। তবে ভুক্তভোগী নেতাকর্মীদের অভিযোগ, তারা মামলা প্রত্যাহারের আবেদন জমা দিলেও ডিসি কার্যালয় থেকে সেগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে জেলায় গিয়ে ডিসি বা এডিসির সাক্ষাৎও পাচ্ছেন না তারা। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে নির্যাতন ও মামলার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মীদের অনেকে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে ঢাকার নয়াপল্টন কার্যালয়ে এসে ধরনা দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিএনপির মামলা ও তথ্য সংরক্ষণ সমন্বয়ক এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মো. সালাউদ্দিন খান সময়ের আলোকে বলেন, জেলা প্রশাসনের দীর্ঘসূত্রতার কারণে মাঠপর্যায়ের ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মীরা মারাত্মক হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বিগত ১৭ বছরে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা রাজনৈতিক ও হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলাগুলো দ্রুত প্রত্যাহারের জন্য জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, চলতি মাসে জেলা প্রশাসনের ধীরগতির পদক্ষেপে ক্ষোভ প্রকাশ করে ডিসি, এসপি, পুলিশ কমিশনার ও পিপি এবং জেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের পৃথক চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে নির্যাতনের শিকার হয়ে পথে বসা নেতাকর্মীদের কেন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আসতে হবে? স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব তাদের আবেদনগুলো দ্রুত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো। এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে স্থানীয় প্রশাসন ও জেলার নেতাদের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সব জেলা ও মহানগর সভাপতি, আহ্বায়ক, সাধারণ সম্পাদক ও সদস্য সচিবদেরও চিঠি দিয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে তাদের অবিলম্বে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ সুপার ও পাবলিক প্রসিকিউটরদের সঙ্গে যোগাযোগ করে মামলা প্রত্যাহারের তালিকা ও সুপারিশ দ্রুত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইন-১ শাখায় পাঠানোর ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।
১ লাখ ৪২ হাজার মামলা : বিএনপি সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা রাজনৈতিকভাবে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল। কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধেও বিপুলসংখ্যক মামলা করা হয়।
দলীয় সূত্রে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, হাবিব উন নবী খান সোহেলের নামে ৪৫০টি, এস এম জাহাঙ্গীরের নামে ৩৫০টি, সুলতান সালাহউদ্দিন টুকুর নামে ৩১৫টি, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের নামে ২৫০টি, মীর সরফত আলী সপুর নামে ২৫০টি, রফিকুল আলম মজনুর নামে ২২৬টি, আনিসুর রহমান তালুকদারের নামে ২১১টি, মামুন হাসানের নামে ২০০টি, রুহুল কবির রিজভীর নামে ১৮০টি, এস এম জিলানীর নামে ১৭০টি, শিমুল বিশ্বাসের নামে ১৭৪টি, রাজীব আহসানের নামে ১৪৬টি, আকরামুল হাসানের নামে ১৪৬টি, আবদুল কাদির ভূঁইয়ার নামে ১৫০টি, সালাহউদ্দিন আহমেদের নামে ১৫০টি, তানভীর আহমেদ রবিনের নামে ১২৭টি, শহীদুল ইসলাম বাবুলের নামে ১১০টি, হাবিবুর রশীদের নামে ১০৩টি, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামে ৯৮টি, বজলুল করিম চৌধুরীর নামে ৯৫টি, আবদুস সালামের নামে ৮০টি, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর নামে ৫০টি এবং গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের নামে ৩৩টি মামলা ছিল। দলীয় সূত্রে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধেও একাধিক মামলার কথা বলা হয়েছে।
মো. সালাউদ্দিন খান বলেন, ২০০৭ থেকে ২০২৫ সালের ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মোট ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৮৩টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় প্রায় ৬৫ লাখ নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মামলা প্রত্যাহার ও নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া শুরু হলেও এখনও ২৭ হাজার মামলা বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। এসব মামলায় দলের ২২ লাখ নেতাকর্মী আসামি।
তিনি বলেন, মামলাগুলো নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট দফতরে একাধিকবার আবেদন করা হলেও তা আমলে নেওয়া হচ্ছে না। জেলা পর্যায় থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কাগজ পাঠাতে ধীরগতির কারণে অনেকে এখনও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। সারা দেশ থেকে নেতাকর্মীরা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এসে এসব মামলা শেষ করার জন্য চাপ দিচ্ছেন।
সালাউদ্দিন খান বলেন, চলতি মাসেও কয়েকজনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসনকে দ্রুত মামলা প্রত্যাহারের জন্য পদক্ষেপ নিতে কড়া চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে আদালতের বিচারকরা রাজনৈতিক মামলা সম্পর্কে অবগত হলে শুরুতেই তা খারিজ বা তুলে দিচ্ছেন বলেও তিনি দাবি করেন।
২০ হাজার মামলা প্রত্যাহার : বিএনপির সহ-দফতর সম্পাদক তারিকুল আলম তেনজিং সময়ের আলোকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে বিএনপি নেতাকর্মীদের ২০ হাজার মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এখনও কারও মামলা প্রত্যাহার বাকি থাকলে স্ব স্ব জেলার নেতৃবৃন্দ এবং পিপির সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। মামলা প্রত্যাহার হয়ে যাবে।
তিনি বলেন, অনেকের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও নারী নির্যাতন আইনে মামলা হয়েছে। সেসব মামলার বিষয়ে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
২০২৬ সালের জুনে সংসদে আইনমন্ত্রী জানান, ২৩ হাজার ৮৬৫টি মামলা প্রত্যাহার হয়েছে এবং বাকি মামলাগুলো প্রত্যাহারের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। ফলে সরকার পরিবর্তনের পরও পুরোনো মামলার কারণে বিএনপির অনেক নেতাকর্মীকে আদালত, জামিন ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সময়ের আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপিকে দমনের কৌশল হিসেবে ইচ্ছামতো মামলা দিয়েছে। এসব মিথ্যা মামলা নিষ্পত্তির জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে অনেক মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। দ্রুতই বাকি মামলাগুলোও নিষ্পত্তি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।