বর্ষা এলেই পদ্মের রঙে বদলে যায় সোনাকান্ত বিলের চেহারা। বিলজুড়ে সবুজ পদ্মপাতার ফাঁকে-ফাঁকে ফুটে থাকে গোলাপি-সাদা পদ্ম। সেই সৌন্দর্য দেখতে ছুটে আসেন দূর-দূরান্তের প্রকৃতিপ্রেমীরা। কেউ নৌকায় ঘোরেন, কেউ বিলের পানিতে নেমে ছবি তোলেন। কিন্তু এবার সেই চেনা দৃশ্য যেন স্মৃতিই হয়ে গেছে। বিলজুড়ে পদ্মপাতা আছে, আছে আগাছা ও সবুজের সমারোহ; কিন্তু নেই কাঙ্ক্ষিত সেই পদ্মফুল। শুরুতে কিছু ফুল ফুটলেও দর্শনার্থীদের ফুল ছেঁড়া ও প্রাকৃতিক নানা কারণে সেগুলো দ্রুতই হারিয়ে গেছে।
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার হাটিকুমরুল ইউনিয়নের আমডাঙ্গা গ্রামের পাশে সোনাকান্ত বিলের অবস্থান। প্রায় ৪০ বিঘা জমিজুড়ে বিস্তৃত এ বিলের জমিতে বছরে একবার বোরো ধান চাষ হয়। নিচু এলাকা হওয়ায় বর্ষায় ছয় মাসেরও বেশি সময় পানিতে ডুবে থাকে বিলটি। আর এই বর্ষাতেই প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেয় পদ্ম।
স্থানীয়দের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই সোনাকান্ত বিল পদ্মবিল হিসেবে পরিচিত। কয়েক বছর ধরে বর্ষা মৌসুমে এখানে প্রচুর পদ্মফুল ফুটে আসছে। পদ্মের সৌন্দর্যের কারণে বিলটির পরিচিতিও ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের জেলা পর্যন্ত। প্রতিবছর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পদ্মফুলে ভরা বিলের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে দর্শনার্থীদের আনাগোনাও বাড়ে। তবে এবার পদ্মফুল দেখতে এসে অনেকটা হতাশ হয়ে ফিরতে হচ্ছে তাদের।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিলের বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে ছড়িয়ে আছে পদ্মপাতা। কোথাও কোথাও রয়েছে পদ্মের শুকনো ডাঁটা ও আগাছা। কিন্তু চোখে পড়ার মতো পদ্মফুল নেই। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আগের বছরের ছবিতে দেখা যায়, একই বিল একসময় ফুলে ফুলে ভরা ছিল।
স্থানীয় বাসিন্দা আল মাহমুদ, রুবেল ও সোহেলসহ অনেকে জানান, বেশ কয়েক বছর ধরে বর্ষাকালে সোনাকান্ত বিল পদ্মফুলে ছেয়ে থাকে। পদ্মফুলের কারণে এলাকাটি পরিচিতি পেয়েছে। বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ এখানে ফুল দেখতে আসেন। কিন্তু অনেক দর্শনার্থী বিলের পানিতে নেমে ফুল ও কলি ছিঁড়ে নিয়ে যান। এতে অল্প সময়ে ফুটে থাকা ফুলগুলো শেষ হয়ে যায়। এবার শুরুতেই কিছু ফুল ফুটলেও দর্শনার্থীদের ফুল ছেঁড়ার কারণে সেগুলো দ্রুত কমে গেছে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক কারণেও এবার ফুলের পরিমাণ আগের তুলনায় কম ছিল।
সোনাকান্ত বিলে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী সুমাইয়া মেহজানিম জুই বলেন, ফেসবুকে সোনাকান্ত বিলের অনেক সুন্দর ছবি ও ভিডিও দেখেছি। চারদিকে শুধু পদ্ম আর পদ্ম— এমন দৃশ্য দেখেই বান্ধবীদের নিয়ে এখানে এসেছি। কিন্তু এসে দেখি পদ্মপাতা আছে, ফুল নেই। আমরা ভেবেছিলাম বিলের মধ্যে গিয়ে পদ্মফুলের সঙ্গে ছবি তুলব, ঘুরব; কিন্তু সেই সুযোগই হলো না। আগের বছরের ছবির সঙ্গে এখনকার দৃশ্যের কোনো মিল নেই। ফুলগুলো যদি না ছেঁড়া হতো এবং সবাই একটু সচেতন থাকত, তাহলে হয়তো আরও কিছুদিন এই সৌন্দর্য উপভোগ করা যেত।
স্থানীয়রা বলছেন, পদ্মফুলের সৌন্দর্য দেখতে আসা মানুষের আগ্রহ যেমন বিলটিকে পরিচিত করেছে, তেমনি অসচেতন আচরণই সেই সৌন্দর্য দ্রুত নষ্ট করছে। অনেকেই ফুলের সঙ্গে ছবি তুলতে গিয়ে ফুল ও কলি ছিঁড়ে ফেলেন। কেউ কেউ পদ্মপাতা ও গাছের ওপরও পা দেন। এতে পরবর্তী সময়ে ফুল ফোটার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
তাদের দাবি, সোনাকান্ত বিলকে দর্শনীয় স্থান হিসেবে ধরে রাখতে হলে প্রথমেই পদ্ম ও বিলের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করতে হবে। দর্শনার্থীদের ফুল না ছেঁড়া এবং বিলের জলজ উদ্ভিদের ক্ষতি না করার বিষয়ে সচেতন করা প্রয়োজন।
উল্লাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুবর্ণা ইয়াসমিন সুমি বলেন, পদ্ম একটি জলজ উদ্ভিদ। পাখির মাধ্যমে পদ্মের বীজ বিভিন্ন জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেখান থেকে গাছের বিস্তৃতি ঘটে। অনুকূল পরিবেশ পেলে বিলজুড়ে পদ্মের বিস্তার হয়। সোনাকান্ত বিলেও পদ্মের বিস্তৃতি প্রাকৃতিকভাবেই হয়েছে। এ ধরনের জলজ উদ্ভিদ ও এর পরিবেশ রক্ষা করা গেলে ভবিষ্যতে আবারও বিলটি পদ্মফুলে ভরে উঠতে পারে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রায়হানুল ইসলাম বলেন, বিলের সৌন্দর্য রক্ষায় বিষয়টি যাচাই করে দেখা হবে। বিলের সৌন্দর্য ও জলজ পরিবেশ যাতে নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সময়ের আলো/আতা