লেবাননের সেনাবাহিনীকে বাড়তি দায়িত্ব পালনে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন বলে জানিয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনী। তবে আন্তর্জাতিক সহায়তার উদ্যোগে এখন পর্যন্ত বড় কোনো আর্থিক প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি। সেনাবাহিনীকে দেশজুড়ে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং হিজবুল্লাহর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের হাতে নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
মিডল ইস্ট আইয়ের যাচাই করা নথি ও লেবাননের সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তাদের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে।
২০২৪ সালের নভেম্বরে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতির প্রায় দুই বছর পর সেনাবাহিনীর দায়িত্ব ও আন্তর্জাতিক সহায়তার মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন ইউনিফিলের মেয়াদ ২০২৬ সালের শেষ দিকে শেষ হওয়ার কথা। এর আগে দক্ষিণ লেবাননে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব বাড়ানোর পাশাপাশি ইউনিফিলের কিছু দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে সেনাবাহিনী।
সেনাবাহিনীকে সহায়তার জন্য ফ্রান্সের উদ্যোগে গত ১৭ সেপ্টেম্বর প্যারিসে ১৭টি দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি প্রস্তুতিমূলক বৈঠক হয়। সেখানে লেবাননের সেনাবাহিনী ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীকে সহায়তা এবং ইউনিফিলের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দক্ষিণ লেবাননের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়।
তবে বৈঠকে বড় কোনো আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি বা পূর্ণাঙ্গ দাতা সম্মেলনের সময়সূচি নির্ধারণ হয়নি বলে লেবাননের একজন জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন। দেশটির একজন সামরিক কর্মকর্তাও বৈঠক থেকে ‘বাস্তব কোনো সহায়তা’ পাওয়া যায়নি বলে মন্তব্য করেছেন। জর্ডান কিছু সহায়তা দিয়েছে, তবে তা তুলনামূলকভাবে সীমিত বলে লেবাননের সামরিক প্রতিনিধিরা মনে করছেন।
৩ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা
ফেব্রুয়ারিতে কায়রোতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রস্তুতিমূলক সম্মেলনের জন্য লেবাননের সেনাবাহিনী ২১ পৃষ্ঠার একটি পরিকল্পনা তৈরি করে। এতে বাহিনীর পাঁচ বছরের কর্মসূচি তুলে ধরা হয়।
পরিকল্পনায় বলা হয়, অর্থনৈতিক সংকট, প্রতিরক্ষা বাজেট কমে যাওয়া, বিদেশি সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা, দাতাদের সহায়তা কমে যাওয়া, সীমান্তে হামলা, সন্ত্রাসবাদ এবং লেবাননে আন্তর্জাতিক উপস্থিতি কমে যাওয়ার সম্ভাব্য প্রভাব—সব মিলিয়ে সেনাবাহিনী একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
সেনাবাহিনীর দায়িত্বের মধ্যে সীমান্ত পরিচালনা, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, নিরস্ত্রীকরণ, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এতগুলো দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করাকে সেনাবাহিনী ‘মিশন ওভারস্ট্রেচ’ বা অতিরিক্ত দায়িত্বের সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
পরিকল্পনায় চারটি কৌশলগত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলো হলো রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার, সেনাবাহিনী পুনর্গঠন ও আধুনিকায়ন, জাতীয় সক্ষমতা ও সংকট মোকাবিলা শক্তিশালী করা এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন।
স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি কর্মসূচিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে দক্ষিণ লেবাননকে। সেখানে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা, ইউনিফিলের কিছু অতিরিক্ত দায়িত্ব গ্রহণ, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং ইউনিফিলের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সীমান্ত প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া সিরিয়ার সঙ্গে লেবাননের সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার দায়িত্ব সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
এসব অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে মোট প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন বলে সেনাবাহিনীর নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধ সক্ষমতা বাড়াতে ১ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলার, গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা উন্নয়নে ৬৫৪ মিলিয়ন, বেতন ও প্রণোদনায় ৩৬৪ মিলিয়ন, ইউনিফিলের সামুদ্রিক টাস্কফোর্স-সংক্রান্ত দায়িত্ব গ্রহণে ৩৩৪ মিলিয়ন, সিরিয়া সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে ১৯৩ মিলিয়ন এবং ইউনিফিলের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সীমান্ত প্রতিরক্ষায় ১৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে।
হিজবুল্লাহ ইস্যুতে আন্তর্জাতিক চাপ
সেনাবাহিনীর পরিকল্পনায় ‘অস্ত্রের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ অস্ত্রের ব্যবহার শুধু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের সঙ্গে হিজবুল্লাহর অস্ত্রের বিষয়টি সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে।
২০২৪ সালের নভেম্বরের যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে দক্ষিণ লিতানি নদীর দক্ষিণাঞ্চলে শুধু লেবাননের সরকারি বাহিনীর অস্ত্র বহনের কথা বলা হয়েছিল। চুক্তির আওতায় ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহারের পাশাপাশি ওই এলাকায় লেবাননের সেনাবাহিনী মোতায়েনের কথা ছিল।
২০২৫ সালের আগস্টে লেবাননের সরকার রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব বাড়ানো এবং অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে নেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব সেনাবাহিনীকে দেয়।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সেনাবাহিনী জানায়, দক্ষিণ লিতানি এলাকায় পরিকল্পনার প্রথম ধাপের লক্ষ্যগুলো তারা অর্জন করেছে। তবে ইসরায়েলের দখলে থাকা এলাকা ও অবস্থানগুলো তাদের মূল্যায়নের বাইরে রাখা হয়। অবিস্ফোরিত অস্ত্র, সুড়ঙ্গ এবং অন্যান্য সমস্যা এখনো রয়ে গেছে বলেও সেনাবাহিনী জানায়।
এর পরবর্তী ধাপে লিতানির উত্তরে এবং শেষ পর্যন্ত পুরো দেশে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। এর জন্য প্রয়োজন আরও বেশি অর্থ ও সক্ষমতা। তবে একই সময়ে আন্তর্জাতিক দাতারা লেবাননের রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনী হিজবুল্লাহর অস্ত্রের বিষয়ে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
আন্তর্জাতিক সহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা
ফেব্রুয়ারির কায়রো বৈঠকের পর মার্চে প্যারিসে একটি উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়ন লেবাননের সেনাবাহিনীকে মূলত সরঞ্জাম ও রসদ সরবরাহের জন্য ১০ কোটি ইউরো দেওয়ার কথা জানিয়েছিল।
তবে মার্চের শুরুতে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জানান, সম্মেলনটি স্থগিত করা হয়েছে। এর পরদিন হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের দিকে রকেট ছোড়ার পর লেবানন সরকার সরকারি প্রতিষ্ঠানের বাইরে হিজবুল্লাহর সামরিক ও নিরাপত্তা তৎপরতা নিষিদ্ধ করে এবং লিতানি নদীর উত্তরে নিরস্ত্রীকরণ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেয়।
এরপর নতুন করে শুরু হওয়া যুদ্ধ সম্মেলনের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি বদলে দেয়। সেনাবাহিনীর ওপর দায়িত্ব বাড়লেও আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যায়। সেপ্টেম্বরের প্যারিস বৈঠক সেই প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ ছিল।
তবে লেবাননের জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তার ভাষ্য, ওই বৈঠকে সেনাবাহিনীর চাওয়া সম্পদের জন্য কোনো প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি। পূর্ণাঙ্গ দাতা সম্মেলন কবে হবে, সে বিষয়েও কোনো সময়সূচি নির্ধারণ হয়নি।
লেবাননের ওই কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবসহ গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের উপস্থিতি বৈঠকের ইতিবাচক দিকগুলোর একটি। তবে তাৎক্ষণিক কোনো আর্থিক প্রতিশ্রুতি বা মূল সম্মেলনের সময়সূচি নির্ধারণ হয়নি।
লেবাননের একজন সামরিক কর্মকর্তা বলেন, ফ্রান্স দেশটিতে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ধরে রাখতে এবং সেনাবাহিনীকে সহায়তা করতে আগ্রহী। তবে বেশি আর্থিক সক্ষমতাসম্পন্ন দেশগুলো এখনো সহায়তা দিতে অনিচ্ছুক।
সময়ের আলো/কেএইচ