ইসরায়েলের নির্বাচন ঘিরে গাজায় বাড়ছে ভয়

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

গাজায় যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি আর অনিশ্চয়তার মধ্যেই ঘনিয়ে আসছে ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচন। আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলিরা ভোট দিয়ে নতুন সরকার নির্বাচন

2026-09-24T18:43:00+00:00
2026-09-24T18:43:00+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৯ আশ্বিন ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ইসরায়েলের নির্বাচন ঘিরে গাজায় বাড়ছে ভয়
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৪৩ পিএম 
গাজা শহরে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি তাঁবু শিবির। ছবি : সংগৃহীত
গাজায় যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি আর অনিশ্চয়তার মধ্যেই ঘনিয়ে আসছে ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচন। আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলিরা ভোট দিয়ে নতুন সরকার নির্বাচন করবেন। এই ভোটে সরাসরি কোনো অংশগ্রহণের সুযোগ নেই গাজা ও দখলকৃত পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের। তবু নির্বাচনি প্রচারণা গভীরভাবে অনুসরণ করছেন তারা। কারণ, যে সরকার ক্ষমতায় আসবে, গাজা নিয়ে তাদের নীতি সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে সেখানকার মানুষের জীবন ও ভবিষ্যতে।

গাজায় প্রায় তিন বছর ধরে যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতির মধ্যে বসবাস করছেন মানুষ। ৩০ বছর বয়সি মরিয়ম আল-দাবালা যুদ্ধের সময় প্রায় ১৪ বার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ- নতুন ইসরায়েলি সরকারও কি বর্তমান সরকারের মতোই গাজা নিয়ে একই নীতি অনুসরণ করবে?

মরিয়ম বলেন, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট আবার ক্ষমতায় এলে গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের জোর করে সরিয়ে দেওয়ার নীতি অব্যাহত থাকতে পারে- এটাই তার বড় ভয়। তার আশঙ্কা, গাজার বাইরে ফিলিস্তিনিদের স্থানান্তরের চেষ্টা আরও জোরালো হতে পারে।


তবে শুধু নেতানিয়াহু নয়, নির্বাচনে এগিয়ে থাকা গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন দল জিতলেও গাজাবাসীর জীবন খুব বেশি বদলাবে বলে মনে করছেন না অনেকে। ইসরায়েলের আগের সরকারের অংশ ছিলেন আইজেনকট। পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতির পক্ষে তার অবস্থান এবং দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বিরোধিতার কারণে ফিলিস্তিনিদের একটি অংশ তার ওপরও আস্থা রাখতে পারছেন না।

মরিয়মের কাছে সম্ভাব্য সরকার পরিবর্তনের অর্থ শুধু রাজনৈতিক হিসাব নয়; এটি খাবার, ওষুধ, আশ্রয় আর নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন, গাজায় এখনো ওষুধ, খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট রয়েছে। যে তাঁবুতে তারা থাকেন, সেগুলোও ঠান্ডা বা হামলা থেকে যথেষ্ট সুরক্ষা দিতে পারে না।

সরকার বদলালেও মূলনীতি বদলাবে না  

গাজা সিটির নিজ বাড়িতে বোমা হামলায় পরিবারের নয় সদস্য নিহত হওয়ার পর ৬৫ বছর বয়সী ওসামা আল-আরবাই যুদ্ধের মধ্যে এক ডজনের বেশি বার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এখন একটি স্কুলের অস্থায়ী আশ্রয়ে থাকেন তিনি।

ইসরায়েলের নির্বাচনে যে দলই জিতুক, গাজার পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন হবে- এমন আশা করেন না ওসামা। তার মতে, সরকারের নীতি, সীমারেখা ও কিছু সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আসতে পারে; কিন্তু মূল অবস্থান খুব বেশি বদলাবে না।

বর্তমানে তার কোনো আয় নেই। তাই নির্বাচন নিয়ে তার আগ্রহ মূলত খাবারের দাম, জীবনযাত্রা ও কাজের সুযোগ নিয়ে। তিনি বলেন, গাজায় খাবার এখনো অপ্রতুল ও ব্যয়বহুল। টমেটোর এক বাক্সের দাম কখনো ২০ থেকে ৫০ শেকেল পর্যন্ত হয়, অথচ তার হাতে কখনো দুই শেকেলও থাকে না।

তারপরও গাজা ছাড়ার কথা ভাবছেন না ওসামা। তার ভাষায়, যা-ই ঘটুক, তিনি এখানেই থাকবেন।

‘আমরাও মানুষ’ 

গাজার উত্তরের শেখ জায়েদ এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত ৫৯ বছর বয়সি উম্মে মোহাম্মদ খলিলও ইসরায়েলের নির্বাচন নিয়ে আশাবাদী নন। জীবনে একাধিক ইসরায়েলি সরকার দেখেছেন তিনি। কিন্তু গাজার মানুষের জীবনে বড় কোনো পরিবর্তন দেখেননি বলে তর দাবি।

১৯ জন পরিবারের সদস্যের দায়িত্ব তাঁর ওপর। তার ছেলে ও জামাতা নিখোঁজ। এখন তার সবচেয়ে বড় ভয়- আবারও গাজায় সহিংসতা বেড়ে যাবে কি না। মাথার ওপর প্রায় সারাক্ষণ ড্রোনের শব্দ তাঁদের আতঙ্কিত করে।

ইসরায়েলি ভোটারদের উদ্দেশে তার সরল বার্তা- ফিলিস্তিনিদের মানুষ হিসেবে দেখতে হবে।

‘আমরাও মানুষ। আপনাদের মতো আমাদেরও জীবন আছে। আমাদের প্রতি দয়া করুন। আর যুদ্ধ নয়, আর গাজায় যা ঘটছে তা নয়’, তিনি বলেন।

নেতানিয়াহু আবার ক্ষমতায় ফিরলে হত্যাকাণ্ড, ধ্বংস ও বাস্তুচ্যুতি আরও বাড়তে পারে- এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করেন তিনি। তার প্রশ্ন, আর কত মৃত্যু, আর কত ধ্বংস, আর কত খাবার-পানির সংকট সহ্য করতে হবে?
 
নির্বাচনের কেন্দ্রে গাজা

গাজা যুদ্ধ ইসরায়েলের নির্বাচনি প্রচারের অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছে। ইসরায়েল বিষয়ক বিশ্লেষক আহেদ ফারাওয়ানে বলেন, নির্বাচন এখনো অনিশ্চিত। সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোতে ক্ষমতাসীন জোট কিংবা বিরোধী পক্ষ- কেউই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পাবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।

তার মতে, নির্বাচনের এক মাস আগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হয়েছে। গাজা যুদ্ধ ও ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতির বিষয় প্রচারের কেন্দ্রে রয়েছে। পাশাপাশি পশ্চিম তীরের সহিংসতা, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধ, অর্থনীতি এবং অতিধর্মীয় ইহুদিদের সামরিক দায়িত্ব নিয়ে বিতর্কও নির্বাচনি প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ফারাওয়ানে বলেন, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হলে ডানপন্থী ও আরও কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর সমর্থন নিয়ে গাজা নিয়ে বর্তমান নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ডানপন্থী রাজনীতিকদের মধ্যে গাজায় ভবিষ্যৎ সামরিক অভিযান ও বাস্তুচ্যুতি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত আছে।

অন্যদিকে বিরোধী নেতৃত্বাধীন সরকার আন্তর্জাতিক চাপের প্রতি কিছুটা বেশি সাড়া দিতে পারে বলে মনে করেন তিনি। এতে গাজা ও পশ্চিম তীর নিয়ে কিছু নীতিগত পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এমন সরকারকেও ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির চাপের মুখে পড়তে হবে।

ভোটের ফলের চেয়ে বড় প্রশ্ন

গাজার মানুষের কাছে তাই ইসরায়েলের নির্বাচনের প্রশ্নটি কে জিতবে, তার চেয়েও বড়- নতুন সরকার যুদ্ধের গতিপথ বদলাবে কি না।

যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও গাজায় সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি। আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০ অক্টোবর থেকে অন্তত ১ হাজার ৩৯৯ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৪ হাজার ৮৬৩ জন আহত হয়েছেন। যুদ্ধের কোনো না কোনো সময়ে গাজার প্রায় পুরো জনসংখ্যাই বাস্তুচ্যুত হয়েছে; অনেকে এখনো তাঁবু ও অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছেন।

এই বাস্তবতায় গাজার বাসিন্দাদের চোখে ইসরায়েলের নির্বাচন কেবল আরেকটি রাজনৈতিক ভোট নয়। তাদের কাছে এটি খাবার, ওষুধ, আশ্রয়, নিরাপত্তা, ঘরে ফেরার সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ বেঁচে থাকার প্রশ্ন।

মরিয়ম আল-দাবালা, ওসামা আল-আরবাই কিংবা উম্মে মোহাম্মদ খলিল- তিনজনের কথাতেই তাই একই ভয় ফিরে আসে: নির্বাচন শেষে ক্ষমতার পালাবদল হলেও গাজার মানুষের জীবনে যুদ্ধের ছায়া কি কাটবে?

সময়ের আলো/জেডি 
  বিষয়:   ইসরায়েল  নির্বাচন  গাজা  ভয় 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: