গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মিনাবের শাজারাহ তাইয়েবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে দুটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। ওই দিনই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরু হয়েছিল।
হামলায় ১৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। নিহতদের মধ্যে অন্তত ১২৩ জন ছিল শিশু। যে জায়গায় স্কুলটি তৈরি করা হয়েছিল, সেখানে আগে একটি সামরিক স্থাপনা ছিল।
ইরান এই হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে। জাতিসংঘও পরে জানায়, এই হামলা যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এখনো প্রকাশ্যে এই হামলার দায় স্বীকার করেনি।
ব্লুমবার্গের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেন্টাগন মনে করছে পুরোনো টার্গেটিং তথ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং পর্যাপ্ত মানবিক নজরদারির অভাব এই প্রাণঘাতী ভুলের পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
শিশু নিহতের সংখ্যার দিক থেকে মিনাবের এই হামলাকে ২১ শতকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সামরিক টার্গেটিং ভুল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
একের পর এক ভুল
ব্লুমবার্গের সঙ্গে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলা দুই ডজনের বেশি বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পেন্টাগনের কিছু কর্মকর্তা বুঝতে পেরেছিলেন যে একাধিক প্রতিরোধযোগ্য ভুলের কারণে এই বেসামরিক বিপর্যয় ঘটেছে।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর বড় ধরনের বিমান হামলার নির্দেশ দেয়। কর্মকর্তাদের মতে, দ্রুত হামলা চালানোর তাগিদে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু চূড়ান্ত করার জন্য খুব কম সময় পাওয়া যায়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় পুরোনো গোয়েন্দা তথ্য, বেসামরিক হতাহত কমানোর কাজে নিয়োজিত দলের সদস্যসংখ্যা কমে যাওয়া এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের এক হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। এর মধ্যে মিনাবের স্কুলটিও ছিল।
স্কুলটি যে এলাকায় নির্মিত হয়েছিল, সেটিকে বহু বছর ধরে মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্যভান্ডারে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির একটি স্থাপনা হিসেবে চিহ্নিত করা ছিল।
কিন্তু তদন্তে যুক্ত কর্মকর্তারা দেখতে পান, জায়গাটিতে বহু বছর আগেই পরিবর্তন আনা হয়েছিল। উপগ্রহের ছবিতেও নতুন নির্মাণকাজের প্রমাণ দেখা যায়।
স্কুলে পরিণত হওয়ার তথ্য ছিল
বাণিজ্যিকভাবে পাওয়া উপগ্রহের ছবিতে দেখা যায়, ২০১৭ সালের মধ্যেই স্কুলের জায়গাটি সামরিক স্থাপনা থেকে আলাদা করতে দেয়াল ও প্রবেশপথ তৈরি করা হয়েছিল।
২০১৮ সালের একটি ছবিতে দেখা যায় রঙিন দেয়াল, ফুটবল খেলার মাঠ, শিক্ষার্থীদের সমাবেশের জায়গা এবং শিশুদের খেলাধুলার জন্য মাঠে বিভিন্ন চিহ্ন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালেই কিছু মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষক জায়গাটির পরিবর্তনের বিষয়টি লক্ষ্য করেছিলেন। তারা একটি আলাদা তথ্যব্যবস্থায় এসব তথ্য নথিভুক্তও করেছিলেন।
কিন্তু ওই তথ্য মূল সামরিক গোয়েন্দা ডেটাবেসের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। ফলে টার্গেট নির্ধারণে ব্যবহৃত প্রধান ডেটাবেসে মিনাবের জায়গাটি আগের মতোই আইআরজিসির স্থাপনা হিসেবে দেখানো হচ্ছিল।
এর আগে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, টার্গেট নির্ধারণের সময় এমন উপগ্রহের ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল, যা সাত বছর পুরোনো এবং সেখানে স্কুলটির অস্তিত্ব দেখা যায়নি।
পেন্টাগনের তদন্তে এখন মূল প্রশ্নগুলোর একটি হলো— স্কুলে রূপান্তরের তথ্য থাকা সত্ত্বেও জায়গাটির পুরোনো শ্রেণিবিন্যাস কেন সংশোধন করা হয়নি।
‘কিলার এআই’ নিয়ে প্রশ্ন
হামলার সময় যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকমের কর্মকর্তারা ম্যাভেন স্মার্ট সিস্টেম নামের এআই প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্যালান্টির টেকনোলজিসের তৈরি এই এআই-ভিত্তিক সিস্টেম ১৫০টির বেশি ধরনের তথ্য একত্র করে সামরিক কমান্ডারদের সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। টার্গেট নির্বাচন থেকে শুরু করে সামরিক অভিযান পরিচালনার বিভিন্ন পর্যায়েও এটি ব্যবহার করা হয়।
ট্রাম্প আবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ ম্যাভেনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে শুরু করেছে। ফলে এটি মার্কিন সামরিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রযুক্তিতে পরিণত হয়েছে।
কর্মকর্তাদের কেউ কেউ ধারণা করেছিলেন, এআই সিস্টেমটি পুরোনো তথ্য বা গোয়েন্দা তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি শনাক্ত করে সতর্ক করবে। তবে কেন এমন প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তা এখনও পরিষ্কার নয়।
প্যালান্টিরের এক মুখপাত্র ব্লুমবার্গকে বলেছেন, ব্যবহৃত তথ্যের মান বা গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি শনাক্ত করার দায়িত্ব তাদের প্রতিষ্ঠানের নয়। মিনাব হামলায় তাদের সফটওয়্যার দায়ী— এমন প্রমাণও নেই বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে হামলার পর ম্যাভেনের সক্ষমতায় পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এখন সিস্টেমটি কোনো লক্ষ্যবস্তুকে অযোগ্য করে দিতে পারে এমন তথ্য আছে কি না, তা আবার যাচাই এবং তথ্যের অসঙ্গতি বা ভুল শনাক্ত করার জন্য আরও পর্যালোচনা করতে পারে।
কীভাবে কাজ করে ‘কিল চেইন’
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর আগে মার্কিন সামরিক বাহিনী এমন লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করছিল, যেগুলোতে হামলা চালালে ইরানের সামরিক সক্ষমতা দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
এ ধরনের লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে আইআরজিসির নৌবাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোও ছিল। এই বাহিনী পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সামরিক বাহিনীতে কোনো লক্ষ্যবস্তুতে হামলার অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়াকে ‘কিল চেইন’ বলা হয়।
আগে এই প্রক্রিয়ায় গোয়েন্দা বিশ্লেষক, উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষক, টার্গেট বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, সামরিক কমান্ডার এবং অস্ত্র পরিচালনাকারী সদস্য— অনেক মানুষ যুক্ত থাকতেন।
কিন্তু বর্তমানে এই প্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে ম্যাভেনের মতো এআই ব্যবস্থার ভূমিকা বেড়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, আগে যে কাজ করতে কয়েক ঘণ্টা লাগত, এআই ব্যবহারের ফলে তা কয়েক মিনিটে করা সম্ভব হচ্ছে।
কেন মিনাবের স্কুলকে টার্গেট করা হয়েছিল?
মিনাব তেহরান থেকে প্রায় ৮০০ মাইল দক্ষিণে এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি অবস্থিত। শহরটির জনসংখ্যা প্রায় ৭৬ হাজার। আবাসিক এলাকার পাশাপাশি সেখানে বিভিন্ন সামরিক স্থাপনাও রয়েছে।
আইআরজিসির এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র, নৌ ও সামরিক সরবরাহ-সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি স্থাপনা রয়েছে।
শাজারাহ তাইয়েবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রায় এক দশক আগে এমন একটি জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছিল, যেখানে আগে আইআরজিসির একটি নৌ ইউনিট ছিল।
পুরোনো তথ্যের কারণে জায়গাটিকে আইআরজিসির স্থাপনা হিসেবে চিহ্নিত করা অবস্থায় সেটি ম্যাভেন সিস্টেমে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় যুক্ত হয়। পরে কর্মকর্তাদের মতে, এটি যুদ্ধের প্রথম দিনের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় উঠে আসে।
তবে হামলার আগে পর্যাপ্ত মানবিক যাচাই হলে এই বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব ছিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বেসামরিক হতাহত কমানোর ব্যবস্থা ছিল দুর্বল
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ পেন্টাগনের বেসামরিক হতাহত কমানোর ইউনিটগুলোর বড় অংশ ভেঙে দিয়েছেন। এতে সংশ্লিষ্ট কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৯০ শতাংশ কমে ২০ জনেরও নিচে নেমে এসেছে।
সেন্টকমে আগে এই ধরনের কাজে ১০ জন সদস্য থাকলেও পরে সংখ্যা কমে মাত্র একজনে দাঁড়ায়।
কর্মকর্তাদের মতে, হামলার আগে মিনাবের স্কুলটি কোনো বেসামরিক হতাহত প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ পর্যালোচনা করেননি।
এ ধরনের পর্যালোচনা বাধ্যতামূলক ছিল না। তবে কর্মকর্তারা মনে করেন, এটি করা হলে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি কমানো যেত।
পেন্টাগনের সাবেক বিশেষ আইনজীবী লরি ব্ল্যাঙ্ক বলেন, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে যখন কোনো হামলা আগে থেকেই পরিকল্পিত থাকে এবং তাৎক্ষণিক আত্মরক্ষার প্রতিক্রিয়া হিসেবে পরিচালিত হয় না, তখন লক্ষ্যবস্তু আরও সতর্কভাবে যাচাই করার সুযোগ থাকে।
দায় নিয়ে এখনও প্রশ্ন
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক তদন্তে বলা হয়েছে, মিনাবের হামলাসহ ওই দিন ইরানে চালানো আরেকটি মার্কিন হামলা যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো যুক্তিসংগত ভিত্তি রয়েছে।
তদন্তে বলা হয়, স্কুলটি সামরিক লক্ষ্য কি না, তা নিশ্চিত করতে সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্র যথাযথভাবে পালন করেনি। জাতিসংঘের মতে, এই ব্যর্থতা শুধু অবহেলার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনো প্রকাশ্যে হামলার দায় স্বীকার করেনি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এর আগে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ঘটনাটির জন্য ইরান দায়ী হতে পারে।
গত ১৪ জুলাই ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ওই ঘটনায় আসলে কী ঘটেছিল, তা হয়তো কখনোই নিশ্চিতভাবে জানা যাবে না।
এর আগে ১২ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের ১২০ জনের বেশি ডেমোক্র্যাট সদস্য প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথকে চিঠি দিয়ে জানতে চেয়েছিলেন, মিনাবের স্কুলকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করতে ম্যাভেনসহ এআই প্রযুক্তি কী ভূমিকা রেখেছিল। চলমান তদন্তের কারণ দেখিয়ে পেন্টাগন এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো জবাব দেয়নি।
তদন্তের সঙ্গে পরিচিত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্ত কার্যত কয়েক মাস আগেই শেষ হয়েছে। তবে প্রতিবেদনটি এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
সেন্টকমের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার মে মাসে কংগ্রেসকে জানিয়েছিলেন, তিনি তদন্তের বিষয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে তদন্ত প্রতিবেদনে ঠিক কতটা তথ্য থাকবে এবং এর কতটুকু সাধারণ মানুষের জন্য প্রকাশ করা হবে, তা এখনও পরিষ্কার নয়।
পেন্টাগনের এক মুখপাত্র ব্লুমবার্গকে জানিয়েছেন, তদন্ত এখনও চলমান রয়েছে। এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি। হোয়াইট হাউস কখন জানতে পেরেছিল যে হামলাটি ভুল ছিল— এ প্রশ্নের জবাবে প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা চলমান তদন্তের কথা উল্লেখ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় না।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ