কয়েক মিলিমিটার এদিক-ওদিক হলেই হয়তো আজ বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়ার গল্পটা অন্যরকম হতো। প্রায় দুই দশক আগে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। চারটি গুলি লেগেছিল তার শরীরে। এরপর তিন দিন কোমায় ছিলেন, কয়েক মাস কাটাতে হয়েছিল হাসপাতালে। সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতাও থামাতে পারেনি ফুটবলের প্রতি তার ভালোবাসা।
ফিফার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে জীবনের সেই কঠিন সময়ের কথা স্মরণ করেছেন জামাল। তখন তিনি কোপেনহেগেনে বেড়ে উঠছিলেন এবং এফসি কোপেনহেগেনের যুব দলে নিয়মিত খেলছিলেন। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে পিঠে ব্যাগ নিয়ে হাঁটার সময় এক ব্যক্তি তাদের সরে যেতে বলে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই গুলি ছোড়া হয়। চারটি গুলি লাগে জামালের শরীরে।
কোমা থেকে জ্ঞান ফেরার পরও তার মাথায় ছিল ফুটবল। নার্সকে তিনি বলেছিলেন, কোচকে ফোন করে জানাতে হবে, পরদিন ম্যাচে তিনি খেলতে পারবেন না। নার্স তাকে জিগ্যেস করেন, ‘কাল কোন দিন?’ জামাল উত্তর দেন, ‘শুক্রবার।’ তখন তাকে জানানো হয়, আসলে সোমবার। সামনে রাখা পত্রিকা দেখিয়ে বিষয়টি বুঝিয়ে দেন নার্স।
সেই ঘটনার পরও থেমে থাকেননি জামাল। ডেনমার্ক, বাংলাদেশ, ভারত ও আর্জেন্টিনায় খেলেছেন তিনি। এখন বয়স ৩৬। জাতীয় দলের হয়ে শততম ম্যাচের মাইলফলকের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে এই মিডফিল্ডার এখনও খেলা চালিয়ে যেতে চান। তার ভাষায়, যতদিন শরীর সঙ্গ দেবে, জাতীয় দলের হয়ে খেলে যেতে চান তিনি।
জাতীয় দলের জার্সিকে বিশেষ কিছু হিসেবেই দেখেন জামাল। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের দেশ থেকে মাত্র ২৩ জনের একজন হয়ে জাতীয় দলে জায়গা পাওয়াকে তিনি সৌভাগ্য মনে করেন। তার কাছে প্রতিটি ম্যাচই বিশেষ। এত বছরে অনেক খেলোয়াড়কে আসতে-যেতে দেখেছেন, কিন্তু ফুটবল, দল ও বাংলাদেশের প্রতি ভালোবাসা এখনও আগের মতোই আছে।
বিশ্বকাপ নিয়েও জামালের আলাদা আবেগ রয়েছে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ব্রাজিলের সমর্থক। ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম অংশ বাংলাদেশে থেকে দেখার পর যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে আরও ছয়-সাতটি ম্যাচ মাঠে বসে দেখেছেন। তবে ব্রাজিলের সমর্থক হলেও বাংলাদেশের জন্য তার স্বপ্ন আরও বড়। ফিফা আসিয়ান কাপে ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের ম্যাচেও এমন উন্মাদনা দেখতে চান তিনি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে এই টুর্নামেন্টকে নিজেদের পরীক্ষা করার সুযোগ হিসেবে দেখছেন জামাল।
আসিয়ান কাপে বাংলাদেশের লক্ষ্যও পরিষ্কার করে জানিয়েছেন অধিনায়ক। গ্রুপে বাংলাদেশই সবচেয়ে নিচের র্যাঙ্কিংয়ের দল। সঙ্গে আছে স্বাগতিক ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর। বাস্তবতা মেনে নিয়ে জামালের লক্ষ্য অন্তত তিন থেকে চার পয়েন্ট। তার বিশ্বাস, ফুটবলে যেকোনো কিছুই সম্ভব।
বাংলাদেশকে বিশ্বকাপে খেলতে দেখাই জামালের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। সে জন্য ঘরোয়া লিগের মান বাড়ানো এবং আরও বেশি বাংলাদেশি ফুটবলারের বিদেশে খেলার সুযোগ তৈরি করার প্রয়োজন দেখছেন তিনি। যে দেশে বিশ্বকাপ এলেই ভবনের ছাদে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ডের পতাকা ওড়ে, হাজার হাজার মানুষ বড় পর্দায় ম্যাচ দেখে। সেই দেশের মানুষ যদি একদিন নিজেদের জাতীয় দলকে বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখতে পারে, সেটি হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক উন্মাদনা।
তিনি বলেন, ‘ভাবুন তো, আমরা যদি সত্যিই বিশ্বকাপে খেলতে পারি তা হলে উন্মাদনার মাত্রাটা কেমন হবে!’ জামালের স্বপ্নটা এমনই।
ফিফা আসিয়ান কাপের নিজেদের প্রথম ম্যাচে নামার আগের দিন বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে প্রস্তুতি, প্রত্যাশা ও লক্ষ্য নিয়েও কথা বলেছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। তার ভাষায়, প্রতিপক্ষ কঠিন হলেও নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণের সুযোগ আছে। ইন্দোনেশিয়ায় আরও আগে যাওয়ার কথা তাকলেও ভিসা জটিলতায় একটু দেরিতে পৌঁছেছে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, আমরা আরেকটু আগে আসতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ভিসা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে আসতে পারিনি। তবে অবশেষে আসতে পেরে ভালো লাগছে।
টুর্নামেন্টে নিজেদের গ্রুপে তিন প্রতিপক্ষই শক্তিশালী হওয়ায় কঠিন চ্যালেঞ্জের কথা স্বীকার করছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। জামাল বলেন, আমরা জানি এটি বেশ কঠিন হতে যাচ্ছে। তবে নিজেদের ওপর আমাদের বিশ্বাস আছে এবং আমরা আত্মবিশ্বাসী।
চলতি বছরের নভেম্বরেই ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। সেই টুর্নামেন্টকে বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য উল্লেখ করে জামাল বলেন, আসিয়ান কাপ সেই (সাফ) টুর্নামেন্টের প্রস্তুতির অংশ। তবে এখানে আমরা প্রতিটি ম্যাচেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাই। ক্যাপ্টেন জামাল ভূঁইয়ার প্রত্যাশা আসিয়ান কাপ থেকে কিছু পয়েন্ট অথবা এক দুটি ম্যাচ জয়। তা হলেই আমাদের এই সফরটি সফল হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে