প্রথমবারের মতো ফিফার কোনো টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ। উদ্বোধনী ম্যাচ ঘিরে তাই ছিল বাড়তি প্রত্যাশা ও উন্মাদনা। কিন্তু জাকার্তার গেলোরা বুং কার্নো স্টেডিয়ামে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে পারেনি বাংলাদেশ। মালয়েশিয়ার কাছে ৩-০ গোলে হেরে আসিয়ান কাপের অভিযান শুরু করেছে থমাস ডুলির দল।
শুরু থেকেই বাংলাদেশের খেলায় ছিল ছন্দহীনতা। রক্ষণ ও মাঝমাঠে বোঝাপড়ার ঘাটতির সুযোগ নিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় মালয়েশিয়া। শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচে সান মারিনোর বিপক্ষে জেতা একাদশ থেকে সাত পরিবর্তন এনে দল সাজিয়েছিলেন ডুলি। নতুনদের মধ্যে ফারহান আলী ওয়াহিদ, জিদান ইউসুফ ও শুকি ইতোফুসার অভিষেক হয়।
৪ মিনিটেই বাংলাদেশের গোলরক্ষক শ্রাবণকে পরীক্ষা দিতে হয়। হালিম ফয়সালের দূরপাল্লার শট ফিস্ট করে ফেরান তিনি। এরপরও আক্রমণের চাপ ধরে রাখে মালয়েশিয়া। ১৮ মিনিটে সেই চাপ থেকেই এগিয়ে যায় তারা। লিয়ানে নোয়ারের উড়িয়ে দেওয়া বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ডানদিক দিয়ে বক্সে ঢুকে কোনাকুনি নিচু শটে গোল করেন আরিফ আইমান।
পিছিয়ে পড়ে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করে বাংলাদেশ। মাঝমাঠে হামজা, ফাহমিদুল ও সোহেলরা কয়েকটি আক্রমণ তৈরি করলেও শেষ পাসে ছিল ঘাটতি। ৩৩ মিনিটে শামিত সোমের ক্রস থেকে রাকিব হোসাইনের শটও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
৩৭ মিনিটে আবারও বাংলাদেশের রক্ষণে ভুলের সুযোগ নেয় মালয়েশিয়া। বক্সের সামনে তপুর পা থেকে বল কেড়ে নিয়ে বার্গসন সেটি বাড়িয়ে দেন আরিফ আইমানকে। শ্রাবণের মাথার ওপর দিয়ে জোরালো শটে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন তিনি। দুই গোলে পিছিয়ে বিরতিতে যায় বাংলাদেশ।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ব্যবধান আরও বাড়িয়ে নেয় মালয়েশিয়া। কোরবিন লাভেরের লং পাস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে নিচু শটে শ্রাবণকে পরাস্ত করেন বার্গসন। ৩-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে বাংলাদেশ। এরপর মোরসালিন ও জিদান ইউসুফকে মাঠে নামিয়ে আক্রমণে ফেরার চেষ্টা করেন ডুলি। জিদানের জন্য এটি ছিল জাতীয় দলের জার্সিতে প্রথম ম্যাচ। সময় গড়ানোর সঙ্গে বাংলাদেশের খেলায়ও কিছুটা গতি আসে। ৭৬ মিনিটে শাহরিয়ার ইমনের সঙ্গে বল দেওয়া-নেওয়া করে বক্সে ঢুকে জোরালো শট নেন হামজা। কিন্তু মালয়েশিয়ার গোলরক্ষকের দুর্দান্ত সেভে গোলবঞ্চিত হন তিনি। ফিরতি বলেও চেষ্টা করেছিলেন হামজা, সেটিও আটকে যায়।
৮২ মিনিটে ইমনের শট অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। শেষদিকে পাল্টা আক্রমণে মালয়েশিয়ার ফার্গুসের উঁচু শটও দারুণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন শ্রাবণ। শেষ পর্যন্ত ৩-০ গোলের হার নিয়েই মাঠ ছাড়তে হয় বাংলাদেশকে।
ম্যাচ শেষে নিজেদের ভুলকেই হারের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখেছেন সোহেল রানা। তিনি বলেন, ‘আমাদের সামর্থ্য যা ছিল তা দিয়ে চেষ্টা করেছি। পরের ম্যাচে আরও চেষ্টা করব। আমাদের সিলি মিসটেকের জন্যই গোলগুলো কনসিড করছি। প্ল্যানিং যেভাবে ছিল, সেটা হান্ড্রেড পার্সেন্ট করতে পারিনি। তবে আমরা চেষ্টা করেছি।’
দীর্ঘদিন পর ম্যাচ খেলায় কিছুটা জড়তা থাকাও স্বীকার করেন সোহেল। তার মতে, নিজেদের করা ভুলের পর গোল হজম করলে ম্যাচে ফেরাটা কঠিন হয়ে যায়।
তবে গোলরক্ষক শ্রাবণকে দায়ী করেননি ডুলি, বরং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভের প্রশংসা করেছেন তিনি। বাংলাদেশ কোচ বলেন, ‘গোলরক্ষকের কোনো দোষ নেই। তিনি কিছু দারুণ সেভ করেছেন। তিনটি গোল খাওয়ার পেছনে গোলরক্ষক এককভাবে দায়ী নন।’
ডুলির মতে, দুদলের ব্যক্তিগত খেলোয়াড়দের মানের পার্থক্যও ম্যাচের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে হামজার মতো মিডফিল্ডার ফাঁকা জায়গায় বল চাইলে তাকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যেত বলেও মনে করেন তিনি। সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় জানিয়ে ডুলি বলেন, ‘আমরা এখানে শিখতে এসেছি। পরের ম্যাচগুলোতে আরও ভালো খেলার চেষ্টা করব।’ বাংলাদেশের কিছু খেলোয়াড় দীর্ঘদিন নিয়মিত অনুশীলনের বাইরে থাকলেও প্রতিকূলতার মধ্যেও দলের পারফরম্যান্সে তিনি সন্তুষ্ট বলে জানান।
অভিষেক ম্যাচ শেষে শুকি ইতোফুসার বার্তাও ছিল সামনে তাকানোর। ম্যাচের ফল নিয়ে হতাশ না হয়ে পরের ম্যাচের দিকে মনোযোগ দেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘হ্যাপি, হ্যাপি। নেক্সট গেম।’ বাংলাদেশের সামনে এখন ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে। এরপর গ্রুপ পর্বে স্বাগতিক ইন্দোনেশিয়ার মুখোমুখি হবে তারা। ফলে মালয়েশিয়ার বিপক্ষে করা ভুলগুলো শুধরে পরের ম্যাচে নিজেদের সামর্থ্যরে কাছাকাছি ফুটবল খেলাই এখন বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে