নাটোরের লালপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অনলাইন প্রতারণা ও ইমো-ফেসবুক হ্যাকিংয়ের অভিযোগে তরুণদের জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব কর্মকাণ্ডে জড়িতদের অনেকের দৃশ্যমান আয়ের উৎস না থাকলেও অল্প সময়ের মধ্যে তাদের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন এসেছে। নির্মাণ করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন বাড়ি, ব্যবহার করছেন দামি মোটরসাইকেল ও ব্র্যান্ডের পোশাক-জুতা। প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযান ও গ্রেপ্তারের পরও এ প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লালপুর সদর, বিলমাড়িয়া ও দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় এবং পাশের রাজশাহীর বাঘা উপজেলার কিছু এলাকায় অনলাইন প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডে জড়িতদের অনেকেই তরুণ। অভিযোগ রয়েছে, প্রতারণার মাধ্যমে পাওয়া অর্থে তাদের কেউ কেউ বিলাসী জীবনযাপন করছেন। এমনকি কয়েকটি বাড়ির আশপাশে একাধিক সিসি ক্যামেরা স্থাপনের কথাও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব তরুণের কারও কারও হাতে ৫ থেকে ৮ লাখ টাকা দামের মোটরসাইকেল দেখা যায়। দামি পোশাক ও জুতা ব্যবহার এবং নতুন বাড়ি নির্মাণ নিয়েও এলাকায় আলোচনা রয়েছে। স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিদের মতে, অল্প সময়ে বেশি অর্থ উপার্জনের প্রবণতা, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং পারিবারিক ও সামাজিক নজরদারির অভাবের কারণে তরুণদের একটি অংশ এ ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
তাদের আরও অভিযোগ, অল্প বয়সে বিপুল অর্থের মালিক হওয়ার কারণে কেউ কেউ মাদকসহ অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছেন। তবে এসব অভিযোগের সবগুলোর স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যক্তি, যিনি নিজেকে ইমো হ্যাকিংয়ের সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করেছেন, জানান, এ ধরনের প্রতারণায় মূলত প্রবাসী বাংলাদেশিদের টার্গেট করা হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সুন্দরী নারীর ছবি ব্যবহার করে ভুয়া ফেসবুক বা ইমো অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। এরপর প্রবাসীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করে বিভিন্ন কৌশলে তাদের কাছ থেকে ওটিপি বা প্রয়োজনীয় তথ্য নেওয়া হয়।
ওই ব্যক্তির দাবি, ইমো অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর প্রবাসীর বাংলাদেশে থাকা মা-বাবা, স্ত্রী বা ভাইয়ের কাছে মেসেজ পাঠানো হয়। কখনো প্রবাসীর কণ্ঠ বা কথাবার্তার ধরন নকল করে বলা হয়, তিনি বিপদে পড়েছেন, পুলিশ তাকে আটক করেছে বা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। জরুরি প্রয়োজনের কথা বলে বিকাশ বা নগদ নম্বরে টাকা পাঠাতে বলা হয়। স্বজনেরা প্রবাসীর বিপদের কথা বিশ্বাস করে ওই নম্বরে টাকা পাঠিয়ে দেন।
বিলমাড়িয়া ইউনিয়নের সাইফুল ইসলাম বলেন, লালপুর সদর, বিলমাড়িয়া ও দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা এবং পাশের বাঘা উপজেলার কিছু এলাকা অনলাইন প্রতারণার জন্য আলোচনায় এসেছে। এসব কর্মকাণ্ড বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।
দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের লালন আলী বলেন, অনলাইন প্রতারণায় জড়িতদের অনেকেই মাদক সেবনের সঙ্গে যুক্ত বলে স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে। তাদের কেন্দ্র করে এলাকায় মাদক কেনাবেচাসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধের বিস্তার ঘটছে বলেও তিনি দাবি করেন।
উপজেলার নওপাড়া গ্রামের রফিকুল ইসলাম বলেন, একসময় যেসব পরিবারের ছেলেদের বাবা কৃষিকাজ বা দিনমজুরি করে সংসার চালাতেন, তাদের কারও কারও জীবনযাপনে এখন বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। দামি গাড়ি, বাড়ি ও খাবারদাবারের ধরন দেখে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলাম জানান, গত ছয় মাসে সাইবার অপরাধবিরোধী প্রায় ৫০টি অভিযান চালিয়েছে লালপুর থানা পুলিশ। এসব অভিযানে ৭৬ জন হ্যাকার ও প্রতারককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় সাইবার সুরক্ষা আইনে ২৪টি মামলা করা হয়েছে। অভিযানে বিভিন্ন মোবাইল অপারেটরের বিপুলসংখ্যক ভুয়া বা বেনামি সিম এবং অপরাধে ব্যবহৃত অ্যান্ড্রয়েড ফোন উদ্ধার করা হয়েছে।
ওসি বলেন, শুধু পুলিশি অভিযান চালিয়ে সাইবার অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। এ জন্য পরিবার ও সমাজের সচেতনতা এবং সামাজিক প্রতিরোধ প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রবাসীদের ইমো ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে অজানা লিংকে ক্লিক না করা এবং কোনো ব্যক্তির সঙ্গে ওটিপি কোড বা পাসওয়ার্ড শেয়ার না করার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
সময়ের আলো/জোই