জলাতঙ্ক থেকে বাঁচতে যা জানা জরুরি

সময়ের আলো ডেস্ক

ফিচার

জলাতঙ্ক। হাইড্রোফোবিয়া বা পাগলা রোগ নামেও পরিচিত এই রোগ র‌্যাবিস ভাইরাসের সংক্রমণে হয়ে থাকে। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি পানি দেখতে

2026-09-28T09:25:39+00:00
2026-09-28T09:29:37+00:00
 
  সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৩ আশ্বিন ১৪৩৩
সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ফিচার
জলাতঙ্ক থেকে বাঁচতে যা জানা জরুরি
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:২৫ এএম  আপডেট: ২৮.০৯.২০২৬ ৯:২৯ এএম
কোনো প্রাণী কামড়ালে সময় নষ্ট না করে দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে হবে। ছবি : প্রতীকী
জলাতঙ্ক। হাইড্রোফোবিয়া বা পাগলা রোগ নামেও পরিচিত এই রোগ র‌্যাবিস ভাইরাসের সংক্রমণে হয়ে থাকে। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি পানি দেখতে বা পানির কথা শুনলেও অনেক সময় প্রচণ্ড আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এ কারণেই রোগটির নাম ‘জলাতঙ্ক’। ভয়ংকর বিষয় হলো, রোগের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর আক্রান্ত ব্যক্তির বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুব কম থাকে। তাই জলাতঙ্ক থেকে বাঁচতে কিছু বিষয় জানা জরুরি।

কীভাবে জলাতঙ্ক ছড়ায়

কুকুর, শিয়াল, বিড়াল, বাদুড়, বেজি ও বানরসহ বিভিন্ন প্রাণী র‌্যাবিস ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। আক্রান্ত প্রাণী সুস্থ মানুষ বা গবাদিপশুকে কামড়ালে ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করে জলাতঙ্কের সংক্রমণ ঘটাতে পারে। বাংলাদেশে জলাতঙ্কের প্রায় ৯৫ শতাংশ সংক্রমণের জন্য কুকুরের কামড় দায়ী। কুকুরের কামড়ের শিকার ব্যক্তিদের প্রায় ৪০ শতাংশই ১৫ বছরের কম বয়সী শিশু।

আক্রান্ত প্রাণীর লালায় র‌্যাবিস ভাইরাস থাকে। এই লালা কামড়ের ক্ষত, আঁচড় বা শরীরের পুরনো ক্ষতের মাধ্যমে রক্তের সংস্পর্শে এলে ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এছাড়া, কিছু ক্ষেত্রে আক্রান্ত প্রাণীর লালা থেকে তৈরি অ্যারোসল শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে প্রবেশ করেও সংক্রমণ ঘটতে পারে।

শরীরে প্রবেশের পর র‌্যাবিস ভাইরাস ধীরে ধীরে প্রান্তীয় স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। এর ফলে গলবিল ও খাদ্যনালির মাংসপেশির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুতন্ত্রও আক্রান্ত হয়।

সাধারণত আক্রান্ত প্রাণীর কামড়ের ২ থেকে ৩ মাসের মধ্যে রোগের লক্ষণ দেখা দেয়। তবে কখনো কখনো এক সপ্তাহের মধ্যেও লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে, আবার এক বছর পর্যন্ত সময়ও লাগতে পারে।


জলাতঙ্কের লক্ষণ কী

পানির প্রতি অস্বাভাবিক ভয় জলাতঙ্কের অন্যতম লক্ষণ হলেও এর পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তির আচরণ ও শারীরিক অবস্থাতেও নানা পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। অস্বাভাবিক কথাবার্তা ও আচরণের পাশাপাশি উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ানো, ক্ষুধামন্দা, কণ্ঠস্বর কর্কশ হয়ে যাওয়া, মেজাজ খিটখিটে হওয়া এবং বিনা প্ররোচনায় অন্যকে আক্রমণ বা কামড় দেওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।

এছাড়া, আক্রান্ত ব্যক্তির প্রচণ্ড পানির পিপাসা থাকলেও পানি দেখলে আতঙ্ক ও ভয় তৈরি হয়। আলো ও বাতাসের সংস্পর্শেও এই ভয় বেড়ে যেতে পারে। এ কারণে অনেকে অন্ধকার ও নিরিবিলি জায়গায় একা থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

শুধু পানি পান করাই নয়, খাবার গিলতেও আক্রান্ত ব্যক্তির সমস্যা হতে পারে। খিঁচুনি এবং মুখ থেকে অতিরিক্ত লালা ঝরাও দেখা যায়। কিছু ক্ষেত্রে পক্ষাঘাত, শরীর নিস্তেজ হয়ে যাওয়া, ঝিমুনি এবং কামড় বা আঁচড়ের স্থানে অবশতা ও অসাড়তার অনুভূতি হতে পারে। শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ু ও মাংসপেশি দুর্বল হয়ে পড়লে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত রোগীর মৃত্যু ঘটে।

কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ র‌্যাবিস ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর নয়। এ পর্যায়ে মূলত উপসর্গ উপশমের চিকিৎসাই দেওয়া হয়। তবে, রোগের লক্ষণ প্রকাশের আগেই যথাযথ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া গেলে জলাতঙ্কে মৃত্যু এড়ানো সম্ভব।

টিকা কেন গুরুত্বপূর্ণ

জলাতঙ্ক প্রতিরোধে কার্যকর টিকা রয়েছে। আক্রান্ত প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের পর যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় টিকা ও অন্যান্য প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা শুরু করা জরুরি। ক্ষতের ধরন ও তীব্রতার ওপর নির্ভর করে কারও ক্ষেত্রে এক ধরনের টিকা, আবার কারও ক্ষেত্রে একাধিক ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে।

টিকার ডোজ ও সময়সূচি রোগীর অবস্থা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়। তাই কামড় বা আঁচড়ের পর নিজে থেকে টিকার ডোজ নির্ধারণ না করে দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে যোগাযোগ করা উচিত এবং নির্ধারিত কোর্স সম্পন্ন করা জরুরি।


কারা প্রতিরোধমূলক টিকা নিতে পারেন

পশুচিকিৎসক, চিড়িয়াখানায় প্রাণীর দেখাশোনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী বা ভ্রমণকারী ব্যক্তি এবং বাড়িতে কুকুর বা বিড়াল পোষেন- এমন ব্যক্তিরা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জলাতঙ্কের প্রতিরোধমূলক টিকা নিতে পারেন।

জলাতঙ্ক প্রতিরোধে শুধু মানুষকে সুরক্ষিত রাখাই যথেষ্ট নয়। পোষা ও অ-পোষা কুকুর-বিড়ালকে নিয়মিত জলাতঙ্কের টিকার আওতায় আনাও রোগটি নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ উপায়। মানুষ ও প্রাণী উভয়ের ক্ষেত্রেই যথাযথ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া গেলে জলাতঙ্কের বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

প্রাণী কামড়ালে বা আঁচড় দিলে কী করবেন

সন্দেহজনক বা অচেনা কোনো প্রাণী কামড়ালে বা আঁচড় দিলে বিষয়টিকে অবহেলা করা যাবে না। প্রথমেই ক্ষতস্থান পরিষ্কার করা জরুরি। কল বা টিউবওয়েলের প্রবহমান পানি দিয়ে অন্তত ১০ মিনিট ধরে ক্ষতটি ধুয়ে নিতে হবে। সম্ভব হলে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল সাবানও ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি ক্ষতস্থানে থাকা ভাইরাস ও অন্যান্য জীবাণু অপসারণে সহায়ক।

ক্ষত পরিষ্কারের পর দেরি না করে চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক ক্ষত পরিষ্কার করবেন এবং জলাতঙ্ক প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় টিকা বা অন্য চিকিৎসা দেবেন। ক্ষত গুরুতর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরবর্তী চিকিৎসাও নিতে হবে।


ক্ষতস্থানে নিজের ইচ্ছায় কোনো রাসায়নিক বা ঘরোয়া উপাদান ব্যবহার করা উচিত নয়। বরফ, লবণ, চিনি, স্যালাইন, ইলেকট্রিক শক ইত্যাদি প্রয়োগ করা যাবে না। ক্ষত কেটে দেওয়া, চুষে রক্ত বের করার চেষ্টা, ঝাড়ফুঁক, বাটিপড়া, পানপড়া, চিনিপড়া বা মিছরিপড়ার মতো কুসংস্কার ও অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসার ওপর নির্ভর করাও উচিত নয়। এসবের কারণে চিকিৎসা নিতে দেরি হলে বিপদ আরও বাড়তে পারে।

ক্ষতস্থানে ধুলাবালি ও ময়লা যাতে না লাগে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ক্ষত কীভাবে ঢেকে রাখা বা ব্যান্ডেজ করা হবে, সে বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে ক্ষত সেলাইয়ের প্রয়োজন হলে সেটিও চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী করতে হবে।

সম্ভব হলে যে প্রাণীটি কামড়েছে বা আঁচড় দিয়েছে, সেটির বিষয়ে নজর রাখুন। আক্রমণের পর প্রাণীটি অসুস্থ হয়ে পড়লে বা মারা গেলে বিষয়টি দ্রুত চিকিৎসককে জানান। প্রাণীটি কোথায় আছে, কী ধরনের প্রাণী এবং তার আচরণ কেমন ছিল- এসব তথ্য চিকিৎসকের জন্য ঝুঁকি নির্ধারণে সহায়ক হতে পারে।

উল্লেখ্য, বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন এবং প্রতিবছর প্রায় ৫৫ হাজার মানুষ জলাতঙ্কে মারা যান। বাংলাদেশেও প্রতি বছর গড়ে ৪০ থেকে ৫০ জনের মৃত্যু হয় এ রোগে। শুধু মানুষ নয়, দেশে প্রতিবছর প্রায় ২৫ হাজার গবাদিপশুও জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়। রোগটি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে প্রতিবছর ২৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস পালিত হয়। 

সময়ের আলো/মহু

  বিষয়:   জলাতঙ্ক  প্রতিরোধ  প্রতিকার  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: