বাঁশখালী উপকূলেই এখন তুলির আঁচড়ে জন্ম নিচ্ছে অন্যরকম সৌন্দর্য। কখনো আরবি বর্ণমালার বাঁকে ফুটে উঠছে আধ্যাত্মিকতার আবহ, কখনো রঙের ছোঁয়ায় ক্যানভাসে জীবনের গল্প। আবার সুঁই-সুতোর নিপুণ কারুকাজে সাধারণ কাপড় হয়ে উঠছে শিল্পের অনন্য ক্যানভাস।
বাঁশখালীর প্রান্তিক জনপদে শিল্পচর্চার এই বিপ্লবের অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে ক্যালিগ্রাফি। শখ থেকে শুরু করে পেশা, আর সৃজনশীলতার পথ ধরে পরিচিতি; উপকূলের কয়েকজন তরুণ-তরুণী নিজেদের মেধা ও সাধনায় ক্যালিগ্রাফিকে পৌঁছে দিচ্ছেন নতুন উচ্চতায়।
এই পথচলার শুরুটা অবশ্য বেশ পুরোনো। বাঁশখালী উপকূলে ক্যালিগ্রাফির চর্চা শুরু হয় ১৯৯৬ সালে চিত্রশিল্পী আমিরুল হক এমরুল কায়েসের হাত ধরে। ছনুয়া ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকা খুদুকখালীতে বেড়ে ওঠা এমরুল কায়েস চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। উপকূলের মাটি থেকে উঠে এসে নগরের শিল্পাঙ্গনে নিজের অবস্থান তৈরি করেন তিনি। মায়ের নামে প্রতিষ্ঠা করেন ‘শরীফা আর্ট স্কুল ও শরীফা সুন্দর লেখা শেখার স্কুল’। বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় এই প্রতিষ্ঠানের ১৮টি শাখা রয়েছে। সুন্দর লেখা ও ক্যালিগ্রাফির চর্চায় প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে পরিচিতি পেয়েছে।
চারুকলার পথে অদম্য তরুণ
সাদা ক্যানভাসে রঙের আঁচড়ে স্বপ্ন, অনুভূতি আর জীবনের গল্প ফুটিয়ে তুলছেন ছনুয়া ইউনিয়নের তোতকখালী গ্রামের তরুণ আরশাদ হোছাইন। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে চারুকলার প্রতি ভালোবাসাকে সঙ্গী করে এগিয়ে চলেছেন তিনি।
স্কুলজীবন থেকেই ছবি আঁকার প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়। পুঁইছড়ি ইজ্জতিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ার সময় বাংলা শিক্ষক শংকর নাথ দত্তের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা তার শিল্পীসত্তাকে আরও বিকশিত করে। ২০১৫ সালে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি এবং ২০১৭ সালে দেওয়ানহাট সিটি করপোরেশন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন আরশাদ। স্বপ্ন ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে পড়ার। ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভাস্কর্য বিভাগে সুযোগও পান। কিন্তু পরিবারের আপত্তির কারণে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। চারুকলার পরিবেশ নিয়ে পরিবারের কয়েকজনের নেতিবাচক ধারণাই তার পথ আটকে দেয়।
তবে থেমে যাননি আরশাদ। ২০১৮ সালে আবারও চারুকলায় ভর্তির প্রস্তুতি নিলেও নানা কারণে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। পরের বছর পটিয়া সরকারি কলেজে অর্থনীতি বিষয়ে ভর্তি হন। একই সময়ে চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমিতে চারুকলার তিন বছর মেয়াদি কোর্সে ভর্তি হয়ে শুরু করেন নিয়মিত শিল্পচর্চা।
শিল্পকলা একাডেমিতে তিনি বিভিন্ন শিল্পীর সংস্পর্শে এসে নানা কৌশল শেখেন। বিশেষভাবে ওয়াটার কালারে দক্ষতা অর্জন করেন। প্রকৃতি, মানুষ ও জীবনের নানা গল্প তার তুলির আঁচড়ে ক্যানভাসে ফুটে উঠতে থাকে। নিজের অর্জিত জ্ঞান অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে ২০২৪ সালে চট্টগ্রামের চকবাজারে ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেন ‘চারুকারু আর্ট স্কুল’। সেখানে শিশু-কিশোরসহ আগ্রহীদের চিত্রাঙ্কন ও চারুকলার বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি বিভিন্ন চিত্র প্রদর্শনী ও আউটডোর পেইন্টিংয়ে নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় পড়ার স্বপ্ন পূরণ না হলেও চারুকলা থেকে দূরে সরে যাননি আরশাদ। বরং নিজের পথ নিজেই তৈরি করেছেন। আজ তার প্রতিটি তুলির আঁচড়ে ফুটে উঠছে না-হারার গল্প-যে স্বপ্ন একদিন থমকে গিয়েছিল, সেটিই এখন রঙ ও রেখার ভাষায় নতুন নতুন ক্যানভাসে কথা বলছে।
শখ থেকে স্বপ্ন
উপকূলের আরেক প্রান্ত থেকে শিল্পের সেই আলো বহন করে চলেছেন সাঈয়্যিদা তাবাসসুম। বাঁশখালীর শেখেরখীল ইউনিয়নের এই তরুণীর শিল্পযাত্রা শুরু হয়েছিল ছোটবেলা থেকেই। অন্যদের মতো ছুটির দিন কিংবা অবসর সময় আড্ডা-গল্পে না কাটিয়ে রং-তুলি, কাগজ, ক্যানভাস আর হাতের কাছে পাওয়া নানা উপকরণ নিয়ে মেতে থাকতেন নতুন কিছু সৃষ্টির আনন্দে।
তখন হয়ত জানতেন না-শৈশবের সেই ছোট্ট শখ একদিন তার পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠবে। সেই শখই একসময় হয়ে উঠবে উপার্জনের পথ। ক্রাফট, পাঞ্চ নিডল, এমব্রয়ডারি ও চিত্রকর্মের পাশাপাশি একসময় ফন্টগ্রাফি ও ক্যালিগ্রাফির প্রতি আগ্রহ জন্মে তাবাসসুমের। সংসারের নানা দায়িত্ব সামলেও অবসর সময়কে সৃজনশীলতায় রাঙিয়ে নিয়মিত চালিয়ে যাচ্ছেন শিল্পচর্চা।
খ্যাতিমান ক্যালিগ্রাফার মাহবুব মুর্শেদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের কাজে নান্দনিকতার নতুন মাত্রা যোগ করেছেন তিনি। চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজ থেকে বাংলা বিভাগে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন তাবাসসুম। বর্তমানে মহসিন কলেজে স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত।
সাইয়্যিদা তাবাসসুম বলেন, ছোটোবেলা থেকেই ফেলনা জিনিস দিয়ে নতুন কিছু তৈরি, এমব্রয়ডারি ও আঁকাআঁকির প্রতি আমার আগ্রহ ছিল। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে ক্যালিগ্রাফিতে আসা। শখের সেই কাজ এখন আমার আয়েরও একটি পথ। সংসারের খরচের পাশাপাশি নিজের সৃজনশীলতাকেও এগিয়ে নিচ্ছি।
এই পথচলায় স্বামী আকরামুল হান্নান সিরাজীর সহযোগিতার কথাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন তাবাসসুম। তিনি বলেন, ‘স্বামী রুচিশীল ও শিল্প প্রিয় হওয়ায় আমার অনুপ্রেরণাই এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম শক্তি।’
ইতোমধ্যে তাবাসসুমের ক্যালিগ্রাফি পৌঁছে গেছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এমনকি গত বছর আমেরিকাপ্রবাসী এক ব্যক্তিও তার কাছ থেকে ক্যালিগ্রাফি অর্ডার করেছেন। চট্টগ্রামের বিভিন্ন অফিস, মসজিদ ও বাসাবাড়ির দেয়ালে এখন শোভা পাচ্ছে তার আঁকা ক্যালিগ্রাফি ও চিত্রকর্ম।
করোনার ঘরে জন্ম নেওয়া স্বপ্ন, এখন ছড়িয়ে পড়ছে দেয়ালে দেয়ালে
ক্যালিগ্রাফির জগতে নিজের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন বাঁশখালীর আরেক তরুণ মিনহাজ উদ্দিন সামী। তিনি একাধারে হাফেজে কোরআন, আলেম ও মানবসেবায় নিবেদিত একজন তরুণ। আর শিল্পের জগতে তার পরিচয় একজন ক্যালিগ্রাফার।
তার ক্যালিগ্রাফির যাত্রা শুরু ২০১৯ সালে করোনাকালে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ঘরে বসে অবসর সময় কাটাতে পেন্সিলে আঁকতেন নানা ধরনের আর্ট। এক অগ্রজের অনুপ্রেরণায় ধীরে ধীরে হাত দেন ক্যালিগ্রাফিতে। বাংলাদেশের পরিচিত ক্যালিগ্রাফার মাহবুব মুর্শেদের কাছে ওয়ার্কশপ করেন। অংশ নেন বিভিন্ন প্রদর্শনীতে। ধীরে ধীরে শখের সেই কাজই হয়ে ওঠে তার স্বপ্নের পথ।
বাঁশখালী পৌরসভার সন্তান মিনহাজ উদ্দিন সামী চট্টগ্রাম কলেজের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ থেকে যৌথভাবে প্রথম স্থান অর্জন করে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। পাশাপাশি চট্টগ্রামের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদরাসার তাফসীর বিভাগে কামিল (মাস্টার্স) ফাইনালে অধ্যয়নরত।
মিনহাজ উদ্দিন সামী বলেন, শখের বশেই ক্যালিগ্রাফি শুরু করেছিলাম। কিন্তু সেই শখই এখন আয়ের পথ তৈরি করেছে। মানুষের রুচি ও নান্দনিকতার চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে অফিস, বাসা কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্যালিগ্রাফি তৈরি করছি।
চট্টগ্রাম কলেজের অধ্যক্ষের অফিস থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিস, মসজিদ ও বাসাবাড়িতে এখন শোভা পাচ্ছে তার আঁকা ক্যালিগ্রাফি।
ছনুয়ার মাটি থেকে ক্যালিগ্রাফির মঞ্চে
ছনুয়ায় বেড়ে ওঠা জসিম উদ্দিন তুহিনও ইসলামিক ক্যালিগ্রাফিতে নিজের আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছেন। ছনুয়ার মাটিতে বেড়ে ওঠা এই শিল্পী বর্তমানে শিক্ষকতা করছেন চুনতি হাফেজিয়া আদর্শ দাখিল মাদ্রাসায়। চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন তিনি।
ইসলামিক ক্যালিগ্রাফির বিভিন্ন সৃষ্টিতে তার নান্দনিকতার ছাপ ইতোমধ্যে প্রশংসা কুড়িয়েছে। বর্ণের বাঁক, রেখার সৌন্দর্য আর ধর্মীয় আবহসব মিলিয়ে তার সৃষ্টিকর্মে ফুটে ওঠে শিল্প ও আধ্যাত্মিকতার এক অপূর্ব সমন্বয়।
সময়ের আলো/আতা