স্বামী নেই, সন্তানও নেই, পাশে দাঁড়ানোর মতো নেই কোনো আপনজনও। বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন তিন বোন। তাদের একজনের কোমরের হাড় ভাঙা, অন্য দুজন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। একসময় মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ভিক্ষা করে কোনোরকমে চলত তাদের সংসার। কিন্তু বয়স আর অসুস্থতার কারণে এখন সেই সামর্থ্যটুকুও হারিয়েছেন তারা। জরাজীর্ণ খুপরি ঘরে কাটছে তিন বোনের দিন-রাত। কখনও খাবারের অপেক্ষা, কখনও একটু সাহায্যের আশায় চেয়ে থাকা—এভাবেই কাটছে তাদের অসহায় জীবন।
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরবন্দ ইউনিয়নের দেবীপুর পণ্ডিতপাড়া গ্রামের মৃত তোফাজ্জল হোসেনের তিন মেয়ে মন্তনী বেওয়া, বোছ বেগম ও তুলি বেগমের জীবনের গল্প এটি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাদের নিত্যসঙ্গী হয়েছে দারিদ্র্য, অসুস্থতা আর নিঃসঙ্গতা। নিয়মিত খাবার, চিকিৎসা কিংবা নিরাপদ আশ্রয়—কোনোটিরই নিশ্চয়তা নেই তাদের জীবনে। অসহায় এই তিন বোনের পাশে দাঁড়াতে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের সহযোগিতা কামনা করেছেন স্থানীয়রা।
তিন বোনের মধ্যে বড় মন্তনী বেওয়ার বয়স ৭৯ বছর। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর ফিরে আসেননি তার স্বামী ভুলু মিয়া। এরপর থেকে স্বামীহারা এই নারীর জীবনে শুরু হয় একাকিত্বের দীর্ঘ অধ্যায়। সন্তান না থাকায় জীবনের শেষ বয়সে এসে তার পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই।
একসময় বড় বোন মন্থনী ভিক্ষা করে কোনো রকমে চালাত তিন বোনের জীবন সংসার। কারও কাছ থেকে সামান্য খাবার, কারও বাড়ি থেকে একমুঠো চাল এভাবেই চলত দিন। কিন্তু প্রায় দুই বছর আগে পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে যাওয়ার পর থেকে থেমে গেছে স্বাভাবিক চলাফেরা। এখন অন্যের সাহায্য ছাড়া বিছানা থেকে ওঠাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
দুই বোনের জীবনেও একই দুর্ভোগ
মন্তনী বেওয়ার দুই ছোট বোন বোছ বেগম ও তুলি বেগমের জীবনও একই রকম অসহায়ত্বে ঘেরা। তিন বোনের কারও কোনো সন্তান নেই। প্রায় ৩০ বছর আগে তাদের স্বামীরাও ছেড়ে চলে গেছেন। এরপর থেকে একে অপরকে আঁকড়ে ধরেই চলছে তাদের জীবন।
৭৫ বছর বয়সী বোছ বেগম নিজে একা
চলাফেরা করতে পারেন না। অন্যদিকে তুলি বেগম বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হওয়ায় তারও স্বাভাবিক জীবনযাপন বিঘ্নিত। বয়স, শারীরিক অসুস্থতা ও আর্থিক সংকট তাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে প্রতিদিন।
একই ঘরে বসবাস করেন তিন বোন। তাদের মধ্যে রয়েছে গভীর আত্মিক বন্ধন। কিন্তু অভাব আর অসুস্থতার কারণে একজন আরেকজনের পাশে দাঁড়ানোর সামর্থ্যটুকুও নেই। নিজেদের খাবার জোগাড় করতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে একে অপরের দেখাশোনা করাও তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইউনিয়নের দেবীপুর পণ্ডিতপাড়া গ্রামের একটি ছোট্ট জরাজীর্ণ ঘরই তিন বোনের একমাত্র আশ্রয়। ভাঙাচোরা ঘরে কোনো রকমে দিন কাটছে তাদের। নেই নিয়মিত আয়ের উৎস, নেই খাবারের নিশ্চয়তা। অসুস্থ হলেও চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই তাদের।
স্থানীয়রা জানান, তিন বোনের কোনো স্বামী-সন্তান নেই। সহায় সম্বল বলতে আছে শুধু একটি জীর্ণ কুঁড়েঘর। তাদের নিয়মিত খাবার, চিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা জরুরি।
সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা এগিয়ে এলে তিন বোনের জীবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে। তাদের জন্য নিয়মিত খাদ্যসহায়তা, চিকিৎসাসেবা ও বসবাসের উপযোগী নিরাপদ ঘরের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসে তিন বোনের চাওয়া খুব বেশি কিছু নয়। দুমুঠো খাবার, অসুস্থ শরীরের জন্য একটু চিকিৎসা আর নিরাপদে মাথা গোঁজার একটি আশ্রয়—এই সামান্য চাহিদাটুকুই এখন তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন।
যে বয়সে প্রয়োজন একটু যত্ন, ভালোবাসা আর নির্ভরতা, সেই বয়সে তিন বোনের জীবনে নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা। একটি ভাঙা ঘরে তিনটি অসহায় জীবন এখন অপেক্ষায় রয়েছে একটু সহযোগিতার।
নাগেশ্বরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুহাম্মদ আলাউদ্দিন সময়ের আলোকে বলেন, অসহায় তিন বোনের জন্য প্রাথমিক কিছু আর্থিক সহায়তা পাঠানোর ব্যবস্থা করছি। বরাদ্দ আসলে পর্যায়ক্রমে তাদের ঘরের জন্য টিন বা অন্যান্য উপকরণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সময়ের আলো/এনএন