দুই দশক পর ইরাক ছাড়ছে মার্কিন বাহিনী, বাড়ছে ইরানের প্রভাব

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

দুই দশকেরও বেশি সময় পর ইরাকে থাকা শেষ মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো থেকেও বুধবারের মধ্যে সেনা প্রত্যাহার করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এই

2026-09-29T22:03:18+00:00
2026-09-29T22:03:18+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৪ আশ্বিন ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
দুই দশক পর ইরাক ছাড়ছে মার্কিন বাহিনী, বাড়ছে ইরানের প্রভাব
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:০৩ পিএম 
দুই দশক পর ইরাক ছাড়ছে মার্কিন বাহিনী, বাড়ছে ইরানের প্রভাব
দুই দশকেরও বেশি সময় পর ইরাকে থাকা শেষ মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো থেকেও বুধবারের মধ্যে সেনা প্রত্যাহার করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এই ঘটনাকে ইরান ও দেশটির মিত্ররা বিজয় হিসেবে দেখছে। কারণ, ইরাকে এখন ইরানঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোর রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বেশ শক্তিশালী।

ইরাক যুদ্ধে দুই দশকের বেশি সময়ে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। ২০২৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময় সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তই এখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সময়ে বাস্তবায়ন হচ্ছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িত।

ইরাকের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, মার্কিন সেনা চলে যাওয়ার ফলে ইরানে আরও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের আরেক শত্রু আইএস (ইসলামিক স্টেট)-ও আবার শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ পেতে পারে।

ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র শিয়া গোষ্ঠীগুলো নিয়ে কাজ করা ইরাকি নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাসিম আল-বাহাদলি বলেন, মার্কিন জোটের চলে যাওয়ায় ইরান কৌশলগতভাবে লাভবান হতে পারে। কারণ, বহু বছর ধরে ইরাকে ইরানের প্রভাবের বিপরীতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি একটি ভারসাম্য তৈরি করেছিল।

তার মতে, ইরানপন্থী মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো এই প্রত্যাহারকে নিজেদের বিজয় হিসেবে তুলে ধরবে এবং নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নিজেদের প্রভাব আরও বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে।

ইরানসমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর জোট ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’-এর কমান্ডার আবু মুজতবা আল-ইয়াসিরি মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ বলে উল্লেখ করেছেন।

তিনি বলেন, ৩০ সেপ্টেম্বর ইরাকের ইতিহাসের একটি ‘কালো অধ্যায়ের’ সমাপ্তি উদযাপন করা হবে।

ইরাক এখনও প্রস্তুত নয়? 

ইরাক থেকে মার্কিন সেনা চলে যাওয়ার বিষয়টি দেশটির অনেক মানুষের কাছে জনপ্রিয় হলেও, ইরানের ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর শক্তি নিয়ে উদ্বিগ্ন অনেকেই মনে করছেন, এই সময়ে প্রত্যাহার কিছুটা আগেভাগেই হচ্ছে।

একসময় মার্কিনবিরোধী প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি ছিল ফালুজ্জাহ। সেখানকার সুন্নি গোত্রীয় নেতা আবদুর রহমান আল-জুবাই বলেন, এই মুহূর্তে ইরাক পুরোপুরি নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়।

তিনি বলেন, সব ইরাকিই পূর্ণ সার্বভৌমত্ব চায় এবং এ নিয়ে কারও আপত্তি নেই। তবে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট এভাবে চলে গেলে যে নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি হবে, সেটিই ইরাকিদের বড় উদ্বেগ।

২০০৩ সালে শুরু মার্কিন অভিযান 

২০০৩ সালে সুন্নি মুসলিম শাসক সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ইরাকে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এরপর দেশটি দখলে নেয় মার্কিন বাহিনী। পরে শিয়া নেতৃত্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং কয়েক বছর ধরে বিদ্রোহ দমনে অভিযান চালানো হয়।

২০১১ সালের শেষ দিকে মার্কিন সেনারা ইরাক থেকে চলে যায়। তবে এর তিন বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তারা আবার ইরাকে ফিরে আসে। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ইরাকি বাহিনীকে সুন্নি জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়তা করে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট।

‘অপারেশন ইরাকি ফ্রিডম’-এ প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা নিহত হন। আফগানিস্তানে একই সময়ে চলা যুদ্ধের তুলনায় ইরাকে প্রায় দ্বিগুণ মার্কিন সেনা নিহত হন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরাক এমন একটি দেশ ছিল, যার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান— দুই দেশের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক ছিল। বিভিন্ন সময়ে ইরাকের মাটিই দুই দেশের সংঘাতের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।

২০২০ সালে বাগদাদ বিমানবন্দরের কাছে মার্কিন হামলায় ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার কাসেম সোলেইমানি নিহত হন। এরপর ইরানসমর্থিত গোষ্ঠীগুলো ইরাকে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে বারবার হামলা চালায়। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা হামলা চালিয়েছে।

চলতি বছরের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে নিহত ১৮ মার্কিন সেনার মধ্যে ৭ জন ইরাকে নিহত হয়েছেন। সর্বশেষ গত জুলাইয়ে এরবিলের কাছে একটি ঘাঁটিতে ড্রোন নিয়ন্ত্রিতভাবে ধ্বংস করার সময় এক মার্কিন সেনা সার্জেন্ট নিহত হন।

ইরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ বিজয়

ইরান দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা সরিয়ে দেওয়াকে নিজেদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে দেখিয়ে আসছে। ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ে গঠিত ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর জন্য ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে তাই বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের উপপ্রধান আমির হায়াত মুকাদ্দাম বলেন, মার্কিন সেনারা ইরাক ও অঞ্চল থেকে চলে গেলে দেশটিতে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হবে।

তিনি বলেন, ইরান ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে স্বাগত জানায় এবং এ সিদ্ধান্তকে সমর্থন করবে।


তবে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরানে সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াগুলো তেহরানের নির্দেশে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। চলতি মাসে সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইনে হামলার ঘটনাতেও এসব গোষ্ঠীর ভূমিকা ছিল বলে ওয়াশিংটন অভিযোগ করেছে। বাগদাদ সরকার বলছে, তারা এসব গোষ্ঠীর প্রভাব নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।

আবার শক্তি বাড়াতে পারে আইএস

ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকার ও স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলের কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা সতর্ক করেছেন, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ফলে ইসলামিক স্টেটও আবার শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ পেতে পারে।

প্রায় এক দশক আগে আইএস তাদের কথিত ‘খেলাফত’ হারালেও সংগঠনটির ঘুমন্ত সেল বা গোপন সদস্যদের নেটওয়ার্ক এখনো রয়েছে।

একসময় আইএস ইরাকের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করেছিল এবং হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছিল।

কুর্দি কমান্ডার সিরওয়ান বারজানি বলেন, মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য, সরবরাহ সহায়তা ও ড্রোনের সহযোগিতা না থাকলে আইএস আবার সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।

তার দাবি, আন্তর্জাতিক জোট ইরাক থেকে সেপ্টেম্বরের শেষে চলে যাবে—এমন খবর প্রকাশের পর গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে আইএসের ঘুমন্ত সেলগুলোর তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। তার মতে, এতে জঙ্গিদের মনোবলও বেড়েছে।

ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনী জানিয়েছে, আইএসের একটি সন্দেহভাজন সেল মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সময় আত্মঘাতী হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। চারজন ইরাকি নিরাপত্তা ও সেনা কর্মকর্তা জানান, এই ঘটনা দেখিয়েছে যে দীর্ঘদিন সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও আইএস এখনো নিরাপত্তার ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে হামলা চালাতে সক্ষম।

কিরকুকের গুরুত্বপূর্ণ তেলনগরীর জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল খালিদ আল-বায়াতি বলেন, আইএস এমন হামলার মাধ্যমে দেখাতে চাইছে যে সংগঠনটি এখনো শক্তিশালী এবং বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী হামলা চালানোর সক্ষমতা তাদের রয়েছে।


সূত্র : রয়টার্স 

সময়ের আলো/ইউএমএইচ
  বিষয়:   ইরান  যুক্তরাষ্ট্র  মার্কিন বাহিনী 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: