স্বপ্ন ছিল সেতু হবে, পথ হবে সহজ। কৃষকের মাঠে পৌঁছাবে সেচের পানি, বর্ষার জলাবদ্ধতা পেরিয়ে স্বস্তি ফিরবে ফসলের জমিতে। কিন্তু সেই স্বপ্নের সেতুই নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই ভেঙে পড়েছে। বাঁশখালীতে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) নির্মাণাধীন একটি সেতুর অংশ ভেঙে পড়েছে। এর আগে ঢালাই দেওয়ার সময়ই সেতুটির নির্মাণকাজে অনিয়ম ও নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল। এবার নির্মাণাধীন অবস্থায় সেতুর একটি অংশ ধসে পড়ায় স্থানীয়দের সেই অভিযোগই যেন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সেতুটির নির্মাণাধীন একটি অংশ ভেঙে পড়ে। ধসে পড়া অংশে কংক্রিটের বুক চিরে রড বেরিয়ে থাকতে দেখা যায়। এতে ঢালাইয়ে ব্যবহৃত উপকরণের মান ও অনুপাত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, নির্মাণকাজে নির্ধারিত মান অনুসরণ করা হয়নি। পরে সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) ক্ষতিগ্রস্ত অংশটি পুরোপুরি ভেঙে নতুন করে নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ভাঙার সময় কংক্রিটের ভেতরের গঠন ও রডের বিন্যাস দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। আর সেই দৃশ্যই স্থানীয়দের মনে জন্ম দিয়েছে আরও নানা প্রশ্ন-কেমন ছিল ঢালাইয়ের মান, কীভাবে বাঁধা হয়েছিল রড, আর নির্মাণের প্রতিটি ধাপে কতটা মানা হয়েছে প্রকৌশলগত নিয়ম?
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সাতকানিয়া ইউনিট সূত্রে জানা যায়, বিএডিসির সেচ প্রকল্পের আওতায় ক্ষুদ্রসেচ উইং-এর অধীনে কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং ফসলের মাঠের জলাবদ্ধতা দূরীকরণের অংশ হিসেবে কাথরিয়া ইউনিয়নের মধ্যম মানিকপাঠান এলাকায় বকশিখালের ওপর সেতুটি নির্মাণ করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজে পাথরের খোয়ার পরিবর্তে ইটের খোয়া, তুলনামূলক সরু রড এবং পর্যাপ্ত পানি অপসারণ না করেই পানির মধ্যে কাজ করা হচ্ছে। কাজের শুরু থেকেই সেতুর ভিত্তি বা পাইলিং নিয়ে তাদের আপত্তি ছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী গোলাকৃতি কংক্রিটের ভিত্তি বা সাপোর্ট দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা যথাযথভাবে করা হয়নি। পাশাপাশি পাথরের পরিবর্তে ইটের খোয়া, নিম্নমানের বালু, নির্ধারিত মাপের তুলনায় ছোট রড ব্যবহার এবং ঢালাইয়ের আগে রড বাঁধার কাজ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেতুর বিভিন্ন অংশের রেলিং একই সরলরেখায় নেই; কোথাও কোথাও তা আঁকাবাঁকা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নির্মাণাধীন সেতুর ধসে পড়া অংশ, বেরিয়ে থাকা রড এবং দৃশ্যমান কংক্রিটের গঠন মিলিয়ে পুরো নির্মাণকাজের মান নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
মধ্যম মানিকপাঠান গ্রামের বাসিন্দা আতিকুর রহমান কনক বলেন, সেতুর নির্মাণকাজের শুরু থেকেই আমি কাজের মান নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছিলাম। এসবের জের ধরে আমার বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির অভিযোগ তোলা হয়েছিল। এখন সেতুর অংশ ভেঙে পড়েছে। কাজের মান কেমন হয়েছে, এখন তা জনগণ সরাসরি দেখছে।
আরেক বাসিন্দা মোবারক হোসেন বলেন, সেতুর নির্মাণকাজে কেউ বাধা দিলে বা অনিয়মের প্রতিবাদ করলে থানা-পুলিশ ডেকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এমন তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এক্সকাভেটর দিয়ে সাইড ভরাট করতে গিয়ে যদি ব্রিজ ভেঙে যায়, তাহলে মানুষ চলাচলের সময় কী অবস্থা হবে?
মোবারক হোসেন আরও বলেন, এলাকার সচেতন যুব সমাজ প্রথমে বাঁধা দিলে কাথরিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি জাহাঙ্গীর আলমের প্রভাব খাটিয়ে মাহবুব আলম এবং মনছুর যুবসমাজকে চাঁদাবাজ বলে গুজব রটিয়ে দেয়। তাই কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পায়নি।
বাঁশখালী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শ্যামল চন্দ্র সরকার বলেন, সাতকানিয়া ও দোহাজারীতে বিএডিসির অফিস আছে। সেখান থেকে এসব নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এটা আলাদা ডিপার্টমেন্ট। বিএডিসির প্রকৌশলীরা এসব নিয়ন্ত্রণ করেন। এখানে আমাদের হাত নেই।
তবে সেতুর অংশ ভেঙে পড়ার কারণ সম্পর্কে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেন। তিনি বলেন, ঢালাইয়ের পর কংক্রিট পূর্ণ শক্তি অর্জন করতে সাধারণত ২৮ দিন সময় লাগে। এর আগেই এক্সকাভেটর দিয়ে সেতুর আশপাশে মাটি দিতে গিয়ে চাপ পড়ায় এই অংশটি ভেঙে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশটি নতুন করে নির্মাণ করা হবে।
রেলিং আঁকাবাঁকা দেখানোর বিষয়ে মো. ইকবাল হোসেন বলেন, সিমেন্টের প্লাস্টারের সমস্যার কারণে রেলিংটি হয়তো আঁকাবাঁকা দেখাচ্ছে। ডিজাইন অনুযায়ী কাজ বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
সময়ের আলো/এনএন