এক মাস ধরে নিখোঁজ ১০ বছরের রিথি

শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি

সারাদেশ

গাজীপুরের শ্রীপুরে এক মাস ধরে নিখোঁজ রয়েছে ১০ বছরের শিশু রিথি আক্তার। গত ২৯ আগস্ট বিকেলে বাড়ি থেকে বের হওয়ার

2026-10-02T06:33:45+00:00
2026-10-02T06:33:45+00:00
 
  শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬,
১৭ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
এক মাস ধরে নিখোঁজ ১০ বছরের রিথি
শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৩৩ এএম 
ইনসেটে নিখোঁজ রিথি। ছবি : সময়ের আলো
গাজীপুরের শ্রীপুরে এক মাস ধরে নিখোঁজ রয়েছে ১০ বছরের শিশু রিথি আক্তার। গত ২৯ আগস্ট বিকেলে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর আর ফিরে আসেনি সে। এরপর আত্মীয়স্বজনের বাড়ি, আশপাশের এলাকা, বাজার, রেলস্টেশনসহ বিভিন্ন স্থানে খুঁজেও তার কোনো সন্ধান পাননি স্বজনেরা।

নাতনির ছবি হাতে প্রতিদিনই এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় ছুটে বেড়াচ্ছেন ৭১ বছর বয়সি নানা ইসমাইল শেখ। বয়সের ভার ও অসুস্থতাও তাঁকে থামাতে পারছে না। নাতনিকে ফিরে পাওয়ার আশায় কখনো মানুষের কাছে জানতে চাইছেন,কখনো অপরিচিত মানুষের হাতে রিথির ছবি তুলে দিচ্ছেন। দীর্ঘদিনেও সন্ধান না মেলায় দুশ্চিন্তা আর উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে পুরো পরিবারের।

রিথি আক্তার শ্রীপুর উপজেলার বরমী ইউনিয়নের লাকচতল ভিটিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। সে লাকচতল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। দুই বোনের মধ্যে রিথি ছোট। তার বড় বোন স্মৃতি আক্তারের বয়স ১৩ বছর। তাদের বাবা শাহাদাত হোসেন ও মা জোনাকি আক্তার।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় নয় বছর আগে রিথির বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়। পরে তাঁর মা জোনাকি আক্তার দ্বিতীয় বিয়ে করে স্বামীর বাড়িতে চলে যান। এরপর থেকেই রিথি ও তার বড় বোন স্মৃতি নানা ইসমাইল শেখ ও নানি নুরজাহান বেগমের কাছে বড় হয়ে আসছিল।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, গত ২৯ আগস্ট দুপুরে রিথির নানি নুরজাহান বেগম হাঁসের একটি বাচ্চা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। এ নিয়ে তিনি রিথির সঙ্গে কিছুটা রাগ করে কথা বলেন। পরে রিথি পাশের বাড়ির সমবয়সি এক শিশুর কাছে নিজের অভিমানের কথা জানায়। সেদিন বিকেল চারটার দিকে কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায় রিথি। সন্ধ্যা হলেও সে বাড়িতে না ফেরায় প্রথমে পরিবারের সদস্যরা আশপাশে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।

পরে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি, পরিচিতজনের বাসা ও আশপাশের বিভিন্ন স্থানে খোঁজ নেওয়া হয়। কিন্তু কোথাও পাওয়া যায়নি তাকে। পরে রিথির মামাতো বোন আফরিন আক্তার শ্রীপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এরপর পুলিশও শিশুটির সন্ধানে কাজ শুরু করে।

মঙ্গলবার দুপুরে রিথিদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির বাইরে একটি চেয়ারে বসে আছেন নানা ইসমাইল শেখ। গায়ে গামছা জড়ানো। মুখে ক্লান্তি, চোখে মুখে গভীর দুশ্চিন্তার ছাপ। অন্যদিকে বাড়ির প্রবেশপথে মাটিতে বসে ছিলেন অসুস্থ নানি নুরজাহান বেগম। নাতনির নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে প্রতিদিন তাকে খুঁজতে বের হন ইসমাইল শেখ। তবে অসুস্থতার কারণে মঙ্গলবার আর বের হতে পারেননি তিনি।

কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন ইসমাইল শেখ। তিনি বলেন, এমন কোনো দিন নাই যে আমি তারে খুঁজতে বাইর হই নাই। আজকা আমি অসুস্থ, তাই যাইতে পারতেছি না। কালকা ময়মনসিংহ রেলস্টেশনে খুঁজবার যাইয়াম। নাতনিকে খুঁজতে গিয়ে বিভিন্নজনের পরামর্শে কবিরাজের কাছেও গেছেন তিনি। 

ইসমাইল শেখ বলেন, যে যার কাছে যাইতে কইছে, তার কাছেই গেছি। কবিরাজের পর কবিরাজ ধরছি। একজন নখের মধ্যে তেল দিয়া কইছে, আমার নাতি উত্তর দিকে গেছে, শহরে হাঁটতাছে। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট জায়গা কইতে পারে নাই।

এরপর ঘরের ভেতর থেকে রিথির একটি ছবি নিয়ে আসেন তিনি। ছবিটি হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে থাকেন। পরে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, এই যে,এইডা রিথি। আমার রিথিরে যদি কোনো জায়গায় পান, তারে আমার বুকের মইধ্যে ফিরায়া দিয়েন। বাড়ির উঠানে টানানো রিথির পোশাক দেখিয়ে তিনি বলেন, এই যে রিথির কাপড়। এইগুলা পইড়া রইছে। কিছুই নিয়া যায় নাই।

কথা বলতে বলতে নিজের কষ্টের কথা তুলে ধরে ইসমাইল শেখ বলেন, ঘুমের মধ্যে শুনি রিথি আমারে ভাই কইয়া ডাকতাছে। ওইদিন ঘরের ভিতর থাইক্কা হুনি, বাইরে থেইক্কা রিথি আমারে ভাই কইয়া ডাকতাছে। দৌড়াইয়া বাইরে আইয়া দেহি, কিছুই নাই। খুব কষ্ট হয়।

নাতনির স্মৃতিতে বারবার কেঁদে ফেলছেন এই বৃদ্ধ নানা। রিথি কোথায় আছে, কেমন আছে—এই চিন্তাই যেন তাঁর প্রতিটি মুহূর্তকে ভারী করে তুলেছে।

এদিকে রিথির নানি নুরজাহান বেগমও অসুস্থ। কিছুদিন আগে স্ট্রোক করায় তিনি ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারেন না। তাই নাতনিকে খুঁজতে বাইরে যেতে পারছেন না। ঘরের ভেতর থেকে রিথির স্কুলব্যাগ নিয়ে আসেন তিনি। ব্যাগ থেকে একে একে বই-খাতা বের করে দেখাতে থাকেন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে নুরজাহান বেগম বলেন,রিথি আমার আর তার নানার লগো ঘুমাইতো। মা ছাড়া সন্তানরে মানুষ করছি। খালি পরান পোড়ে। মনে হয়, অক্কন যদি আইয়া পড়তো, তেইলে ভালো অইতো।

নাতনির সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, আমি তো স্ট্রোক করছিলাম, অচল। ওর নানা যায়। রিথি আমার সব কাজ কইরা দিত। আমারে গোসল করাইয়া দিত, রান্না করলে জাল দিয়া দিত।নাতনির এমন নিখোঁজ হয়ে যাওয়ায় অসুস্থ নানির বুকেও যেন কেবল শূন্যতা। ঘরের প্রতিটি জিনিসে রিথির স্মৃতি খুঁজে পান তিনি।
রিথির মামাতো বোন আফরিন আক্তার বলেন,আমার দাদা রিথির ছবি হাতে নিয়ে প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে খোঁজ করেন। আমরা সবাই যে যেখানে পারছি, খুঁজে যাচ্ছি। আমার দাদার কষ্ট অনেক। তিনি খালি কান্নাকাটি করেন। ঘুমের মধ্যেও রিথির নাম ধরে ডেকে ওঠেন।

তিনি আরও বলেন,আমরা সবাই রিথির জন্য অপেক্ষা করছি। এক মাস ধরে আমাদের প্রতিটি দিন দুশ্চিন্তায় কাটছে। রিথি কোথায় আছে, কেমন আছে কিছুই জানি না। আমরা চাই, যেভাবেই হোক রিথিকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হোক।

পরিবারের সদস্যরা জানান, রিথির পরনে কী পোশাক ছিল বা বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর সে কোন পথে গেছে এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য তাঁদের কাছে নেই। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তার সন্ধান না পাওয়ায় উদ্বেগ আরও বাড়ছে।

শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহীনুর আলম বলেন,সাধারণ ডায়েরির আলোকে পুলিশ কাজ করছে। শিশুটিকে উদ্ধারে প্রয়োজনীয়ভাবে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সামাজিক ও পারিবারিকভাবেও শিশুটির সন্ধানে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

রিথির পরিবার এখন শুধু একটি খবরের অপেক্ষায়—কোথাও কি দেখা মিলেছে তাদের ছোট্ট রিথির? এক মাস ধরে ছবি হাতে পথে পথে ঘুরছেন বৃদ্ধ নানা। অসুস্থ নানি ঘরের দরজায় বসে অপেক্ষা করছেন। আর বাড়ির উঠানে পড়ে থাকা রিথির পোশাক, স্কুলব্যাগ আর বই-খাতা যেন প্রতিদিনই মনে করিয়ে দিচ্ছে একটি শিশু নেই, কিন্তু তার অপেক্ষা শেষ হয়নি।

সময়ের আলো/আতা
  বিষয়:   নিখোঁজ  রিথি  সময়ের আলো  গাজীপুর  শ্রীপুর 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: