শেষ দিন পর্যন্ত কারও কাছে হাত পাতেননি। দারিদ্র্য, অবহেলা আর একাত্তরের নির্যাতনের ক্ষত বুকে নিয়েও আত্মমর্যাদা আঁকড়ে বেঁচে ছিলেন গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের ‘বীরাঙ্গনা’ রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতি। সেই দীর্ঘ লড়াইয়ের অবসান ঘটল বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর)। বার্ধক্য ও নানা শারীরিক জটিলতায় দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থাকার পর সন্ধ্যায় নিজ বাড়িতে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (২ অক্টোবর) বিকেলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হবে।
ফুলমতির ছেলে মনিরাজ কুমার জানান, তার মা বহুদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন। প্রায় দুই বছর আগে ব্রেইন স্ট্রোকে তার ডান হাত-পা অবশ হয়ে যায়। এরপর থেকে তিনি প্রায় পুরোপুরি শয্যাশায়ী ছিলেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিজ ঘরেই তার মৃত্যু হয়।
লেখক ও গবেষক জহুরুল কাইয়ুম সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক প্রকাশনা ‘হৃদয়ে একাত্তর’-এ ফুলমতির জীবনের কিছু তথ্য লিপিবদ্ধ আছে। সেখানে তাকে ‘ফুলমতি রানী’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। বইটি অনুযায়ী, তার বাবা অর্জুন রবিদাস, মা ফু রানী রবিদাস। জন্ম সাদুল্লাপুর থানার জামালপুর ইউনিয়নের মনোহরপুর গ্রামে। তার সংসারে এক মেয়ে সপ্তমী এবং চার ছেলে; রতন, নিরঞ্জন, মনিরাজ ও সুজন।
সাদুল্লাপুর উপজেলা শহরের উত্তরপাড়ায় ছিল ফুলমতির বাড়ি। তিনি প্রয়াত কুশিরাম সরকার ফসিয়ার স্ত্রী। স্বামী-সন্তান নিয়ে অত্যন্ত দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন তিনি। ১৯৮৮ সালে স্বামী মারা যাওয়ার পর সন্তানদের আগলে রেখে তাকে কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
পরিবারের সদস্যদের বর্ণনায়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে একদিন পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা ফুলমতিদের বাড়িতে ঢুকে পড়ে। তাকে ঘর থেকে বের করে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়।
‘হৃদয়ে একাত্তর’-এর বর্ণনা আরও মর্মান্তিক। সেখানে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট তারিখটি ফুলমতি কিছুতেই মনে করতে পারতেন না। কিন্তু সেই ভয়াল রাতের কথা বলতে গেলে আজও তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে যেত, বেদনায় আড়ষ্ট হয়ে পড়তেন তিনি। সেই রাতে হানাদাররা বাড়িতে ঢুকে স্বামীর বুকে রাইফেল ঠেকিয়ে তার সামনেই ফুলমতির ওপর নির্যাতন চালায়। অসহনীয় মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে সারা জীবন বেঁচে ছিলেন তিনি, হানাদারদের প্রতি বুকে ছিল প্রচণ্ড ঘৃণা।
স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত ছিলেন ফুলমতি। সরকারি দফতর ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে দীর্ঘদিন ধরনা দেওয়ার পর ২০১৬ সালের মার্চে তিনি বীরাঙ্গনা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পান। অপেক্ষা করতে হয়েছে পুরো ৪৫ বছর। স্বীকৃতি মেলার পর তার জীবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছিল বলে জানান স্বজনেরা।
‘হৃদয়ে একাত্তর’-এর তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীন দেশে ফুলমতির প্রাপ্তি ছিল সামান্যই। সাদুল্লাপুর উপজেলা সদরের পাশে সরকারি খাস জমিতে একটি জীর্ণ কুটিরে থাকতে হয়েছে তাকে। রাষ্ট্রের কাছ থেকে পেয়েছিলেন একটি বয়স্ক ভাতার কার্ড। তার ছেলেরা পূর্বপুরুষের পেশাতেই যুক্ত ছিলেন। ছেলেদের কেউ সরকারি চাকরি পেলে খুশি হতেন ফুলমতি।
২০১০ সালে ঢাকার স্টেপস্ টুয়ার্ডস্ ডেভেলপমেন্টের সহযোগিতায় স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা সেভ দ্য জেনেসিস ও উপজেলা সামাজিক উদ্যোক্তা দল তাকে সম্মাননা জানায় এবং কিছু উপহার দেয়।
সাদুল্লাপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশিদ আজমী বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে ফুলমতির ত্যাগ ও নির্যাতনের ইতিহাস অত্যন্ত বেদনাদায়ক। স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন তিনি স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত ছিলেন। অনেক চেষ্টা ও আবেদনের পর ২০১৬ সালে তা মেলে।
আজমী আরও বলেন, শয্যাশায়ী অবস্থায় ফুলমতির চিকিৎসায় সরকারি পর্যায় থেকে আরও সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল। তবে তিনি কিংবা তার পরিবারের সদস্যরা কারও কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাতেননি। শেষ দিন পর্যন্ত আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছেন এই সংগ্রামী নারী। তিনি বলেন, তাঁর মৃত্যুতে আমরা একজন অসম সাহসী এক নারীকে হারালাম।
ফুলমতির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। সাদুল্লাপুর উপজেলা ও জেলার মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, সাংবাদিক, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শোক জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ফুলমতি শুধু একজন নারী ছিলেন না, তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস। তার নির্যাতন, সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও আত্মমর্যাদার ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন। তার স্মৃতি সংরক্ষণে সমাধিস্থলে একটি স্মৃতিফলক বা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
বীরাঙ্গনাদের যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি দীর্ঘদিন ধরেই উঠছে। ‘হৃদয়ে একাত্তর’-এ বলা হয়েছে, সেই দাবি বাস্তবায়িত হলে ফুলমতির মতো বীরাঙ্গনা জননীরা অন্তত মর্যাদা নিয়ে মরতে পারবেন।
মৃত্যুকালে ফুলমতি চার ছেলে, এক মেয়ে, নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
সময়ের আলো/জোই