কোথাও ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে, কোথাও মেঝেতে গাদাগাদি করে চলছে চিকিৎসা। ৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে রোগীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। ফলে শয্যা না পেয়ে অনেক রোগীর ঠিকানা হচ্ছে বারান্দা কিংবা হাসপাতালের মেঝে। এ যেন অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা নিতে এসে আরেক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হওয়ার গল্প। এমন দৃশ্য বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের। সংস্কারের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে হাসপাতালের বিভিন্ন ভবন। প্রতিনিয়ত ছাদ থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই চলছে চিকিৎসাসেবা।
হাসপাতালের নার্স ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জানান, ভয় আর মৃত্যুঝুঁকিকে সঙ্গী করেই তাদের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে ছাদের অংশবিশেষ খসে পড়ে আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
শুধু ভবনের জরাজীর্ণতা নয়, জনবল সংকটেও অনেকটা থমকে আছে হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম। প্রায় ৭ লাখ জনসংখ্যার এই উপজেলার একমাত্র সরকারি হাসপাতালটিতে প্রতিদিনই বাড়ছে রোগীর চাপ। ৫০ শয্যার বিপরীতে ভর্তি থাকছেন প্রায় দ্বিগুণ রোগী। ফলে শয্যা সংকটে অনেককেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে মেঝেতে।
মেঝেতেই শিশুর চিকিৎসা
বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভর্তি রোগীদের পাশাপাশি জরুরি বিভাগেও ছিল রোগীর ভিড়। হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা। বিশেষ করে শিশু রোগীর উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, তাদের মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীও রয়েছেন।
হাসপাতালের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ময়লা-আবর্জনার চিত্রও চোখে পড়ে। এসব আবর্জনার আশপাশে ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার লার্ভা থাকার দৃশ্যও দেখা গেছে।
একদিকে রোগীর ভিড়, অন্যদিকে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ-সব মিলিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। হাসপাতালের পশ্চিম পাশে দীর্ঘদিন ধরে সীমানাপ্রাচীর না থাকায় হাসপাতালটি অনেকটা অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে।
জনবল সংকটে নাজুক সেবা
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, জুনিয়র কনসালট্যান্টের দুটি পদ-চক্ষু ও সার্জারি শূন্য রয়েছে। চারজন মেডিকেল অফিসার সংযুক্তিতে অন্যত্র কর্মরত। মেডিকেল অফিসারের আরও চারটি পদও শূন্য। এছাড়া সিনিয়র স্টাফ নার্স, মিডওয়াইফ, এসএসিএমও, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, এমএলএসএস, ওয়ার্ডবয়, কুক-মশালচি ও মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীসহ বিভিন্ন পদে মোট ৫৪টি পদ শূন্য রয়েছে। ফলে সীমিত জনবল নিয়ে অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মীদের।
রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, একদিকে রোগীর সংখ্যা ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি, অন্যদিকে প্রয়োজনের তুলনায় ওষুধের স্বল্পতা এবং চিকিৎসক-নার্সসহ জনবল সংকট। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হাসপাতাল ভবনের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা। সব মিলিয়ে চিকিৎসা নিতে এসে স্বস্তির বদলে আতঙ্ক নিয়েই ফিরতে হচ্ছে অনেককে।
হাসপাতালে প্রতিদিন রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় সংশ্লিষ্টরা ৫০ শয্যার হাসপাতালটি দ্রুত ১০০ শয্যায় উন্নীত করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ, প্রশাসনিক অনুমোদন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবল নিয়োগের দাবি উঠেছে।
আনসার সদস্যের বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ
চিকিৎসাসেবার সংকটের পাশাপাশি হাসপাতালের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত এক আনসার সদস্যের আচরণ নিয়েও অভিযোগ উঠেছে।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাওয়া মোহাম্মদ ইমন অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার স্ত্রীকে ভ্যাকসিন দেওয়ার জন্য জরুরি বিভাগে গেলে সাফিন সরকার নামে এক আনসার সদস্য আমার সাথে দুর্ব্যবহার করেন। আরেক নারী স্লিপ নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যেতে চাইলে তাকেও গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়।’
অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে মঙ্গলবার ও বুধবার বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে এ প্রতিবেদক বিষয়টি প্রত্যক্ষ করেন। অভিযোগ প্রসঙ্গে সাফিন সরকার বলেন, আমি কারও সাথে খারাপ ব্যবহার করিনি। তাকে খারাপ ব্যবহারের সাপেক্ষে অডিও রেকর্ড থাকার কথা জানানো হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।
বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মুমিনুল হক বলেন, ‘ডাক্তার, নার্স এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মী সংকট প্রবল। এক্স-রে টেকনোলজিস্ট না থাকায় কয়েক মাস ধরে এক্স-রে কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। প্রায় ৭ লাখ মানুষের এই উপজেলায় এটি একমাত্র সরকারি হাসপাতাল। প্রতিদিন শয্যার বিপরীতে প্রায় দ্বিগুণ রোগীকে সেবা দিতে গিয়ে সবাই হিমশিম খাচ্ছেন। হাসপাতালের সেবার মান বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় জনবল, ওষুধ ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা খুব জরুরি।’
আনসার সদস্যের অসদাচরণের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মুমিনুল হক বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাদেরকে কেউ অভিযোগ করেননি। আপনার কাছ থেকে প্রথম শুনলাম। আমি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।’
হাসপাতালের অভ্যন্তরে ড্রেনে ডেঙ্গু মশার লার্ভার উপস্থিতির বিষয়ে মুমিনুল বলেন, ‘আমাদের এখানে নতুন একটি ড্রেন নির্মাণ করার জন্য পৌরসভা কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে। তাদের উদ্যোগে একটি ড্রেন নির্মাণ করা হবে। এছাড়া আমাদের এখানে নতুন একটি ফগার মেশিন দেওয়া হয়েছে। আমরা এটি ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যবহার করবো।’
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. প্রিয়াংকা চক্রবর্তী বলেন, ‘স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ, নতুন করে হাসপাতাল ভবন নির্মাণ, অভ্যন্তরীণ সড়ক সংস্কার, রোগীদের জন্য নিজস্ব অক্সিজেন প্ল্যান্ট স্থাপন এবং পর্যাপ্ত সরকারি ওষুধ ও ল্যাবরেটরি সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।’
সময়ের আলো/এনএন