বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের লড়াইয়ে প্যাঙ্গোলিন এখন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম। শিকার, অবৈধ বাণিজ্য ও আবাসস্থল হারানোর চাপে আফ্রিকার এই অদ্ভুত প্রাণী দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। তবে গবেষক ও সংরক্ষণকর্মীদের নতুন কিছু উদ্যোগ তাদের বাঁচার আশাও দেখাচ্ছে। সন্ধ্যা নামার আগেই জেগে ওঠে প্যাঙ্গোলিন। দিনের বেশিরভাগ সময় ঘুমিয়ে কাটানো এই প্রাণীটি রাতের আঁধারে বের হয় খাবারের সন্ধানে। শক্তিশালী নখ দিয়ে পচা গাছের গুঁড়ি বা মাটির ঢিবি খুঁড়ে বের করে পিঁপড়া ও উইপোকা। তারপর লম্বা, আঠালো জিহ্বা দিয়ে একের পর এক পোকা তুলে নেয়।
দেখতে অনেকটা আঁশে ঢাকা ছোট্ট কোনো প্রাণীর মতো হলেও প্যাঙ্গোলিন আসলে অত্যন্ত স্বতন্ত্র এক স্তন্যপায়ী। এর শরীরের ওপরের অংশজুড়ে থাকা শক্ত কেরাটিনের আঁশ তাকে শিকারির আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। বিপদ টের পেলেই সে পালানোর বদলে শরীর গুটিয়ে শক্ত একটি বলের মতো হয়ে যায়। মাথা, পা ও শরীরের নরম অংশ লুকিয়ে ফেলে লেজের নিচে। শিকারির বিরুদ্ধে এই কৌশল অসাধারণ কার্যকর। কিন্তু মানুষের কাছে এসে সেই একই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হয়ে উঠেছে তার দুর্বলতা।
আঁশই যখন মৃত্যুর কারণ : আফ্রিকার অন্তত ৩৪টি দেশে প্যাঙ্গোলিনের দেখা মেলে। মহাদেশটিতে চারটি প্রজাতি রয়েছে— টেমিঙ্কের গ্রাউন্ড প্যাঙ্গোলিন, জায়ান্ট গ্রাউন্ড প্যাঙ্গোলিন, হোয়াইট-বেলিড প্যাঙ্গোলিন এবং ব্ল্যাক-বেলিড প্যাঙ্গোলিন। সবই অবৈধ বাণিজ্য ও শিকারের চাপে বিপন্নতার মুখে রয়েছে। প্যাঙ্গোলিনের মাংস কিছু অঞ্চলে খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিপদ এসেছে তার আঁশকে ঘিরে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক কালোবাজার থেকে।
প্যাঙ্গোলিনের আঁশ মূলত কেরাটিন দিয়ে তৈরি, মানুষের নখ ও চুলেও যে উপাদান পাওয়া যায়। অথচ এসব আঁশের কোনো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত ঔষধি গুণ নেই। তারপরও এশিয়ার কিছু বাজারে এগুলো ঐতিহ্যবাহী ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয় বলে বহুদিন ধরে এর চাহিদা রয়েছে। একই সঙ্গে কিছু জায়গায় প্যাঙ্গোলিনের মাংসও বিলাসী খাবার হিসেবে বিবেচিত হয়।
এশিয়ার প্যাঙ্গোলিনের সংখ্যা কমতে শুরু করার পর আন্তর্জাতিক পাচারকারীদের নজর আরও বেশি করে পড়ে আফ্রিকার দিকে। সাম্প্রতিক কয়েক দশকে আফ্রিকা থেকে অবৈধভাবে সংগৃহীত প্যাঙ্গোলিনের সংখ্যা কয়েক মিলিয়নে পৌঁছাতে পারে বলে গবেষণায় ধারণা করা হয়েছে।
২০১৬ সালে বিশ্বের দেশগুলো আটটি প্যাঙ্গোলিন প্রজাতির আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু আইন থাকলেই যে পাচার থেমে যায় না, প্যাঙ্গোলিনের গল্প তারই প্রমাণ। যেখানে আইন প্রয়োগ দুর্বল, সেখানে চোরাকারবারিরা এখনও সক্রিয়।
বাঁচানো প্রাণীকে আবার বনে ফেরানোও কঠিন : প্যাঙ্গোলিন উদ্ধারের পর সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় তাকে বাঁচিয়ে রাখা। কারণ প্রাণীটি অত্যন্ত বিশেষায়িত খাদ্যাভ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। একটি প্যাঙ্গোলিন প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পিঁপড়া ও উইপোকা খেতে পারে। আবার খাবারের ব্যাপারেও তারা বেশ খুঁতখুঁতে। একদিন যে প্রজাতির পিঁপড়া খেয়েছে, পরদিন সেটিই হয়তো আর খেতে চাইবে না। এ কারণে বন্দিদশায় প্যাঙ্গোলিন প্রায়ই খাবার প্রত্যাখ্যান করে। শুধু খাবার সামনে রেখে দিলেই হয় না; তাকে স্বাভাবিক পরিবেশে খাবার খোঁজার সুযোগ দিতে হয়।
জিম্বাবুয়ের এই জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে। সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা লিসা হাইউড প্রথম দিকে প্যাঙ্গোলিন সম্পর্কে খুব কমই জানতেন। কিন্তু একটি আহত প্যাঙ্গোলিনের দায়িত্ব নেওয়ার পর বছরের পর বছর পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তিনি বুঝতে শুরু করেন— এই প্রাণীকে বাঁচাতে কী প্রয়োজন। তাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল, প্যাঙ্গোলিনকে হাঁটতে দিতে হবে।
উদ্ধার করা প্রাণীদের নিয়মিত বনে বা প্রাকৃতিক পরিবেশের কাছাকাছি নিয়ে গিয়ে খাবার খুঁজতে দেওয়া হয়। এতে প্রাণীর স্বাভাবিক আচরণ বজায় থাকে, মানসিক চাপ কমে এবং খাবারের প্রতি আগ্রহ বাড়ে। পাশাপাশি নিয়মিত ওজন ও শারীরিক অবস্থাও পর্যবেক্ষণ করা হয়। অর্থাৎ প্যাঙ্গোলিন পুনর্বাসন শুধু একটি প্রাণীকে খাবার খাওয়ানোর কাজ নয়। এটি তার স্বাভাবিক জীবনযাপনকে যতটা সম্ভব ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।
ক্যামেরার চোখে ফিরছে জায়ান্ট প্যাঙ্গোলিন : আফ্রিকার সংরক্ষণ প্রচেষ্টায় কিছু আশার খবরও এসেছে। কেনিয়ার একটি এলাকায় গবেষকরা এমন একটি জায়ান্ট গ্রাউন্ড প্যাঙ্গোলিনের সন্ধান পান, যার উপস্থিতি দেশটিতে কয়েক দশক ধরে আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয়নি। ২০২১ সালে পাওয়া একটি ভিডিও গবেষকদের নতুন করে ওই অঞ্চলের প্যাঙ্গোলিন নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করতে উৎসাহিত করে। এরপর গবেষকরা জানতে পারেন, সুরক্ষাহীন বনাঞ্চলের একটি এলাকায় সম্ভবত প্রায় ২৫টি জায়ান্ট প্যাঙ্গোলিনের একটি ছোট জনগোষ্ঠী টিকে আছে।
কিন্তু তাদের সামনে বড় হুমকি ছিল বিদ্যুতায়িত বেড়া ও কৃষিজমির বিস্তার। প্যাঙ্গোলিন বেড়ায় আটকে গিয়ে মারা যেতে পারে। স্থানীয় জমির মালিকদের সঙ্গে কাজ করে সংরক্ষণকর্মীরা প্রায় ৮১ মাইল বেড়াকে বিদ্যুৎমুক্ত করেছেন। পাশাপাশি প্রায় ১৬ হাজার একর জমি সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের জন্য স্থানীয় মালিকদের সঙ্গে চুক্তিও করা হয়েছে। শুধু প্রাণী উদ্ধার করলেই যে সংরক্ষণ সম্ভব নয়, এই উদ্যোগ তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। প্যাঙ্গোলিনকে বাঁচাতে হলে তার আবাসস্থলও বাঁচাতে হবে।
পাচারকারীদের বিরুদ্ধেও বড় শাস্তি আসছে : প্রাণী সংরক্ষণের লড়াইয়ের আরেকটি দিক হলো আন্তর্জাতিক পাচার নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া। নাইজেরিয়া আফ্রিকার অবৈধ প্যাঙ্গোলিন বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে নাইজেরিয়ার কাস্টমস কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় বিপুল পরিমাণ প্যাঙ্গোলিনের আঁশ জব্দ করেছে। এসব আঁশের পরিমাণ ছিল ২৮ টনেরও বেশি এবং ধারণা করা হয়, সেগুলো সর্বোচ্চ প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার প্যাঙ্গোলিন থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। একই সময়ে পাচারচক্রের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন সদস্যকেও গ্রেপ্তার করা হয়। এই অভিযানগুলো দেখিয়েছে, অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্যকে থামানো অসম্ভব নয়। গোয়েন্দা তথ্য, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সংরক্ষণ সংগঠনগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টা পাচার নেটওয়ার্কের ওপর বাস্তব চাপ তৈরি করতে পারে।
ছোট প্রাণী, বড় লড়াই : প্যাঙ্গোলিনকে একসময় খুব কম মানুষ চিনত। কিন্তু আজ এটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পাচার হওয়া বন্য স্তন্যপায়ীদের একটি। এই প্রাণীর সংকট শুধু একটি প্রজাতি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বন, খাদ্যশৃঙ্খল, স্থানীয় মানুষের জীবন এবং আন্তর্জাতিক অবৈধ বাণিজ্যের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক। তবু গল্পটি পুরোপুরি হতাশার নয়।
আহত প্যাঙ্গোলিনকে চিকিৎসা দিয়ে আবার বনে ফেরানো হচ্ছে। গবেষকরা তাদের আচরণ ও প্রজনন সম্পর্কে নতুন তথ্য সংগ্রহ করছেন। স্থানীয় জমির মালিকরা আবাসস্থল সংরক্ষণে যুক্ত হচ্ছেন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো পাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। আর প্রতিদিন রাত নামলে, কোনো এক আফ্রিকান বনের অন্ধকারে, একটি প্যাঙ্গোলিন হয়তো আবার তার লম্বা নাক মাটির কাছে নামিয়ে খাবারের গন্ধ খুঁজছে।
তার শরীরের আঁশ তাকে শিকারির দাঁত থেকে রক্ষা করতে পারে। কিন্তু তাকে মানুষের লোভ থেকে রক্ষা করতে প্রয়োজন মানুষেরই আরেক শক্তি— সংরক্ষণের ইচ্ছা।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও