এই হচ্ছে, এই হবে বলে আর ঘোষণা হচ্ছে না জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি। কয়েক মাস ধরেই এমন আলোচনার মধ্যে আটকে আছে নতুন কমিটি ঘোষণা। রাজনৈতিক ও ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতাসীন বিএনপি চেষ্টা করছে তাদের গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব রানিং ছাত্রদের হাতে তুলে দিতে। যদিও দলের দায়িত্বশীলদের কেউ কেউ চান ছাত্রত্ব না থাকলেও রাজপথের ত্যাগী ও লড়াকুরা নেতৃত্বে আসুক। এই দোটানায় থমকে আছে নতুন কমিটি ঘোষণা। তবে শিগগিরই এই দুইয়ের সমন্বয়ে নতুন নেতৃত্ব বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন ছাত্রদলের বর্তমান ও সাবেক নেতারা।
মাঠের রাজনীতিতে বিএনপির ভ্যানগার্ড হিসেবে পরিচিত জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে সাত মাস আগে। গত ১৪ আগস্ট সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ শীর্ষ নেতারা বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিদায়ের বার্তা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের কাছে নতুন নেতৃত্বের পছন্দের তালিকা নেন গোপন ব্যালটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা বিদায়ের আবেগী কথা তুলে ধরেছেন। তাদের অনুসারী সমর্থক শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায়ও নেন। এর পর থেকে প্রতিদিনই আলোচনায় ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব। সম্ভাব্য তালিকা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, পদপ্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপও ছিল তুঙ্গে। কিন্তু আজ পর্যন্ত নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা হয়নি।
সূত্রে জানা গেছে, নতুন কমিটি নিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে কাজ করছেন গুটি কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। এর মধ্যে বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক ও সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল, দলের বিশেষ সম্পাদক বেলায়েত হোসেন মৃধা ও প্রধানমন্ত্রীর গবেষণা কর্মকর্তা আব্দুস সাত্তার পাটোয়ারী অন্যতম। তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ে কাজ করছেন। প্রধানমন্ত্রী নিজেও বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে তথ্য যাচাই-বাছাই করছেন।
মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, চলমান ছাত্ররা থাকবে নতুন নেতৃত্বে নাকি নতুন কমিটিতে মূল্যায়িত হবে ত্যাগী ও আন্দোলনে সক্রিয় থাকা ছাত্রনেতারা। যদিও তাদের বেশিরভাগের সেশন ২০০৮, ২০০৯, ২০১০ কিংবা ২০১১ সাল। অর্থাৎ বেশিরভাগের ছাত্রত্ব শেষ হয়েছে প্রায় বছর দশের আগে। আর যাদের ছাত্রত্ব আছে তাদের বয়সও প্রায় ত্রিশ ছুঁইছুঁই। ত্যাগী ও পদপ্রত্যাশীদের বেশিরভাগের বয়স ৩৫-এর আশপাশে। তাদের ভাষ্য— তারা ফ্যাসিবাদের আমলে আন্দোলন-সংগ্রামে থাকায় পড়াশোনা সঠিক সময়ে শেষ করতে পারেননি। অনেকে ছাত্রত্বের তকমা ধরে রাখতে সান্ধ্যকালীন মাস্টার্স কিংবা এমফিলে ভর্তি হয়ে আছেন। এসব নানা সমীকরণে জট বেঁধে আছে ছাত্রদলের নেতৃত্বে।
ছাত্রদলের সাবেক এক নেতা সময়ের আলোকে বলেন, তারেক রহমান উল্লেখ করেছেন, কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেলে দ্রুত সংগঠনে নতুন নেতৃত্ব আনতে চান। অর্থাৎ ছাত্রদলে নিয়মতান্ত্রিকভাবে কমিটি করতে চান সাংগঠনিক অভিভাবক তারেক রহমান। ভবিষ্যতে এর ব্যত্যয় হবে না। কমিটি দিতে এত দেরি কেন? জবাবে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ডাকসুর সাবেক জিএস খায়রুল কবির খোকন এমপির সাফ জবাব, প্রধানমন্ত্রী এটি ভালো জানেন। তবে কমিটি গঠনের কাজ প্রক্রিয়াধীন। যেকোনো সময় তা ঘোষণা হতে পারে।
আরেক নেতা মনে করেন, ছাত্রদল এখন হাফ হার্টেট অবস্থায় আছে। পূর্ণশক্তি তাদের নেই। আবার কমিটিও বিলুপ্ত হয়নি। নতুন নেতৃত্ব আসার অপেক্ষায় আছে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। দেরি হওয়ার কারণে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মারামারি বা অন্য ইস্যুতে বাড়াবাড়ি হচ্ছে। দ্রুত কোনো সমাধান করতেও পারছে না বর্তমান নেতৃত্ব। তাই ছাত্রদলের কমিটি দ্রুত হওয়া দরকার।
বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির দুই বছরের মেয়াদ গত ১ মার্চ শেষ হয়েছে। ২০২৪ সালের ১ মার্চ গঠিত এ কমিটির সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার মেয়াদ ফুরিয়ে গেছে। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়ে সংগঠনের ভেতরে-বাইরে আলোচনা বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে দলীয় অঙ্গনজুড়ে সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে চলছে নানা জল্পনা।
জানা গেছে, সম্ভাব্য নেতৃত্বের রাজনৈতিক অতীত, ছাত্রত্ব, সাংগঠনিক পরিচয় এবং অন্য ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে অতীত বা বর্তমান সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ নতুন করে বারবার যাচাই করা হচ্ছে। অর্থাৎ ৫ আগস্ট পরবর্তী নেতিবাচক কর্মকাণ্ডগুলো বড় হয়ে সামনে আসছে। সেই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে পরাজয়ের নেপথ্যের বিষয়গুলো সন্দেহ আকারে দেখছেন নীতিনির্ধারকরা।
পদপ্রত্যাশী ছাত্রদল নেতারা বলছেন, বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকে আমরা নতুন কমিটির অপেক্ষায় আছি। আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত নেতাদের দিয়েই নতুন কমিটি গঠন করা হলে সংগঠন আরও শক্তিশালী হবে। তাদের ভাষ্য, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন দলের সাংগঠনিক অভিভাবক বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি যাকে যে দায়িত্ব দেবেন, সেটিই সবাই মেনে নেবে।
বিএনপি চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ একজন নেতা সময়ের আলোকে বলেন, বর্তমান যুগের বাস্তবতা ও সমসাময়িক ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মেধাবী ছাত্রদের হাতে ছাত্রদলের নেতৃত্ব তুলে দিতে চান তারেক রহমান। বিশেষ করে জেন-জি প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুযায়ী নেতৃত্ব ঠিক করতে চান তিনি। তবে এটি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে যে এত বড় ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্বে অভিজ্ঞতারও প্রয়োজন রয়েছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা