নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ বাতিল না হলে আগামী ৮ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও, ইজারা বন্ধের দাবিতে ৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টায় বন্দর ভবনের সামনে থেকে মশাল মিছিল এবং ১৩ অক্টোবর বন্দর ভবন ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) বেলা ১১টা ২০ মিনিটে বন্দরের প্রশাসনিক ভবনের বাইরে অবস্থান কর্মসূচি থেকে এসব ঘোষণা দেওয়া হয়। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটি সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এই কর্মসূচি পালন করে। এ সময় বন্দরকেন্দ্রিক শ্রমিক-কর্মচারী সংগঠনের নেতারা এসে অবস্থান কর্মসূচিতে যোগ দেন। এতে সরকারদলীয় শ্রমিকদল, বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারাও অংশ নেন।
কর্মসূচির কারণে বন্দরের প্রশাসনিক ভবনের আশপাশের সড়কে যানবাহন চলাচল দুপুর পর্যন্ত বন্ধ ছিল। এ সময় পুলিশ, বন্দর নিরাপত্তা বিভাগসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। তবে অবস্থান কর্মসূচি দুপুর দেড়টার পর পরই শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন বললেন, এনসিটি ইজারা দেওয়ার বিষয়ে আগামী ৮ অক্টোবর ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি হতে পারে বলে শোনা যাচ্ছে। যদি তাই হয় তাহলে চুক্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর বন্ধ হয়ে যাবে। সরকারকে আহ্বান জানাচ্ছি সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার করার।
বন্দর রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব ফজলুল কবির মিন্টু বললেন, সরকার যখন অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগ বাড়ানোর মতো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। তখন এনসিটি ও সিসিটির মতো কৌশলগত অবকাঠামো দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দিতে কেন এত তাড়াহুড়ো করছে তা জনগণের কাছে ব্যাখ্যা করতে হবে।
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার বলেন, বর্তমান বন্দর চেয়ারম্যান ডিপি ওয়ার্ল্ডের স্বার্থে কাজ করছেন। বন্দর ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। বন্দর চেয়ারম্যানকে প্রত্যাহারের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।
জাতীয়তাবাদী বন্দর শ্রমিক দলের নেতা হুমায়ুন কবীর বলেন, আশা করেছিলাম সরকার এনসিটি ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ বন্ধ করবে। শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু আমরা হতাশ।
ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের (টিইউসি) সভাপতি তপন দত্ত বলেন, দাবি আদায়ে ১৩ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যানকে ঘেরাও করা হবে। কার্যালয় থেকে বের হতে দেওয়া হবে না।
ডক শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন সেলিম বললেন, এনসিটি বিদেশি অপারেটরকে ইজারা দেওয়া যাবে না। বিদেশিদের ইজারা নিয়ে সরকার আমাদের বুঝিয়ে দেবে অন্যথায় আমরা নিজেরাই বুঝে নেবো। এভাবে আমরা আর বসে থাকব না।
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শ ম জামাল উদ্দিন বললেন, বন্দরের পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশিদের হাতে দেওয়া হলে তারা নামমাত্র কর দিয়ে বড় অংশের অর্থ নিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা আছে। দেশীয় জনবল দিয়ে বন্দর পরিচালনা করলে এর আয় দেশের অর্থনীতিতেই থাকবে।
এসময় আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি এস কে খোদা তোতন, ডক শ্রমিক দলের সভাপতি মো. হারুন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি অশোক সাহা, বাসদ মার্ক্সবাদী চট্টগ্রাম জেলার সমন্বয়ক শফিউদ্দিন কবির আবিদ, গণমুক্তি ইউনিয়নের সমন্বয়ক রাজা মিয়া, স্কপ চট্টগ্রামের যুগ্ম সমন্বয়ক রবিউল হক শিমুল, টিইউসি চট্টগ্রাম জেলার যুগ্ম সম্পাদক ইফতেখার কামাল খান, চট্টগ্রাম যুব ট্রেড ইউনিয়ন নেটওয়ার্কের সদস্য সচিব হাসিবুর রহমান বিপ্লব, ল্যাসিং-আনল্যাসিং শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. ইকবাল, মার্চেন্ট শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নূর হোসেন, উইঞ্চ অপারেটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ইমাম হোসেন খোকনসহ বিভিন্ন শ্রমিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা।
উল্লেখ্য, গেল ১ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার ভার বিদেশি অপারেটরদের হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বৃহস্পতিবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে এনসিটির দায়িত্ব আন্তর্জাতিক অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার খসড়া চুক্তি অনুমোদনের কথা বলা হয়েছে। এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব কোন বিদেশি অপারেটরকে দেওয়া হয়েছে তা বলা হয়নি বিজ্ঞপ্তিতে। তবে দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এ টার্মিনাল ইজারা দেওয়া হচ্ছে বলে ব্যাপকভাবে আলোচনা আছে। গত জুনের প্রথম সপ্তাহে এনসিটি ইজারা বিষয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয় সরকার। এর আগে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করার উদ্যোগ নিয়েও শেষ সময়ে স্থগিত করে অন্তর্বর্তী সরকার। বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর নতুন করে এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দিতে প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপর থেকে আন্দোলন জোরদার করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
সময়ের আলো/আতা