মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোর আগেই অর্ধেক শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার তথ্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য গভীর উদ্বেগের। এ ব্যর্থতাকে কেবল শিক্ষার্থীর অনীহা বা পরিবারের অসচেতনতা বলে দায় এড়ানো যাবে না। দারিদ্র্য, শিক্ষার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, বাল্যবিয়ে, শিশুশ্রম ও নিরাপত্তাহীনতা— সব মিলিয়ে বহু শিক্ষার্থীর সামনে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে।
চলতি বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১৮ লাখ ৫৭ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৪৪ হাজার ৭৮০ জন। কিন্তু পাস করা শিক্ষার্থীদের মধ্যেও প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করেনি।
তার আগে নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের প্রায় সাড়ে চার লাখ পরীক্ষায় অংশই নেয়নি। পরীক্ষায় অনুপস্থিত, অকৃতকার্য এবং পাস করেও ভর্তি না হওয়া— সব মিলিয়ে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার চিত্রটি তাই আরও ভয়াবহ।
একদিকে কলেজগুলোতে ২৬ লাখের বেশি আসন, অন্যদিকে ভর্তি হয়েছে তুলনামূলকভাবে অনেক কম শিক্ষার্থী। ১২টি কলেজে কোনো আবেদন পড়েনি, ৪১৬টি কলেজে আবেদন থাকলেও কেউ ভর্তি হয়নি। আবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীসহ কিছু আবেদনকারী কোনো কলেজে বরাদ্দ পায়নি।
এই বৈপরীত্য শুধু ভর্তি ব্যবস্থার ত্রুটি নয়; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান ও শিক্ষার্থীদের পছন্দের অসম বণ্টনও সামনে আনে। তবে আসন খালি থাকার হিসাব দিয়ে ঝরে পড়ার বাস্তবতা আড়াল করা যাবে না। কলেজে যাওয়ার সামর্থ্য, আগ্রহ ও সুযোগ— তিনটিই সবার জন্য সমান নয়।
শিক্ষার ব্যয় বাড়ছে, অথচ দরিদ্র পরিবারের আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। ভর্তি ফি, বেতন, বই-খাতা, যাতায়াত, কোচিং— সব মিলিয়ে পড়াশোনা অনেক পরিবারের কাছে ক্রমেই অসহনীয় ব্যয়। একাধিক সন্তান থাকলে চাপ আরও বাড়ে।
এডুকেশন ওয়াচের গবেষণায় অর্থনৈতিক অসচ্ছলতাকে ঝরে পড়ার বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই উপবৃত্তির অর্থ বাড়ানো এবং তা সময়মতো পৌঁছানো জরুরি। পাশাপাশি স্কুল ফিডিং কর্মসূচি নিয়মিত ও কার্যকর করতে হবে, যাতে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা বিদ্যালয়ে থাকা ও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার বাস্তব সহায়তা পায়।
বাল্যবিয়ে ও শিশুশ্রমের ক্ষেত্রেও কেবল আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। মেয়েদের নিরাপদে বিদ্যালয়ে যাতায়াত নিশ্চিত করা, পরিবার ও সমাজে সচেতনতা বাড়ানো এবং দরিদ্র পরিবারের জন্য সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করতে হবে। অঞ্চলভেদে ঝরে পড়ার কারণ আলাদা হতে পারে; তাই এক ধরনের কর্মসূচি দিয়ে সবার সমস্যার সমাধান হবে না। বিদ্যালয়, স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজকল্যাণ সংস্থার সমন্বয়ে ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে সহায়তা দিতে হবে।
বিনামূল্যের পাঠ্যবই, উপবৃত্তি, শিক্ষক নিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন শিক্ষায় অগ্রগতি এনেছে— এ অর্জন অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু অগ্রগতির প্রকৃত মাপকাঠি শুধু ভর্তি বা পরীক্ষার্থীর সংখ্যা নয়; কতজন শিক্ষার্থী মাধ্যমিক শেষ করে পরবর্তী ধাপে যেতে পারছে, সেটিও দেখতে হবে। ঝরে পড়া ঠেকাতে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। কারণ একজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনা থেমে যাওয়া তার একার ব্যর্থতা নয়— এটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব পালনে ঘাটতির প্রতিফলন।
তাই সংশ্লিষ্টদের বিযয়টি জাতীয় সংকট হিসেবে দেখতে হবে। যাতে সংকট উত্তরণের দিকনির্দেশনা থাকে। মাধ্যমিকে পদক্ষেপ হিসেবে বিদ্যালয় ও অভিভাবকের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো দরকার। ক্লাসে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীকে চিহ্নিত করতে হবে এবং তার ব্যাপারে খোঁজখবর রাখতে হবে।
যেসব শিক্ষার্থী সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে না, তাদের প্রয়োজনে কারিগরি শাখায় যুক্ত করা যেতে পারে। শিক্ষা উপকরণের দাম কমাতে হবে। শিক্ষা বিস্তারে দারিদ্র্যবান্ধব যেসব কর্মসূচি রয়েছে, সেগুলো সফল করে তুলতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের শিক্ষা যাতে আনন্দদায়ক হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখা প্রয়োজন। তা হলে কেবল এ সংকট উত্তরণ সম্ভব।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে