হাত না থাকায় জীবনের শুরুতে যাকে করুণার চোখে দেখা হয়েছিল, আজ তিনি পুরো এলাকার এক উজ্জ্বল বাতিঘর। নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে সম্বল করে পা দিয়েই ব্লাকবোর্ডে লিখছেন এবং ছড়িয়ে দিচ্ছেন শিক্ষার আলো। বলছি ২০০৭ সাল থেকে নরসিংদী সদরের নগর পাঁচদোনা এলাকায় প্রতিষ্ঠিত ‘প্রতিভা দুখু মিয়া কিন্ডারগার্টেন’-এর প্রতিষ্ঠাতা আলতাফ হোসেন ওরফে দুখু মিয়ার কথা।
১৯৬২ সালে নরসিংদী সদর উপজেলার নগর পাঁচদোনা এলাকায় জন্ম নেন আলতাফ হোসেন। জন্মের সময় তার দুটি হাতই ছিল না। চরম হতাশায় বাবা-মা ভালোবেসে তার নাম রেখেছিলেন ‘দুখু মিয়া’। তবে কে জানত, এই দুখু মিয়া একদিন হাজারো শিশুর দুঃখ দূর করে শিক্ষার আলো ছড়াবেন! শৈশবেই তার পড়াশোনার প্রতি দারুণ আগ্রহ দেখে হাল ছাড়তে দেননি মা-বাবা।
ছেলের পড়াশোনার বন্দোবস্ত করতে মা মাটির চুলায় রান্না করা পাতিলের তলা থেকে কালো কালি চেঁছে বের করতেন। সেই কালো গুঁড়ো একটি পাত্রে রেখে পানি মিশিয়ে তৈরি করতেন লেখার কালি। আর বাবা বাঁশের কঞ্চি কেটে বানিয়ে দিতেন দোয়াত-কলম। মায়ের বানানো সেই কালিতে কঞ্চির কলম ভিজিয়ে কলাপাতায় পায়ের আঙুল দিয়েই শুরু হয় দুখু মিয়ার অক্ষরের হাতেখড়ি। কলাপাতায় শুরু হওয়া সেই অক্ষরজ্ঞানই পরবর্তীতে তার জীবনের মূল শক্তিতে পরিণত হয়।
ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করতে বাবা তাকে একবার মাদ্রাসায় নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ‘পা দিয়ে আরবি বই স্পর্শ করা যাবে না’—এমন অজুহাতে শিক্ষকরা তাকে ফিরিয়ে দেন। দমে না গিয়ে বাবা তাকে গ্রামেরই একটি সাধারণ স্কুলে ভর্তি করান। হাত না থাকায় অনেকেই তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতেন; কিন্তু মা-বাবার অদম্য অনুপ্রেরণা আর নিজের পা-কেই তিনি ভাগ্য বদলের হাতিয়ার বানিয়ে নেন। পায়ের আঙুলের ফাঁকে কলম গুঁজে চালিয়ে যান পড়াশোনা। পা দিয়ে লিখেই তিনি ১৯৮২ সালে এসএসসি এবং ১৯৮৪ সালে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ১৯৮৬ সালে নরসিংদী সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।
উচ্চশিক্ষার সনদ হাতে থাকার পরও চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হন দুখু মিয়া। দুই হাত না থাকার কারণে সরকারি বা বেসরকারি— কোথাও মেলেনি কোনো চাকরি। নিরুপায় দুখু মিয়া সংসারের হাল ধরতে টিউশনি শুরু করেন। পরে, ২০০৭ সালে নিজের জমানো মূলধন আর অদম্য স্বপ্নকে সঙ্গী করে পৈতৃক জমিতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘প্রতিভা দুখু মিয়া কিন্ডারগার্টেন’।
যে সমাজ তাকে একসময় করুণার চোখে দেখত, আজ সেই সমাজই তাকে নিয়ে গর্ব করে। তিনি প্রমাণ করেছেন, হাত না থাকলেও কেবল মনের জোরে জীবনের সব বাধা জয় করা সম্ভব।
বর্তমানে এই বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হয় এবং দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। স্কুলটি পরিচালনায় ৯ জন শিক্ষক নিয়োজিত আছেন। তবে শিক্ষকদের নিয়মিত বেতন দিতে গিয়ে তাকে বেশ হিমশিম খেতে হয়; অনেক সময় দুই-তিন মাসও পার হয়ে যায়।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে দুখু মিয়া বলেন, চেষ্টা করছি স্কুলটিকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করার। সরকারের কাছে আমার আবেদন, স্কুলটিকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের অনুমোদন দেওয়া হোক এবং শিক্ষকদের নিয়মিত বেতন পরিশোধের জন্য যেন কোনো আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়।
সময়ের আলো/আতা