সার কিনতে গেলে সঙ্গে ভুট্টার বীজ কেনার শর্ত দেওয়া হচ্ছে। বীজ কিনতে রাজি না হওয়ায় সার না পেয়ে ফিরে আসতে হয়েছে কৃষকদের। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে বিএডিসির সার ডিলার মো. খায়রুল ইসলামের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছে।
কৃষকদের দাবি, এক বস্তা সার নিতে হলে চার প্যাকেট ভুট্টার বীজ কিনতে বলা হচ্ছে। এতে বাড়তি খরচের চাপে পড়ার পাশাপাশি চাষাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় সার পাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তারা।
অভিযুক্ত খায়রুল ইসলাম উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের পূর্ব বেলকা গ্রামের আলহাজ্ব মো. মোজাব্বার হোসেনের ছেলে। তিনি নিজের নামে ‘মেসার্স খায়রুল ইসলাম’ এবং স্ত্রী মোছা. আরিফা বেগমের নামে ‘মেসার্স রুফাইদা ট্রেডার্স’ পরিচালনা করেন। খায়রুল ইসলাম বেলকা ডিগ্রি কলেজে এবং তার স্ত্রী বেলকা বটতলা দাখিল মাদ্রাসায় কর্মরত।
কৃষকদের অভিযোগ, জমিতে কোন ফসলের আবাদ হচ্ছে, তা বিবেচনা না করেই সার কেনার সঙ্গে ভুট্টার বীজ কেনার শর্ত দেওয়া হচ্ছে। অথচ অনেক কৃষকের জমিতে এখনো ধান রয়েছে। অন্যদিকে আলু, মরিচ, পেঁয়াজ ও বেগুনের আবাদেও সার প্রয়োজন। এ অবস্থায় ভুট্টার বীজ কিনতে বাধ্য হলে তাঁদের অপ্রয়োজনীয় খরচ বাড়বে।
বেলকা ইউনিয়নের পঞ্চানন্দ পলাশতলা গ্রামের কৃষক মো. বাবুল মণ্ডল (৫০) বলেন, আমি বিএডিসি ডিলার খায়রুল ইসলামের ঘরে সার নিতে গিয়েছিলাম। তখন তাঁর ছেলে ঘরে ছিলেন। সার চাইলে তিনি বলেন, এক বস্তা সার নিতে হলে চার প্যাকেট ভুট্টার বীজ নিতে হবে। আমি বলি, এখন আমার কাছে এত টাকা নেই। তাছাড়া জমিতে এখনো ধান আছে। এত তাড়াতাড়ি ভুট্টার বীজ নিয়ে কী করব? তবুও তিনি রাজি হননি। পরে এক প্যাকেট বীজের দাম জানতে চাইলে ৬০০ টাকা বলেন। টাকা না থাকায় সার না নিয়েই ফিরে আসি।
একই গ্রামের কৃষক মো. শহিদুল ইসলাম (৪৮) বলেন, আমি সার নিতে গেলে বলা হয়, ভুট্টার বীজ না নিলে সার দেওয়া হবে না। অথচ এখন জমিতে আলু, মরিচ, পেঁয়াজ ও বেগুনের আবাদ হচ্ছে। এসব ফসলের জন্যও সার প্রয়োজন। পরে আমরা কৃষি অফিসে অভিযোগ দিয়েছি।
বেলকা বাজারের কৃষক মো. আবদুর রহিম মিয়া (৫৫) বলেন, সার নিতে গেলে বলা হয়, এখনো সার আসেনি, পরে আসতে। আবার গিয়ে দেখি ঘর বন্ধ। স্বামী-স্ত্রী দুজনই ডিলার। সার পাওয়ার পর এর একটি অংশ বাইরে বিক্রি করে দেওয়া হয় বলেও শোনা যায়।
নীতিমালা বলছে, কৃষি মন্ত্রণালয়ের ৩০ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০২৬’-এ ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিধান রাখা হয়েছে। নীতিমালার ৩.১.১ ধারায় বলা হয়েছে, একই অন্নে বা পরিবারে বসবাসরত স্বামী-স্ত্রী, ছেলেমেয়ে বা নাতি-নাতনিরা ডিলারশিপ নিতে পারবেন না। ৭ অক্টোবর আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত এ বিধানের বিষয়ে হাইকোর্টের দেওয়া স্থিতাবস্থার আদেশ স্থগিত করেন। ফলে একই পরিবারের একাধিক সদস্যের ডিলারশিপের সুযোগ বন্ধ রাখার বিধান কার্যকর রয়েছে বলে অ্যাটর্নি জেনারেল জানিয়েছেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে বিএডিসি সার ডিলার খায়রুল ইসলাম বলেন, আমার বিরুদ্ধে যারা কৃষি অফিসে অভিযোগ দিয়েছেন, তাঁদের কেউ আমার ঘরে সার নিতে আসেননি। তাঁরা আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিয়েছেন।
স্বামী-স্ত্রী দুজনের নামে ডিলারশিপ থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যস্ততার কথা জানিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন তিনি।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, এ-সংক্রান্ত একটি অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্তের জন্য একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর স্বামী-স্ত্রী দুজনের ডিলারশিপ ও চাকরির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
সার বিতরণে নজরদারি প্রসঙ্গে কৃষি কর্মকর্তা বলেন, সার বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার কোনো ঘাটতি নেই। তবে সব সময় কোনো ডিলারের কাছে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার বসে থাকা সম্ভব নয়। তাঁদের আরও কাজ রয়েছে। তাঁরা নির্দিষ্ট দিনে ও সময়ে ডিলার পয়েন্টে গিয়ে খোঁজখবর নেন।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট দফতর প্রধানকে বলব।
সময়ের আলো/এনএন