গাজা যুদ্ধের মধ্যেই ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। এমনকি ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের কয়েকজন পশ্চিমা মিত্র যখন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের সমালোচনা করে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে, তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করছে। বিশ্লেষকদের মতে, গাজা যুদ্ধ এই ঘনিষ্ঠতার প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
এর সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোতরিচের ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের ভারত সফর। সে সময় যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা ও নরওয়ে তাঁর ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়নও স্মোতরিচ ও আরেক কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
এর বিপরীতে ভারত সফরে স্মোতরিচকে স্বাগত জানানো হয়। নয়াদিল্লিতে তিনি একটি বিনিয়োগ চুক্তিতে সই করেন, মুম্বাইয়ে স্টক এক্সচেঞ্জ পরিদর্শন করেন এবং গুজরাটে একটি নতুন বিনিয়োগকেন্দ্র ঘুরে দেখেন। আল জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গাজায় ইসরায়েলি হামলা চলার সময় এই সফর ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের পরিবর্তিত চিত্রকে আরও স্পষ্ট করে।
ভারতের ইসরায়েল নীতিতে পরিবর্তন অবশ্য মোদি সরকারের আমলেই শুরু হয়নি। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯২ সালে। তবে ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর সম্পর্কটি আরও প্রকাশ্য ও কৌশলগত রূপ নেয়। ২০১৬ সালে মোদি প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইসরায়েল সফর করেন।
এর আগে ভারত ঐতিহাসিকভাবে ফিলিস্তিনের প্রতি জোরালো সমর্থন দেখিয়েছে। ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সেই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছিল ভারত, যেখানে জায়নবাদকে বর্ণবাদের একটি রূপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থাকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম অ-আরব দেশগুলোর একটি ছিল ভারত এবং ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া দেশগুলোর মধ্যেও ছিল নয়াদিল্লি।
৭ অক্টোবরের পর বদলে যায় সুর
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েল হামলার পরপরই মোদি এটিকে ‘সন্ত্রাসী হামলা’ হিসেবে নিন্দা করেন। পরবর্তী সময়ে ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও দৃশ্যমান হয়।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েল সফরের সময় মোদি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দুই দেশের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বলেন। ইসরায়েলি পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে নেতানিয়াহু মোদিকে ইসরায়েলের ‘মহান বন্ধু’ এবং ‘ভাই’ হিসেবে অভিহিত করেন।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজা যুদ্ধের সময় ইসরায়েলের কাছে ভারতের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের বিষয়েও বিভিন্ন তদন্ত ও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। একই সময়ে মোদি সরকারের অধীনে ভারত ইসরায়েলি অস্ত্রের অন্যতম বড় ক্রেতায় পরিণত হয়েছে।
নয়াদিল্লির এই নীতির পেছনে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয়টিও ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন কিছু বিশ্লেষক। দিল্লির রাজনৈতিক বিশ্লেষক রশিদ কিদওয়াইয়ের মতে, মোদি সরকারের ইসরায়েল নীতিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গেও সম্পর্কিত করে দেখা যায়।
সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক নবদীপ সুরি অবশ্য মনে করেন, ইসরায়েলের দিকে ভারতের ঝুঁকে পড়া গাজা যুদ্ধের আগেই শুরু হয়েছিল। তার ভাষায়, মোদি সরকারের সময়ে আগে অনেকটা আড়ালে থাকা ভারত-ইসরায়েল সম্পর্ক আরও প্রকাশ্য হয়েছে। প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সহযোগিতায় দুই দেশের মধ্যে স্বার্থের মিলও রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ফিলিস্তিন নিয়ে ভারতের অবস্থান
ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়লেও ফিলিস্তিন প্রশ্নে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে রয়েছে। গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির আহ্বানও জানিয়ে আসছে নয়াদিল্লি। তবে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার বিষয়ে ভারতের সমালোচনা তুলনামূলকভাবে সীমিত—এমন দাবি করেছেন কয়েকজন বিশ্লেষক।
সুরি মনে করেন, ইসরায়েল ও ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠতার কারণে নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে ইসরায়েলের সমালোচনায় এক ধরনের অনীহা দেখা যাচ্ছে। তার মতে, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি এসব বিষয়ে ভারতের আরও স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া সম্ভব।
ঐতিহাসিক অবস্থান থেকে নতুন বাস্তবতা
স্বাধীনতার পর কয়েক দশক ভারত ইসরায়েল থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছিল। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিল নয়াদিল্লি। যদিও দুই দেশের মধ্যে গোপন যোগাযোগের ইতিহাস আরও পুরোনো, আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯২ সালে।
মোদি সরকারের সময়ে সেই সম্পর্ক দ্রুত প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা সহযোগিতা, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বিস্তৃত অংশীদারত্বে রূপ নিয়েছে। গাজা যুদ্ধের পর ইসরায়েল যখন আন্তর্জাতিকভাবে আরও চাপের মুখে পড়েছে, তখনও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের এই ধারায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি।
ফলে বিশ্লেষকদের কাছে ভারত-ইসরায়েল সম্পর্ক এখন শুধু কূটনৈতিক যোগাযোগের বিষয় নয়; বরং নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গে যুক্ত একটি বিস্তৃত কৌশলগত সম্পর্ক। আর গাজা যুদ্ধ সেই সম্পর্ককে আরও প্রকাশ্য করে তুলেছে—এমনটাই উঠে এসেছে আল জাজিরার বিশ্লেষণে।
সূত্র : আল-জাজিরা
সময়ের আলো/জেডি