গত ২৭ সেপ্টেম্বর সময়ের আলোয় ‘ভিটেমাটি কাড়ার পাঁয়তারা! এমপি রনি ও বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে ভূমিদস্যুতার অভিযোগ’শিরোনামে একটি ভিডিও রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে রিপোর্টটি তৈরি হলেও অভিযুক্ত গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম মঞ্জুরুল করিম রনি ওই সংবাদকে ‘অসত্য’ বলে প্রতিবাদলিপি দিয়েছেন।
প্রতিবাদলিপির পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবেদকের ভাষ্য, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য, মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ, স্থানীয়দের অভিযোগ এবং পাওয়া নথিপত্র যাচাই করেই প্রতিবেদনটি তৈরি ও প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবাদলিপিতে সংযুক্ত নথি নিয়ে প্রশ্ন
প্রতিবাদলিপিতে পাঁচ ধরনের নথি সংযুক্ত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে—নোটিশ, লিজ দলিল, রেকর্ডের কপি, আদালতের আদেশ ও খারিজসংক্রান্ত কাগজপত্র। তবে সময়ের আলোর হাতে পাওয়া কপিতে একটি আদালতের আদেশ ছাড়া আর কিছু নেই।
প্রতিবেদন নিয়ে অভিযোগ ও প্রতিবেদকের জবাব
১. আইনি ও রেকর্ডভিত্তিক কাগজপত্রের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি
জবাব : প্রতিবেদনে দুই দশক নয়, পাঁচ দশক ধরে মামলা চলমান থাকার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে মামলাটি এখনো বিচারাধীন ও চলমান রয়েছে, বিষয়টিও প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
২. প্রতিপক্ষ বা অভিযুক্ত পক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের অভাব
জবাব : প্রতিবেদনে অভিযুক্ত এম মঞ্জুরুল করিম রনির বক্তব্য নেওয়ার জন্য তার বাংলাদেশে ব্যবহৃত নম্বরে যোগাযোগের কথা বলা হয়েছে। পরবর্তীতে তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে টানা দুই থেকে তিন দিন কল করে বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তিনি কল রিসিভ না করায় ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে তার বক্তব্য চাওয়া হয়। ওই বার্তার মাধ্যমে পাওয়া বক্তব্যই প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।
৩. স্থানীয় প্রশাসন বা নিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুপস্থিত
জবাব : মামলাটি গাজীপুর আদালতে চলমান থাকায় স্থানীয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য দিতে অনীহা প্রকাশ করেন। তবে প্রতিবেদনে স্থানীয় বেশ কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তির বক্তব্য রয়েছে। পাশাপাশি গাজীপুর আদালতে চলমান মামলার সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর বক্তব্যও প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে বিষয়টি একতরফাভাবে উপস্থাপন করা হয়নি।
৪. জমির ঐতিহাসিক পটভূমি ও রেকর্ডের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ না থাকা
জবাব : শতবর্ষী বসতির মূল মালিকানা ও আরএস রেকর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সকল দলিল পর্যালোচনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় বিশেষজ্ঞ খোরশেদ আলমের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তার বক্তব্যও প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছে।
৫. বিচারিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ ও অনুমানের ওপর নির্ভরতা
জবাব : বিচারাধীন বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। তবে যখন কয়েকশ ভুক্তভোগী পরিবার মহাসড়কে দাঁড়িয়ে মানববন্ধন করে এবং সেই মানববন্ধনে এমপির ছবি দিয়ে তাকে ‘ভূমিদস্যু’ উল্লেখ করা হয়, তখন সাধারণ মানুষের চাপা আর্তনাদ ও অভিযোগের বিষয়টি সংবাদে বিস্তারিতভাবে প্রকাশের দাবি রাখে। সময়ের আলো কোনো ব্যক্তিস্বার্থে সংবাদ প্রকাশ করে না। জনগণের অভিযোগ, বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করে তা পাঠকের সামনে তুলে ধরাই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য।
৬. ভৌগোলিক এখতিয়ার ও বাস্তবতার চরম অসঙ্গতি
জবাব : ভৌগোলিক বাস্তবতার দিক থেকেও বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। গাজীপুর-২ সংসদীয় এলাকা থেকে গাজীপুর-৩ সংসদীয় এলাকায় লোকজনসহ গিয়ে ক্ষমতার প্রভাব দেখানো একেবারেই অসম্ভব বা কাল্পনিক কোনো বিষয় নয়। এমপির সঙ্গে যারা সেখানে গিয়েছিলেন, তাদের কয়েকজন বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। তাদের বক্তব্যও প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছে।
৭. দৃশ্যমান প্রমাণের চরম ঘাটতি
জবাব : বিষয়টির অন্যতম দৃশ্যমান প্রমাণ হিসেবে গাজীপুর-২ আসনের এমপির সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের বক্তব্য বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম গাজীপুর সদর উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব আবু বকর সিদ্দিক। তিনি ওই সময়ে সেখানে যাওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা সময়ের আলোকে জানিয়েছেন। তার বক্তব্যের রেকর্ড সময়ের আলো আর্কাইভে সংরক্ষিত রয়েছে এবং প্রতিবেদনে তার বক্তব্যের মূল অংশও প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর আট দফা সাইবার হামলা
এমপি রনিকে নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর স্বাধীন সংবাদমাধ্যমটির ফেসবুক পেজে মোট আট দফা সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং ২৭ সেপ্টেম্বর বেতজুরী গ্রামের জমি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের পরও হামলার ঘটনা ঘটে বলে জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া সময়ের আলো মাল্টিমিডিয়া বিভাগের গাজীপুরের শ্রীপুর প্রতিবেদক মো. মোজাহিদকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। তবে এসব সাইবার হামলার সঙ্গে এমপি রনি বা তার কোনো সহযোগীর সরাসরি সম্পৃক্ততা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সময়ের আলো বিষয়টিকে সংবাদমাধ্যমের ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখছে।
সময়ের আলো/এনএ/জেডি