পদ্মায় আতঙ্ক ছড়ায় ডুবোচর ব্যাহত নৌ চলাচল, কমছে ইলিশ আহরণ

শফিকুল ইসলাম, শরীয়তপুর

সারাদেশ

পদ্মা নদীর নাব্য সংকট দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে। শরীয়তপুরের জাজিরায় মাঝিরঘাট পদ্মা সেতু পয়েন্ট থেকে নড়িয়ার সুরেশ্বর পর্যন্ত

2026-10-08T23:23:30+00:00
2026-10-08T23:23:30+00:00
 
  শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬,
২৪ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
পদ্মায় আতঙ্ক ছড়ায় ডুবোচর ব্যাহত নৌ চলাচল, কমছে ইলিশ আহরণ
শফিকুল ইসলাম, শরীয়তপুর
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:২৩ পিএম 
শরীয়তপুরের জাজিরায় মাঝিরঘাট পদ্মা সেতু পয়েন্ট থেকে নড়িয়ার সুরেশ্বর পর্যন্ত নদীর বিভিন্ন স্থানে ডুবোচরের কারণে ব্যাহত হচ্ছে নৌ চলাচল। ছবি : সংগৃহীত
পদ্মা নদীর নাব্য সংকট দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে। শরীয়তপুরের জাজিরায় মাঝিরঘাট পদ্মা সেতু পয়েন্ট থেকে নড়িয়ার সুরেশ্বর পর্যন্ত নদীর বিভিন্ন স্থানে ডুবোচর জেগে ওঠায় ব্যাহত হচ্ছে নৌ চলাচল। একই সঙ্গে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন হওয়ায় কমে গেছে ইলিশের বিচরণ ও আহরণ। এতে বিপাকে পড়েছেন জেলে, নৌযান চালক এবং নদীপাড়ের মানুষ।

এ প্রসঙ্গে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব বলেন, নদীতে পলি জমে বড়বড় চর সৃষ্টি হওয়ায় ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ ও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পদ্মা নদীর শরীয়তপুর অংশে একসময় ইলিশের ব্যাপক বিচরণ থাকলেও এখন নদীর গভীরতা ও প্রবাহ কমে যাওয়ায় সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে। তিনি আরও বলেন, শরীয়তপুরে পদ্মার প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকাকে ইলিশের অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হলেও নাব্য সংকটের কারণে ইলিশের চলাচল আগের মতো স্বাভাবিক নেই। ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং পরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে চর অপসারণ জরুরি।

এ বিষয়ে শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবোর) উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সজল পারভেজ বলেন, নদীর নাব্য ঠিক রাখতে ড্রেজিং একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। নদীর বর্তমান অবস্থা মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণে মাঝিরঘাট থেকে সুরেশ্বর পর্যন্ত হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কাজ চলছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সুরেশ্বর-ঢাকা নৌপথে চলাচলকারী লঞ্চ এমভি সুরেশ্বরের মাস্টার বলেন, নাব্য কমে যাওয়ায় নদীপথে চলাচল আগের চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বর্ষা মৌসুমে তীব্র স্রোতের কারণে নৌযান নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়, আবার বর্ষা শেষে পলি জমে ডুবোচর তৈরি হওয়ায় অনেক সময় আটকে যায়। এতে যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ার পাশাপাশি জ্বালানি ও সময়ের ব্যয় বেড়েছে।

সরেজমিন স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পদ্মার মাঝপথে গত দুই বছরে বেশ কয়েকটি বড় ডুবোচর তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জাজিরা অংশ থেকে নতুন চ্যানেল তৈরি হওয়ায় নদীর মূল প্রবাহ অনেকটা সরে গেছে। আগে যেখানে সরাসরি নৌপথ ব্যবহার করা যেত, এখন সেখানে চর পড়ে যাওয়ায় বড় নৌযানগুলোকে দীর্ঘপথ ঘুরে চলাচল করতে হচ্ছে। নাব্য সংকটের কারণে নদীর অনেক অংশে পানি কমে গেছে। মাঝ নদীর স্বাভাবিক গভীরতা কমে যাওয়ার ফলে নৌযান চলাচলে ঝুঁকি বাড়ছে। রাতের অন্ধকারে চলাচল আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নৌযানগুলো প্রায়ই ডুবোচরে আটকে পড়ছে। এদিকে নদীর তলদেশে পলি জমে ডুবোচর তৈরি হওয়ায় ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণেও প্রভাব পড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে ভাঙনের ঝুঁকি।

স্থানীয় জেলেরা বলছেন, আগে এই অংশে জাল ফেললেই ইলিশ মিলত। এখন নদীর স্রোত ও গভীরতা বদলে যাওয়ায় মাছের চলাচলের পথও পরিবর্তন হয়েছে। ফলে আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে ইলিশ আহরণ কমেছে।

শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, উজান থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ পলি নেমে এসে পদ্মা নদীর বিভিন্ন অংশে জমা হয়। বিশেষ করে বর্ষা শেষে নদীর তলদেশে পলি জমে বিভিন্ন স্থানে ডুবোচর ও নতুন নতুন চর সৃষ্টি করছে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার পাশাপাশি গভীরতাও কমে যাচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, গঙ্গা-পদ্মা-যমুনা অববাহিকা দিয়ে বছরে প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন টন পলি বাংলাদেশে প্রবেশ করে, যার বড় একটি অংশ নদীর তলদেশে জমা হয়।


পাউবো জানায়, দীর্ঘদিন পরিকল্পিত ড্রেজিং না হওয়ায় শরীয়তপুর অংশে নাব্য সংকট আরও জটিল হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মাঝিরঘাট পদ্মা সেতুর জিরো পয়েন্ট থেকে সুরেশ্বর পয়েন্ট পর্যন্ত প্রায় ২৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার নদীপথে একটি হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ সম্পন্ন করা হয়েছে। পাশাপাশি সুরেশ্বর থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার নদীপথে পরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের (ফিজিবিলিটি স্টাডি) সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চলছে।

এ ছাড়া নদীর গভীরতা কমে যাওয়ায় প্রভাব পড়ছে নৌ চলাচল ও জলজ সম্পদে। যাত্রীবাহী ট্রলার, কার্গো ও মালবাহী নৌযান চলাচলে প্রতিনিয়ত ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে পদ্মা নদী ইলিশের অন্যতম অভিবাসন ও বিচরণ পথ হওয়ায় এর নাব্য সংকট মাছের উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। নদীর মাঝপথে ডুবোচর সৃষ্টি এবং বিভিন্ন স্থানে গভীরতা কমে যাওয়ায় পদ্মার মূল স্রোত এখন ডান তীর ঘেঁষে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নদীতীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় নতুন করে ভাঙনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। নদীর কোথাও কোথাও গভীরতা নেমে এসেছে মাত্র ৫ থেকে ১০ ফুটে, আবার কিছু অংশে তা ৫০০ ফুটেরও বেশি। গভীরতার এই ব্যাপক তারতম্যের কারণে নদীর প্রবাহে অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হচ্ছে, যা তীর ভাঙনের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য বলছে, গত এক দশকে এ অঞ্চলে নদীভাঙনে অন্তত ২০ হাজার পরিবার গৃহহীন হয়েছে।

জেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পদ্মা ও মেঘনা নদীবেষ্টিত শরীয়তপুরে মোট ৭১ কিলোমিটার নদীপথ রয়েছে। এর মধ্যে নড়িয়া উপজেলার ৫ কিলোমিটার এবং ভেদরগঞ্জ উপজেলার ১৫ কিলোমিটারসহ মোট ২০ কিলোমিটার এলাকাকে ইলিশের অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে। নদীর গভীরতা ও স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় না থাকলে ইলিশসহ বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির মাছের বিচরণ ও প্রজনন ক্ষেত্র আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জাজিরার মাঝিরঘাট এলাকার জেলে মনা বেপারি ও নড়িয়ার সুরেশ্বরের জেলে সুমন বকাউল বলেন, তিন দশক ধরে পদ্মায় মাছ ধরলেও এখন আগের মতো ইলিশ পাওয়া যায় না। আগে কয়েক ঘণ্টা জাল ফেললেই ভালো পরিমাণ বড় আকারের ইলিশ পাওয়া যেত। এখন সারা দিন নদীতে থেকেও সেই তুলনায় অনেক কম মাছ মেলে। এতে আয়-রোজগার কমে যাওয়ায় সংসার চালাতে বিকল্প পেশার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, নদীর মাঝখানে চর জেগে ওঠা এবং স্রোতের গতিপথ বদলে যাওয়ায় মাছের স্বাভাবিক বিচরণও কমে গেছে।

নড়িয়া উপজেলার চরআত্রার নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত বিল্লাল মাঝি বলেন, নদীর মূল স্রোত এখন আমাদের এলাকা ঘেঁষে প্রবাহিত হওয়ায় ভাঙন তীব্র হয়েছে। গত কয়েক বছরে আমার প্রায় চার বিঘা কৃষিজমি নদীতে চলে গেছে। তিনি আরও বলেন, বেড়িবাঁধ দেওয়ার পর কিছুটা ভাঙন কমেছিল, তবে বর্তমানে ডুবোচর সৃষ্টি ও নদীর গভীরতা কমে যাওয়ায় স্রোতের চাপ আবার বেড়েছে। স্থায়ী সমাধানে পরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের দাবি জানান তিনি।

সময়ের আলো/জোই
  বিষয়:   পদ্মা  ডুবোচর  ব্যাহত  নৌ চলাচল  ইলিশ আহরণ  সময়ের আলো  নাব্যতা সংকট 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: