স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ও পরীক্ষিত উন্নয়ন সহযোগী এবং পরম বন্ধু জাপান। পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের এই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও গভীর ও বহুমাত্রিক করতে আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর চার দিনের সরকারি সফরে টোকিও যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে অনুষ্ঠেয় এ সফরটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম জাপান সফর।
সফরকালে টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, জ্বালানি ও প্রযুক্তি সহযোগিতা, দক্ষ জনশক্তি রফতানিসহ দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হবে। পাশাপাশি পূর্ব এশীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও জোরদারের বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে। সফরকালে জাপানের সম্রাট নারুহিতোর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং জাপানের সংসদীয় দলের সঙ্গেও বৈঠক করার কথা রয়েছে।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নতুন নির্বাচিত সরকারের প্রধান হিসেবে তারেক রহমানের এ সফরকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন কূটনীতিকরা। তাদের মতে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও নিরাপত্তা সহযোগিতাকে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার পাশাপাশি পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্য ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এ সফর।
দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা : সূত্রে জানা গেছে, টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, জ্বালানি সহযোগিতা, প্রযুক্তি ও শ্রম শক্তি রফতানি এবং পূর্ব এশীয় অঞ্চলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কৌশলগত অংশীদারিত্ব নিয়ে আলোচনা হবে। এ ছাড়া সফরকালে জাপানের সম্রাট নারুহিতোর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
জাপানি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও বাণিজ্য : বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা নতুন উচ্চতায় নিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের শীর্ষ শিল্পপতি ও বিনিয়োগকারীদের সংগঠন কেদানরেনের (কবরফধহৎবহ) প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিশেষ বৈঠকে বসবেন। বাংলাদেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানানো হবে। পাশাপাশি সম্প্রতি বাংলাদেশে গাড়ি উৎপাদন কারখানা গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে বিশ্বখ্যাত জাপানি অটোমোবাইল ব্র্যান্ড ‘টয়োটা’। প্রধানমন্ত্রী এই সফরে আরও বেশি জাপানি প্রযুক্তি খাত ও অটোমোবাইল প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশে কারখানা স্থাপনে উৎসাহিত করবেন বলে জানা গেছে।
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য : অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি ত্বরান্বিত করে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ানোর পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে।
পরম বন্ধু ও উন্নয়ন অংশীদার : স্বাধীনতার পর থেকেই জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ও পরীক্ষিত উন্নয়ন সহযোগী। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এরপর পাঁচ দশকের বেশি সময়ে অবকাঠামো, পরিবহন, বিদ্যুৎ, নগর উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে জাপানের সহযোগিতা বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
জাপানের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশকে দেওয়া জাপানের ঋণ সহায়তার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৩ হাজার ৬১৮ কোটি ইয়েন। একই সময়ে অনুদান সহায়তা প্রায় ৫ হাজার ১৮৪ কোটি ইয়েন এবং কারিগরি সহযোগিতা প্রায় ১ হাজার ৮১ কোটি ইয়েন। ২০২৪ সালের ওইসিডি/ডিএসি হিসেবেও বাংলাদেশে জাপান ছিল দাতা দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী।
বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানের সহযোগিতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ১৯৯৪ সালে যমুনা বহুমুখী সেতু প্রকল্পে জাপানের ঋণ সহায়তা যুক্ত হয়। বর্তমানেও বাংলাদেশের বড় অবকাঠামো প্রকল্পে জাপানের সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়নে মেট্রোরেল-৬ প্রকল্পে জাপানের ঋণ সহায়তা রয়েছে। ২০২২ সালে এ প্রকল্পের পঞ্চম পর্যায়ে জাপান ১৮ দশমিক ২৮৫ বিলিয়ন ইয়েন ঋণ অনুমোদন করে। এ ছাড়া মেট্রোরেল-১ ও মেট্রোরেল-৫সহ ঢাকার অন্যান্য গণপরিবহন প্রকল্পেও জাপানের অর্থায়ন রয়েছে।
যোগাযোগ খাতে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক এবং জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী রেলপথ উন্নয়নেও জাপানের সহায়তা রয়েছে। ২০২৪ সালে যমুনা রেলওয়ে সেতুর তৃতীয় পর্যায়ে জাপান সর্বোচ্চ ৩৮ দশমিক ২০৬ বিলিয়ন ইয়েন ঋণ দেওয়ার চুক্তি করে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ ও সম্প্রসারণ প্রকল্পে ২০২৩ সালে জাপান সর্বোচ্চ ৭৬ দশমিক ৬৩৫ বিলিয়ন ইয়েন ঋণ সহায়তা দেয়। পাঁচ দশকের এই ধারাবাহিক অংশীদারিত্বই জাপানকে বাংলাদেশের অন্যতম পরীক্ষিত ও গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এসব অবদান সুসংহত করার পাশাপাশি নতুন প্রকল্পে সহযোগিতার তাগিদ দেওয়া হবে।
দক্ষ শ্রমশক্তি রফতানি : জাপানের বর্তমান শ্রমসংকট মেটাতে বাংলাদেশ থেকে তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল ও সেবামূলক খাতে বিপুলসংখ্যক দক্ষ কর্মী পাঠানোর বিষয়টি রয়েছে এজেন্ডায়। সফরকালে দুই দেশের মধ্যে দক্ষ শ্রমশক্তি রফতানি সংক্রান্ত একটি সার্বিক প্রস্তাব পর্যালোচনা ও চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রধামন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী সময়ের আলোকে জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরসূচি ও আলোচ্য বিষয় নিয়ে কাজ চলছে। চূড়ান্ত হলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়ে দেবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে