নওমুসলিম মুহাম্মদ রাজ মানবিক কর্মী, লেখক ও মানবাধিকারকর্মী। তার জন্ম সিলেটের এক মুক্তিযোদ্ধা পরিবারে। হিন্দু ধর্মের ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম নেওয়া রাজের শৈশব-কৈশোর কেটেছে পূজা-অর্চনার পরিবেশে। পরবর্তী সময়ে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মানবসেবাকেই জীবনের অন্যতম প্রধান কর্মপথ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এই মহৎপ্রাণ মানুষের জনসেবার চিত্র তুলে ধরেছেন ফারহান হাসনাত।
নওমুসলিম মুহাম্মদ রাজ বর্তমানে সরকারি নিবন্ধনভুক্ত মানবিক সেবাসংস্থা হাফেজ্জী চ্যারিটেবল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (এইচসিএসবি) মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি সার্ক হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের ডিরেক্টর অব ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাফেয়ার্স হিসেবেও কাজ করছেন। এ ছাড়া তিনি বাংলাদেশ মাদরাসা অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) উপদেষ্টা ও মুখ্য সমন্বয়ক। হাফেজ্জী চ্যারিটেবলকে শূন্য থেকে বর্তমান বিস্তৃত অবস্থানে নিয়ে আসার পেছনে মুহাম্মদ রাজের সাংগঠনিক শ্রম, জনসম্পৃক্ততা, তহবিল সংগ্রহ, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং মানবিক কার্যক্রম সম্প্রসারণে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
বিশেষ করে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা ও সুদানে তার নেতৃত্বে ‘টিম হাফেজ্জী’ খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা, নগদ সহায়তা ও জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব কার্যক্রমের সমন্বয় ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে তিনি একাধিকবার মিসর সফর করেছেন। সেখানে তিনি মিসরে নিযুক্ত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত দিয়াব আল-লুহ, ইজিপশিয়ান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ড. আমাল এমাম, ইজিপশিয়ান ইয়ুথ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অব দ্য বোর্ড অব ট্রাস্টিজ মুহাম্মদ মামদুহসহ বিভিন্ন কূটনীতিক এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত দিয়াব আল-লুহ মুহাম্মদ রাজ ও টিম হাফেজ্জীর গাজা ও মিসরে আশ্রয় নেওয়া ফিলিস্তিনিদের জন্য ধারাবাহিক মানবিক কার্যক্রমের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতেও সহযোগিতার আশ্বাস দেন। একইভাবে জর্ডানে ফিলিস্তিনি দূতাবাসের অ্যাক্টিং অ্যাম্বাসেডর ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও মুহাম্মদ রাজের মানবিক কার্যক্রমের প্রশংসা করেন এবং গাজাকেন্দ্রিক সহায়তা কার্যক্রমে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আগ্রহ প্রকাশ করেন। মুহাম্মদ রাজ বললেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণে মানুষের সেবা করি। মুসলিম হিসেবে আমাদের ইবাদত করতেই হয়, ইবাদত করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়। ইবাদতের পাশাপাশি অসহায় মানুষের দুঃখ লাঘব, ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া, রোগীর চিকিৎসায় পাশে দাঁড়ানো এবং বিপন্ন মানুষের সেবা করার মধ্য দিয়েও আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জনের একটি সহজ ও সুন্দর পথ তৈরি হয়।’
মুহাম্মদ রাজ ও টিম হাফেজ্জীর গাজা-সুদানকেন্দ্রিক মানবিক কার্যক্রম আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও আলোচিত হয়েছে। আলজাজিরা গাজার বিধ্বস্ত জনপদ থেকে তাদের ত্রাণ কার্যক্রম সম্প্রচার করেছে। এ ছাড়া বিবিসি, প্যালেস্টাইন টিভি, সুদান ন্যাশনাল টিভি, আল জারকা টিভি, আল তাইবা টিভি এবং ইজিপ্ট ওয়ার্ল্ড টাইমস শোসহ মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাদের মানবিক কর্মকাণ্ড প্রচারিত হয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় গণমাধ্যমেও তার ও সংস্থার কার্যক্রম নিয়ে নিয়মিত সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে মুহাম্মদ রাজের দেশ-বিদেশের মানবিক ও সেবামূলক কার্যক্রমের ভূয়সী প্রশংসা করেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও তার নেতৃত্বে অসহায় রোগীদের ব্যয়বহুল চিকিৎসা সহায়তা, নওমুসলিম ও দরিদ্র পরিবারের পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান, নলকূপ স্থাপন, মক্তব ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহায়তা, শীতবস্ত্র বিতরণ, রমজানে খাদ্যসামগ্রী এবং ঈদ উপহার বিতরণসহ বহুমুখী মানবিক কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে।
মানবিক ও মানবাধিকার কার্যক্রমের স্বীকৃতিস্বরূপ মুহাম্মদ রাজ দেশ-বিদেশে একাধিক সম্মাননা অর্জন করেছেন। ইন্টারন্যাশনাল পিস অ্যাওয়ার্ড ২০২৪, হিউম্যান রাইটস এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড ২০২৪, মিসরের কায়রোতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের হাত থেকে বিশেষ মানবিক সম্মাননা, গ্লোবাল বিজনেস অ্যান্ড সিএসআর প্রেস্টিজিয়াস অ্যাওয়ার্ড ২০২৫, নেপাল-বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড, মালয়েশিয়া গ্লোবাল এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড ২০২৫, ৭১ মিডিয়া আইকনিক অ্যাওয়ার্ড ২০২৫ এবং সার্ক হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস কনফারেন্স ২০২৬-এর বিশেষ আন্তর্জাতিক সম্মাননা পেয়েছেন।
মুহাম্মদ রাজ একজন লেখক ও কলামিস্ট। দেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় মানবিক সংকট, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, সমাজ, রাষ্ট্র ও মুসলিম উম্মাহর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তার বহু কলাম প্রকাশিত হয়েছে। তার রচিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘থটস অব রাজ’ এবং প্রকাশিতব্য আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘তিলক থেকে তাসবিহ’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। ফেসবুকে তার অনুসারীর সংখ্যা ২০ লাখেরও বেশি।
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত জনপদ থেকে গাজা-সুদানের যুদ্ধবিধ্বস্ত ভূমি—মানবিক সেবার এই বিস্তৃত পথচলায় মুহাম্মদ রাজ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকাকে মানবতা, সহমর্মিতা ও সেবার এক ইতিবাচক পরিচয় তুলে ধরার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। মুহাম্মদ রাজ বললেন, ‘দেশের তরুণ ও নতুন প্রজন্মকে মানবিক কাজ, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মমুখী প্রশিক্ষণ ও স্বাবলম্বী করে তোলার কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করতে চাই।
একই সঙ্গে গাজা, ইয়েমেন, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের নিপীড়িত ও অসহায় মানুষের কাছে খাদ্য, বাসস্থান, পোশাক ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে চাই। আমার স্বপ্ন— বাংলাদেশের ভেতরে একটি দক্ষ, মানবিক ও দায়িত্বশীল প্রজন্ম গড়ে তোলা এবং দেশের লাল-সবুজের পতাকাকে মানবসেবার মাধ্যমে বিশ্বদরবারে আরও মর্যাদার উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকার ও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতাও প্রত্যাশা করি।’
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডআই