২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিশিষ্ট আইনজ্ঞ নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা এবং বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এই সম্মান দেওয়া হয়েছে।
৮৫ বছর বয়সী নাভি পিল্লাই দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী বিচারক হিসেবে ইতিহাস গড়েছিলেন। তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া রুয়ান্ডার গণহত্যা নিয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান ছিলেন তিনি। বর্তমানে তিনি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান জর্গেন ওয়াটনে ফ্রিডনেস বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের পরিধি ও কার্যকারিতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন পিল্লাই। তার দীর্ঘ কর্মজীবন বিশ্বে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথ দেখিয়েছে।
নোবেল কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ ও সংঘাত বাড়ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন এবং বিচারব্যবস্থাও রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে আইন ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসার গুরুত্ব তুলে ধরতেই এই স্বীকৃতি।
কমিটির মতে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা এবং নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ে তোলার অন্যতম শর্ত।
দারিদ্র্য থেকে আন্তর্জাতিক বিচারাঙ্গনে
১৯৪১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার নাটাল প্রদেশের ডারবানের একটি দরিদ্র এলাকায় জন্ম নাভি পিল্লাইয়ের। তার বাবা নারাইনস্বামী নাইডু ছিলেন বাসচালক এবং মায়ের নাম সান্থামা নাইডু। তার পূর্বপুরুষেরা ১৮৯০-এর দশকে ভারত থেকে দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিলেন। সেখানে তারা চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক হিসেবে চিনির খামারে কাজ করতেন।
বর্ণবৈষম্য বা অ্যাপার্টহাইডের কঠিন সময়ে বেড়ে ওঠা পিল্লাই আইন পেশায় যুক্ত হয়ে বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার নাটাল প্রদেশে নিজস্ব আইনচর্চা শুরু করা প্রথম নারী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের পক্ষে আইনি লড়াই করেন তিনি।
এরপর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ তাকে রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসেবে নির্বাচিত করে। আট বছর ওই ট্রাইব্যুনালে দায়িত্ব পালনের সময় চার বছর তিনি এর সভাপতিও ছিলেন।
মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পিল্লাই অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিয়ে গঠিত জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সভাপতিত্ব করেছেন।
এ ছাড়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগসংক্রান্ত মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
নোবেল কমিটির মতে, আন্তর্জাতিক আইনকে শক্তিশালী করা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পিল্লাইয়ের দীর্ঘদিনের কাজ বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিয়েছে।
নোবেল শান্তি পুরস্কারের ১২৫ বছর
২০২৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারের ১২৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে। এ বছর পুরস্কারের জন্য মোট ২৮৭ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মনোনয়ন জমা পড়েছিল। এর মধ্যে এক-চতুর্থাংশেরও বেশি ছিল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
গত বছর ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ভূমিকার জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন।
নাভি পিল্লাইয়ের এই অর্জন আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ