১৭৮ টাকা মজুরিতে চলে সংসার, খাবারে চা-পাতার চাটনি

তানভীর চৌধুরী, কমলগঞ্জ

সারাদেশ

ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় চা শ্রমিকদের পথচলা। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ পেরিয়ে কেউ মাথায় ঝুড়ি, কেউ কাঁধে ব্যাগ

2026-10-09T16:51:35+00:00
2026-10-09T16:51:35+00:00
 
  শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬,
২৪ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
১৭৮ টাকা মজুরিতে চলে সংসার, খাবারে চা-পাতার চাটনি
তানভীর চৌধুরী, কমলগঞ্জ
প্রকাশ: শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৫১ পিএম 
চা-বাগানের সবুজের আড়ালে লুকিয়ে আছে ক্ষুধা, অভাব আর বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রাম। ছবি ; সময়ের আলো
ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় চা শ্রমিকদের পথচলা। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ পেরিয়ে কেউ মাথায় ঝুড়ি, কেউ কাঁধে ব্যাগ নিয়ে ছুটে যান চা বাগানে। চারদিকে সারি সারি সবুজ চা-গাছ। সেই সবুজের ভেতর কাঁচি হাতে কচি পাতা তোলেন নারী-পুরুষ শ্রমিকেরা। দূর থেকে দৃশ্যটি মনোমুগ্ধকর। কিন্তু সবুজের আড়ালে লুকিয়ে আছে ক্ষুধা, অভাব আর বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রাম। ১৭৮ টাকা মজুরিতে চলে সংসার, দুপুরে জোটে চা-পাতার চাটনি।

দুপুর গড়ালে বাগানের কর্মব্যস্ততায় কিছুটা ছন্দপতন ঘটে। কাজের ফাঁকে গাছের ছায়ায় বসে পড়েন শ্রমিকেরা। কারও পলিথিনে মুড়ি, কারও পাত্রে পান্তাভাত, আবার কারও সঙ্গে থাকে আটার মোটা রুটি। সেই রুটির সঙ্গে থাকে চা-পাতা দিয়ে তৈরি ঝাল এক খাবার, শ্রমিকদের ভাষায় ‘পাতিচখা’ বা ‘পাতা চাটনি’।

চা-গাছের কচি পাতা, কাঁচা মরিচ, রসুন-পেঁয়াজ, পোড়া আলু ও চানাচুর মিশিয়ে তৈরি হয় এই খাবার। কখনো কাঁচা, কখনো সামান্য ভেজে খাওয়া হয়। অভাবের সংসারে এটি শখের খাবার নয়; বরং অনেকের দুপুরের ক্ষুধা মেটানোর অন্যতম ভরসা। যে চা-পাতা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখে, সেই পাতাই কখনো হয়ে ওঠে চা শ্রমিক পরিবারের ক্ষুধা নিবারণের উপকরণ।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ফুলবাড়ী, চাম্পারায়, আলীনগর, পাত্রখোলা, মাধবপুর ও কুরমাসহ প্রায় প্রতিটি চা বাগানেই দুপুরে দেখা মেলে এই বাস্তবতার।

চা শ্রমিক গীতা মাদ্রাজী বলেন, ‘এ আর নতুন কী? এটা তো আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। অভাবের সংসারে চাল জোগাড় করাই যখন কঠিন, তখন ডাল-তরকারি আমাদের কাছে বিলাসিতা। এটা বানাতে বেশি টাকা লাগে না। রুটি বানাই, আর চায়ের কুঁড়ির সঙ্গে পোড়া আলু, চানাচুর ও কাঁচা মরিচ দিয়ে পাতিচখা তৈরি করে খাই। তাতেই দিন চলে যায়।’

নারী শ্রমিক সুর্মিলা কানু বলেন, ‘সপ্তাহে ছয় দিন সকাল ৮টায় কাজে আসি, বিকেল ৫টায় ছুটি। ঘরে ফিরে আবার ঘরের সব কাজ করতে হয়।’

আরেক শ্রমিক কমলা গোয়ালা বলেন, ‘বাগান থেকে ঘর দূরে হওয়ায় ভোরের আগেই ঘর ছাড়তে হয়। পায়ে হেঁটেই কাজে যোগ দিতে হয়। দিনভর পরিশ্রমের পর হাতে আসে ১৭৮ টাকা। নির্ধারিত পরিমাণ পাতা তুলতে না পারলে মজুরি কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।’

এই আয়ে সংসার চলে কি না জানতে চাইলে শ্রমিকেরা সমস্বরে বলেন, ‘না চললে কী করব? মালিক বা সরকার তো আর বেতন বাড়াবে না। আর কোনো কাজও নেই। তাই বাধ্য হয়েই এই কাজ করতে হয়।’

চা-পাতা তোলার কাজ বাইরে থেকে সহজ মনে হলেও, বাস্তবে ততটাই কঠিন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঝুঁকে কাজ করতে হয়। গরম, বৃষ্টি কিংবা কাদা—কিছুই তাঁদের শ্রম থামাতে পারে না। দীর্ঘ সময় কাজ করায় পা ফুলে যায়, হাতে পড়ে কড়া। তবু বিশ্রামের সুযোগ কম। কারণ, এক দিন কাজ বন্ধ থাকলে এক দিনের আয়ও বন্ধ হয়ে যায়।

চা শিল্পের বিকাশ, শ্রমিকের জীবনে সংকট

কমলগঞ্জে সরকারি ব্যবস্থাপনাধীন ন্যাশনাল টি কোম্পানি (এনটিসি) ও ব্যক্তিমালিকানাধীন মিলিয়ে ২২টি চা বাগান রয়েছে। দেশের চা উৎপাদনে এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তবে চা শিল্পের বিকাশের সঙ্গে শ্রমিকদের জীবনমানের উন্নতি কতটা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। অনেকের বসতঘর জরাজীর্ণ, স্যানিটেশন ব্যবস্থা দুর্বল এবং স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সীমিত।

মাধবপুর চা বাগানের ব্যবস্থাপক দীপন কুমার সিংহ বলেন, ‘পাতিচখা মূলত যাঁরা চা-পাতা তোলার কাজ করেন, তাঁরাই খেয়ে থাকেন।’

চাম্পারায় চা বাগানের ব্যবস্থাপক রাহেল রানা বলেন, ‘চা শ্রমিকেরা খুব কষ্টে জীবনযাপন করেন। তাঁদের জীবনমান উন্নয়নে সরকার কাজ করছে।’

কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সন্দ্বীপ তালুকদার বলেন, ‘প্রশাসনের পক্ষ থেকে চা শ্রমিকদের পাশে থাকার চেষ্টা করা হচ্ছে। কেউ অসুস্থ হলে খোঁজ নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।’

সবুজ চা বাগান পর্যটকদের চোখে সৌন্দর্যের প্রতীক। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের আড়ালে প্রতিদিন ঘাম ঝরান হাজারো শ্রমিক। তাঁদের শ্রমে উৎপাদিত চা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও ন্যায্য মজুরি, উন্নত বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ জীবনযাপনের সুযোগ নিয়ে তাঁদের সংগ্রাম শেষ হয়নি। তাই চা বাগানের সৌন্দর্যের পাশাপাশি শ্রমিকদের জীবনের বাস্তবতাও সামনে আনা জরুরি।

সময়ের আলো/এনএন


  বিষয়:   চা শ্রমিক  কমলগঞ্জ  মৌলভীবাজার  চা বাগান  পাতিচখা  শ্রমিকের মজুরি  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: