মানসিক স্বাস্থ্য মানুষের সামগ্রিক সুস্থতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ শারীরিক অসুস্থতার মতো মানসিক সমস্যাকে এখনও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয় না। বিষণ্নতা, উদ্বেগ, হতাশা, একাকিত্ব ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপে ভুগলেও অনেকে বিষয়টি গোপন রাখেন।
কেউ সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয়ে চিকিৎসকের কাছে যেতে চান না, কেউ আবার মানসিক সমস্যাকে ব্যক্তিগত দুর্বলতা কিংবা ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত করে দেখেন। ফলে প্রয়োজনীয় সহায়তা না পেয়ে অনেকের সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সীমিত সুযোগ, বিশেষজ্ঞের স্বল্পতা ও সচেতনতার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
আজ ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সেবার গুরুত্ব তুলে ধরার লক্ষ্যে।
এবারের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য ‘জীবনের কথা শুনি, বাস্তব পরিবর্তন আনি’— এ মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় মানুষের নিজস্ব অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাণী দিয়েছেন।
এক বাণীতে রাষ্ট্রপতি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি সহমর্মিতা ও সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি তাদের যথাযথ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পরিবার ও সমাজের সহায়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেন, ‘দেশের সব নাগরিকের সার্বিক মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করার আহ্বান জানাচ্ছি।
মানসিক অসুস্থতাকে ঘিরে ভয় ও কুসংস্কার দূর করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দৃশ্যত স্বাস্থ্যবান অথবা নিরোগ থাকাটাই স্বাস্থ্য নয়; বরং শারীরিক, মানসিক, আত্মিক ও সামাজিকভাবে ভালো থাকার নামই স্বাস্থ্য। সুতরাং কোনোভাবেই মানসিক স্বাস্থ্যকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
দেশে উদ্বেগজনক চিত্র : বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ব্যাপ্তি বোঝার ক্ষেত্রে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৮-১৯ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট উদ্যোগে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কারিগরি সহযোগিতায় পরিচালিত জরিপের ফল অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ৭ থেকে ১৮ বছর বয়সি শিশু-কিশোরদের ১২ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে মানসিক রোগের উপস্থিতি পাওয়া যায়। অর্থাৎ দেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি বা প্রভাবের মধ্যে রয়েছেন।
সমস্যার ব্যাপ্তির পাশাপাশি চিকিৎসা না পাওয়ার বিষয়টিও উদ্বেগজনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জরিপে শনাক্ত মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পায়নি। অর্থাৎ যাদের চিকিৎসা বা সহায়তা প্রয়োজন, তাদের বড় একটি অংশই সেবার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক সংকোচ, রোগ সম্পর্কে অজ্ঞতা, চিকিৎসার ব্যয় এবং সেবাকেন্দ্রের সীমিত প্রাপ্যতা এই ব্যবধানের গুরুত্বপূর্ণ কারণ। অনেক পরিবার মানসিক সমস্যার লক্ষণ বুঝতে পারে না। কেউ দীর্ঘদিনের বিষণ্নতা বা উদ্বেগকে স্বাভাবিক মন খারাপ বলে মনে করেন, আবার কেউ চিকিৎসার পরিবর্তে কেবল সময়ের ওপর নির্ভর করেন। এতে সমস্যা জটিল হওয়ার আগেই সহায়তা নেওয়ার সুযোগ নষ্ট হয়।
তরুণদের মানসিক চাপ : শিশু-কিশোর ও তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য বর্তমানে বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে। পড়াশোনার চাপ, পরীক্ষায় ভালো ফল করার প্রত্যাশা, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করার প্রবণতা অনেকের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।
কিশোর বয়সে আবেগের পরিবর্তন, আত্মপরিচয় নিয়ে দ্বিধা কিংবা ব্যর্থতার ভয় দেখা দিতে পারে। এসব অভিজ্ঞতা সব সময় মানসিক রোগের লক্ষণ নয়। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী মন খারাপ, আগ্রহ হারিয়ে ফেলা, ঘুম ও খাওয়ার অভ্যাসে বড় পরিবর্তন, সামাজিক যোগাযোগ কমিয়ে দেওয়া কিংবা নিজের মূল্য সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
শিশুদের ক্ষেত্রে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বকাঝকা, অপমান বা অন্যের সঙ্গে তুলনা না করে তাদের কথা শোনা, অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে প্রশিক্ষিত পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়া জরুরি। মানসিক সমস্যায় ভুগছে— এমন তকমা দিয়ে কোনো শিশুকে আলাদা করে দেখলে তার সংকট আরও বাড়তে পারে।
চিকিৎসাসেবার ঘাটতি : বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম বড় বাধা হলো প্রশিক্ষিত জনবলের স্বল্পতা এবং সেবার অসম বণ্টন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২০ সালের দেশভিত্তিক মূল্যায়নে প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে মানসিক স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা ছিল আনুমানিক ১ দশমিক ১৭। এ তথ্য বর্তমান জনবলের হিসাব নয়; তবে সেবাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে ধারণা দেয়।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বড় অংশ শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য চিকিৎসা নেওয়া কঠিন হতে পারে। যাতায়াত ব্যয়, চিকিৎসকের ফি এবং দীর্ঘদিন চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার আর্থিক চাপও অনেক পরিবারের জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার সুযোগ সীমিত থেকে যায়।
এ পরিস্থিতিতে সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে সাধারণ মানসিক সমস্যার প্রাথমিক শনাক্তকরণ, সহায়তা ও প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানোর সুযোগ বাড়তে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও অ-বিশেষজ্ঞ স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সেবার পরিধি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
সংস্থাটির বাংলাদেশ বিষয়ক ২০২৫ সালের কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করতে ৮৬ জন প্রশিক্ষক ও তত্ত্বাবধায়ককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়; তাদের উদ্যোগে আরও ৮৪৬ জন অ-বিশেষজ্ঞ স্বাস্থ্যসেবাদাতা প্রশিক্ষণ পান। ওই বছর কর্মসূচির আওতায় ২০ হাজারের বেশি মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শসেবা দেওয়া হয়।
আত্মহত্যা প্রতিরোধেও প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ : মানসিক সংকটের গুরুতর পরিণতিগুলোর একটি আত্মহত্যা। তবে আত্মহত্যাকে কোনো একটি মানসিক রোগের সরল ফল হিসেবে দেখা ঠিক নয়; ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নানা বিষয় এতে ভূমিকা রাখতে পারে। সংকটে থাকা ব্যক্তির পাশে দাঁড়ানো, তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং দ্রুত পেশাগত সহায়তার ব্যবস্থা করা জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০২১ সালে আত্মহত্যায় আনুমানিক ৪ হাজার ৭১৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল— গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৩ জন। এটি একটি নির্দিষ্ট বছরের হিসাব, বর্তমান বছরের মৃত্যুসংখ্যা নয়। আত্মহত্যা প্রতিরোধে সংস্থাটি সামাজিক সংযোগ বাড়ানো, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নেতিবাচক ধারণা দূর করা এবং সংকটে থাকা মানুষের জন্য সহায়তা সহজলভ্য করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, গণমাধ্যম ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান— সব পক্ষের সমন্বিত ভূমিকা এখানে প্রয়োজন।
আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিকে দোষারোপ, অপমান কিংবা তার সমস্যাকে তুচ্ছ করা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। বরং সহমর্মিতার সঙ্গে কথা বলা, তাকে একা না রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জরুরি চিকিৎসা নেওয়ার ব্যবস্থা করা জরুরি।
কুসংস্কার নয়, প্রয়োজন সহমর্মিতা : মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সমাজে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণা পরিবর্তন না হলে চিকিৎসার সুযোগ বাড়িয়েও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন। মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে ‘পাগল’ বলে অপমান করা, তার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা কিংবা তার অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব না দেওয়া বৈষম্যকে বাড়িয়ে দেয়। অথচ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথ চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, পারিবারিক সহযোগিতা ও সামাজিক সমর্থনের মাধ্যমে উন্নতি সম্ভব।
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের এবারের প্রতিপাদ্যও এ জায়গায় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। যারা মানসিক সংকটের মধ্য দিয়ে গেছেন, তাদের অভিজ্ঞতা শুধু ব্যক্তিগত গল্প নয়; সেবার সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা এবং কার্যকর নীতি তৈরিরও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে সেবা পরিকল্পনা করা গেলে চিকিৎসাব্যবস্থা মানুষের প্রকৃত প্রয়োজনের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে প্রয়োজন পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ, প্রশিক্ষিত জনবল বৃদ্ধি, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সেবা সম্প্রসারণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ ও মূল্যায়নের মাধ্যমে সেবার ঘাটতি চিহ্নিত করতে হবে।
মানসিক স্বাস্থ্য কোনো বিলাসিতা নয়, সুস্থ জীবনের মৌলিক প্রয়োজন। তাই কেবল দিবস পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মানসিক স্বাস্থ্যকে স্বাস্থ্যনীতি, শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মানুষের কষ্টকে স্বীকৃতি দেওয়া, তার কথা শোনা এবং প্রয়োজনের সময়ে পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়েই গড়ে উঠতে পারে আরও সহমর্মী ও সুস্থ সমাজ।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে