যুদ্ধ শব্দটি শুনলেই আমাদের মাথায় আসে কত মানুষ মারা গেল, কত বাড়িঘর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো কিংবা একটি দেশের কতটা ক্ষয়ক্ষতি হলো। কিন্তু আমাদের মাথায় এটা খুব কমই আসে যে, যুদ্ধের সময় কিংবা যুদ্ধপরবর্তীতে সেই দেশগুলোর মানুষদের মানসিক অবস্থা কেমন থাকে। ট্রমা, বিষন্নতা ও পিটিএসডিসহ বিভিন্ন সাইকোলজিক্যাল ডিসওর্ডারে আক্রান্ত হয়ে পড়ে তারা।
আজ বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। চলুন, আজ একটু এসব হতভাগা মানুষদের মানসিক অবস্থা নিয়ে আলাপ করা যাক।
যেসব দেশগুলো এখনো যুদ্ধে আক্রান্ত, একটি আঘাতের ক্ষত না শুকাতেই আরেকটি আঘাতে তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। কেউ রাতের পর রাত ঘুমাতে পারেন না। কেউ দরজা বন্ধ হওয়ার সামান্য শব্দে চমকে ওঠেন। কেউ আবার দিনের বেলা ঠিকঠাক কাজ করেন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে যেন শূন্য হয়ে যান। যুদ্ধপরবর্তী দেশের মানুষদেরও মনের অবস্থা একইরকমই থাকে। ভঙ্গুর জীবনটা আর যেন ঠিক হয় না তাদের। যুদ্ধ যে ক্ষতি করে, তা আজীবন বয়ে নিতে হয় হতভাগ্য মানুষগুলোকে।
যুদ্ধপীড়িত এলাকায় সবচেয়ে বেশি দেখা যায় বিষন্নতা ও উদ্বেগ। গবেষকেরা লক্ষ করেছেন, বয়স বাড়লে বিষণ্নতা ও উদ্বেগের হার বাড়ে এবং বিষণ্নতা পুরুষদের চেয়ে নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। অর্থাৎ, বয়স্ক মানুষ ও নারীরা এই সংকটে আলাদা ঝুঁকিতে থাকেন। ভয়াবহ কোনো ঘটনার পর কিছু মানুষের মধ্যে এমন কিছু লক্ষণ দেখা দেয়, যেগুলো তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে। যেমন, কোনো ঘটনার স্মৃতি বারবার অনিচ্ছায় ফিরে আসা, দুঃস্বপ্ন, সেই ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয় এমন সবকিছু এড়িয়ে চলা এবং সারাক্ষণ বিপদের আশঙ্কায় সতর্ক থাকা। মানসিক অবস্থার এই পর্যায়কে বলা হয় পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসওর্ডার (পিটিএসডি)। তবে, যুদ্ধ দেখা প্রত্যেক মানুষের পিটিএসডি হয় না। ভয়, শোক বা ঘুমের সমস্যাকে সব সময় রোগ বলে দাগিয়ে দেওয়াও ঠিক নয়। কিন্তু এসব লক্ষণ যদি ৬ মাসের দীর্ঘ সময় থাকে এবং দৈনন্দিন জীবন চালানো কঠিন করে তোলে, তখন চিকিৎসকের দ্বারস্থ হওয়া জরুরি।
শোক একটি স্বাভাবিক মানবিক প্রতিক্রিয়া, কিন্তু যুদ্ধের মধ্যে অনেক সময় শোক করারও সুযোগ থাকে না। মৃত্যুর খবর আসে, আবার পালাতে হয়। কাঁদার সময় মেলে না। সেই না করা শোক পরে ভয়াবহ রূপে ফিরে এসে মারাত্মক মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
এছাড়া, শিশুরা সব সময় বলে বোঝাতে পারে না যে তারা কেমন আছে। তাদের কষ্ট প্রকাশ পায় আচরণে। কেউ হঠাৎ চুপ হয়ে যায়, কেউ খিটখিটে হয়ে ওঠে, কেউ বিছানায় প্রস্রাব করতে শুরু করে, কেউ মা-বাবার সঙ্গ ছাড়তে চায় না।
২০২৬ সালের ১৯ মার্চ গাজার শিশুদের নিয়ে ইউএনএফপিএ’র এক কর্মকর্তা বলেছেন, সেখানে ১০ লাখেরও বেশি শিশুর মানসিক সহায়তা দরকার। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী- ৯৬ শতাংশ শিশু মনে করে, মৃত্যু যেকোনো সময় আসতে পারে। একটু ভাবুন তো, যে বয়সে একটা শিশুর সবচেয়ে বড় চিন্তা থাকার কথা কাল কী খাবে, কী খেলবে, কোথায় ঘুরতে যাবে, সেই বয়সে সে নিশ্চিত থাকে যে- সে খুব শিগগিরই মারা যাবে!
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত ডব্লিউএইচও’র হিসাবে ইউক্রেনে মানসিক স্বাস্থ্য সংকটে ভুগছেন আনুমানিক ১ কোটি মানুষ। এ বছর মে মাসে সংস্থাটির ইউক্রেন প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ৭১ শতাংশ মানুষ উদ্বেগ, মানসিক চাপ ও নির্ঘুম রাতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি এটাও বলেছেন, এর প্রভাব আগামী কয়েক প্রজন্ম পর্যন্ত টের পাওয়া যাবে। ঘর ছাড়তে বাধ্য হওয়া মানুষের অবস্থা আরও ভয়াবহ। দেশের ভেতরে বাস্তুচ্যুত মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যসমস্যা তুলনামূলক বেশি। আরও আছে পরিবারের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার উদ্বেগ। মা হয়ত সন্তানকে নিয়ে নিরাপদ কোথাও আছেন, কিন্তু স্বামী বা বাবা-মা রয়ে গেছেন সংঘাতের এলাকায়। প্রতিদিন ফোনের অপেক্ষা ও খবরের ভয়ে তারাও তটস্থ থাকেন। যারা সেবা দেবেন, তারাও নিরাপদ নন। যুদ্ধ শুরুর পর এ পর্যন্ত স্বাস্থ্যকর্মী, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও পরিবহনের ওপর ৩ হাজারেরও বেশি হামলা হয়েছে।
আবার ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিলে প্রকাশিত ইউনিসেফের তথ্যমতে, সুদানে তিন বছরের যুদ্ধে ৯০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। যাদের ৫ জনের মধ্যে তিনজনই শিশু। সংস্থাটি বলছে, অনেক শিশু সম্পূর্ণ গুটিয়ে গেছে। ওয়ার চাইল্ডের হিসাবে ১ কোটি ৭০ লাখ শিশু এখনো স্কুলের বাইরে। ২০২৫ সালের মার্চে প্রকাশিত আল-কাদারিফের বাস্তুচ্যুত শিবিরে এমএসএফের একটি সমীক্ষা বলছে, মানসিক সমস্যায় ভোগা শিশুদের ২০ শতাংশেরও কম সেবা পেয়েছে। কারণ, মানসিক কষ্ট নিয়ে সামাজিক সংকোচ এখনো প্রবলভাবে রয়ে গেছে আমাদের পৃথিবীতে।
তাহলে কী করা যায়?
যুদ্ধের মধ্যে কাউন্সেলিং দিয়ে সব সমস্যা মেটানো যায় না। আগে দরকার নিরাপত্তা, খাবার, পানি ও চিকিৎসা। তারপরও কিছু কাজ যুদ্ধের মধ্যেও করা যায় এবং করা হচ্ছে। শিশুদের জন্য নিরাপদ জায়গা তৈরি করা, যেখানে তারা খেলতে, আঁকতে বা গল্প বলতে পারে। স্থানীয় শিক্ষক ও স্বেচ্ছাসেবীদের প্রাথমিক মানসিক সহায়তার প্রশিক্ষণ দেওয়া। ত্রাণের বাজেটে খাবার ও ওষুধের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যকেও জায়গা দেওয়া। আরেকটা কাজ আছে, যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- মানুষের কথা শোনা। এ বছর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য ফেডারেশনের ঘোষিত প্রতিপাদ্যও ‘লিভড এক্সপেরিয়েন্সেস হার্ড : রিয়েল ভয়েসেস, রিয়েল চেঞ্জ’। অর্থাৎ, নিজের অভিজ্ঞতার কথা মানুষের নিজের মুখ থেকে শোনা।
যুদ্ধ থামানো রাজনীতির হাতে। কিন্তু সেই যুদ্ধের মধ্যে একটা শিশুকে একটু নিরাপদ বোধ করানো, একজন মায়ের কথা মন দিয়ে শোনা, একজন বাস্তুচ্যুত মানুষকে বোঝানো যে তিনি একা নন, এই কাজগুলো করা খুবই জরুরি; যেন বিশ্বের প্রতিটা মানুষ মানসিকভাবে কিছুটা হলেও সুস্থ থাকতে পারে।
সময়ের আলো/মহু