মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবিলায় সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিরোধ ও চিকিৎসা— উভয় ক্ষেত্রেই এর ভূমিকা রয়েছে। সামাজিক, অর্থনৈতিক বা পারিবারিক প্রতিকূলতার মধ্যে থাকা মানুষের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। তাদের মধ্যে যারা মানসিক কষ্ট ও যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। তাদের চাহিদা ও উদ্বেগ বুঝে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে।
বিশ্বজুড়ে বর্তমানে প্রায় ১২০ কোটি মানুষ বিভিন্ন ধরনের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। বাংলাদেশেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৩ কোটি মানুষ বা প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। এর মধ্যে বিষণ্নতা ও উদ্বেগজনিত সমস্যা বেশি দেখা যায়।
দেশে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের প্রায় ৯২ শতাংশ কোনো ধরনের চিকিৎসাসেবা পান না। অনেকেই পেশাদার চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে চান না। সচেতনতার অভাব ও সামাজিক কুসংস্কার এর অন্যতম কারণ। আমাদের সমাজে মানসিক রোগকে এখনও গোপন রাখার প্রবণতা রয়েছে। অনেকেই একে ‘পাগলামি’ বলে মনে করেন। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার পরিবারের সদস্যরা সময়মতো সাহায্য চান না।
দেশে প্রয়োজনের তুলনায় মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানীর সংখ্যা খুবই কম। অতিরিক্ত জনসংখ্যা, কর্মসংস্থানের অভাব, কর্মক্ষেত্রের চাপ ও পারিবারিক দ্বন্দ্ব মানুষের মানসিক চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত হলে অনেকে চিকিৎসকের পরিবর্তে ওঝা, কবিরাজ বা অন্যান্য অপচিকিৎসার শরণাপন্ন হন। এতে যথাযথ চিকিৎসা পেতে দেরি হয় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমস্যা আরও জটিল হয়ে ওঠে।
প্রতি বছর ১০ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে আন্তর্জাতিকভাবে দিবসটি পালন করা হয়। ১৯৯২ সালের ১০ অক্টোবর ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেন্টাল হেলথ প্রথমবারের মতো দিবসটি পালন করে। শুরুতে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে শিক্ষিত করে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
২০২৬ সালের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য ‘জীবনের অভিজ্ঞতার কণ্ঠস্বর শুনি : বাস্তব কণ্ঠ, বাস্তব পরিবর্তন’। এর মূল বক্তব্য হলো, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতিকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে এবং দোষারোপ না করে সহমর্মিতা ও সমর্থন জানাতে হবে।
মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ বহুমুখী। জিনগত, জৈবিক, পরিবেশগত ও মনস্তাত্ত্বিক নানা কারণের সম্মিলিত প্রভাবে এসব সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিছু মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ক্ষেত্রে পারিবারিক ইতিহাস ঝুঁকি বাড়াতে পারে। মস্তিষ্কের কার্যক্রমের পরিবর্তন, জীবনের প্রতিকূল অভিজ্ঞতা, কাজের চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, মানসিক আঘাত ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতাও এর সঙ্গে সম্পর্কিত।
বিষণ্নতা, উদ্বেগজনিত সমস্যা, বাইপোলার ডিসঅর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া, সাইকোসিস, মাদকাসক্তি, অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার, স্বাস্থ্য নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ, আঘাত পরবর্তী মানসিক চাপ, প্যানিক অ্যাটাক, ফোবিয়া, কনভারশন ডিসঅর্ডার ও ব্যক্তিত্বজনিত সমস্যাসহ বিভিন্ন ধরনের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ— যেকোনো বয়সের নারী-পুরুষ এসব সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন। রোগের ধরন ও লক্ষণ একেক রকম হলেও যথাযথ চিকিৎসা ও সহায়তার অভাবে এগুলো ব্যক্তিগত, সামাজিক ও পেশাগত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যও বিশেষ উদ্বেগের বিষয়। শিশুদের মৌখিক ও নীরব বুলিং তাদের মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে তাদের আত্মবিশ্বাস, সামাজিক সম্পর্ক ও সার্বিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক নির্যাতন প্রতিরোধের পাশাপাশি মানসিক নির্যাতন, অপমান ও বুলিং বন্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। শিশুদের অনুভূতি ও উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের দায়িত্ব।
আমাদের দেশে শারীরিক অসুস্থতার তুলনায় মানসিক অসুস্থতাকে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে অনেকে আধুনিক চিকিৎসা নিতে দেরি করেন। কেউ কেউ দীর্ঘদিন অপচিকিৎসার শিকার হওয়ার পর বিশেষজ্ঞের কাছে আসেন। চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হলে কিছু মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার জটিলতা বাড়তে পারে এবং সুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হতে পারে। তাই আক্রান্ত ব্যক্তিকে যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা দিয়ে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে। লোকলজ্জা ও সামাজিক ভয় দূর করে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।
মানসিক সুস্থতার জন্য ব্যক্তির স্বাধীন চিন্তা, স্বাভাবিক বিকাশ ও সুস্থ সামাজিক পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ২০১৮-১৯ সালের জাতীয় জরিপে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ব্যাপক উপস্থিতি উঠে আসে। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ১৭ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছিলেন।
নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল প্রায় ১৯ শতাংশ এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ। ১৮ বছরের কম বয়সিদের মধ্যে এ হার ছিল ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অথচ দেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত যোগ্য পেশাজীবীর সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তাদের মধ্যে রয়েছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী, কাউন্সেলিং মনোবিজ্ঞানী ও অন্যান্য প্রশিক্ষিত সেবাকর্মী। চিকিৎসাসেবার ঘাটতি এবং শহরকেন্দ্রিক ব্যবস্থার কারণে দেশের অনেক মানুষ প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন।
মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবিলায় সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিরোধ ও চিকিৎসা— উভয় ক্ষেত্রেই এর ভূমিকা রয়েছে। সামাজিক, অর্থনৈতিক বা পারিবারিক প্রতিকূলতার মধ্যে থাকা মানুষের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। তাদের মধ্যে যারা মানসিক কষ্ট ও যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে।
তাদের চাহিদা ও উদ্বেগ বুঝে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। মৌলিক চাহিদা পূরণ, সামাজিক সহায়তা এবং উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহযোগিতা দিতে হবে।
মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকার বাস্তবায়ন জরুরি। একই সঙ্গে মানুষের চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। তবে এই স্বাধীনতা চর্চার ক্ষেত্রে অন্যের অধিকার, বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা প্রয়োজন। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে সহমর্মিতার চর্চা মানসিক সুস্থতার অনুকূল পরিবেশ গড়ে তুলতে পারে। মানসিক রোগের কারণ ও চিকিৎসা নিয়ে কুসংস্কার দূর করা, এ বিষয়ে সামাজিক নীরবতা ভাঙা এবং মানসিক অসুস্থতাকে যথাযথভাবে চিকিৎসাযোগ্য স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি।
দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ২০১৮-১৯ সালের জাতীয় জরিপে দেখা যায়, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত অধিকাংশ মানুষ চিকিৎসার বাইরে রয়েছেন। মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়াতে প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ, হাসপাতাল ও কমিউনিটি পর্যায়ে সেবা সম্প্রসারণ এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয় করা দরকার। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা সম্পর্কে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ ও পরামর্শসেবাও জোরদার করতে হবে।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের পথে দীর্ঘসূত্রতা একটি বড় বাধা। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, রোগের লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর মানসিক স্বাস্থ্যসেবাদাতার কাছে পৌঁছাতে একজন রোগীর গড়ে ৩৮ মাস সময় লাগতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই সময় আরও দীর্ঘ হয়।
বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার আগে অনেক রোগী ফার্মাসিস্ট, সাধারণ চিকিৎসক, ধর্মীয় নেতা বা কবিরাজের শরণাপন্ন হন। এতে সঠিক চিকিৎসা পেতে দেরি হতে পারে। তাই মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা ও সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি কোথায় এবং কীভাবে চিকিৎসা পাওয়া যায়, সে তথ্য সহজলভ্য করতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে হবে।
দেশে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, পাবনা মানসিক হাসপাতাল, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র এবং বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা রয়েছে। বেসরকারি পর্যায়েও কিছু প্রতিষ্ঠান এ সেবা দিচ্ছে। তবে সেবার পরিধি, শয্যাসংখ্যা, প্রশিক্ষিত জনবল ও ব্যয়ের সীমাবদ্ধতা অনেক মানুষের জন্য চিকিৎসা পাওয়া কঠিন করে তুলছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সেবার সক্ষমতা বাড়ানো, চিকিৎসার ব্যয় সহনীয় করা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবা পৌঁছে দেওয়া জরুরি।
মানসিক স্বাস্থ্য ও শারীরিক স্বাস্থ্য পরস্পরের পরিপূরক। একটিকে অবহেলা করে অন্যটির পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই সরকারের স্বাস্থ্যনীতিতে মানসিক স্বাস্থ্যকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। এ খাতে বাজেট ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করতে হবে এবং সব শ্রেণির মানুষের জন্য সহজলভ্য ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে কেবল সংকটকালীন উদ্যোগ হিসেবে নয়, নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবার অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা দরকার। সামাজিক কুসংস্কার দূর করা, সহমর্মিতা বাড়ানো এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই মানসিকভাবে সুস্থ ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
লেখক : অতিরিক্ত সচিব (অব.)
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে