কুমিল্লায় স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনকে (১৪) ধর্ষণের পর হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন অটোরিকশাচালক সুমন। শনিবার (১০ অক্টোবর) সন্ধ্যায় কুমিল্লার ৬ নম্বর আমলী আদালতের বিচারক মমিনুল হকের কাছে জবানবন্দি দেন সুমন। এসময় আদালত তার জবানবন্দি রেকর্ড করেছেন।
জেলা গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) পবিত্র সরকার ও কুমিল্লার আদালত পুলিশের পরিদর্শক সাদেকুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
কুমিল্লার আদালত পুলিশের পরিদর্শক সাদেকুর রহমান বলেন, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করার পর আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। সকল আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে কারাগারে পাঠানো হয়।
এদিকে ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সংবাদ সম্মেলন করেছে জেলা পুলিশ। জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) পঙ্কজ বড়ুয়া সংবাদ সম্মেলনে বলেন, স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনকে ৩০০ টাকার ভাড়ার বিনিময়ে শর্টকাটে পদুয়ার বাজার থেকে রেসকোর্স এলাকায় নেওয়ার কথা বলে হোটেল নূরজাহানের পাশ দিয়ে চাঁদপুর সড়কে নিয়ে যান। এসময় তাজমিন অটোরিকশাচালক সুমনকে ১০০ টাকা দেয় কলা ও পাউরুটি কেনার জন্য। কলা-পাউরুটি কিনে একপর্যায়ে লাকসাম উপজেলার বিজরা এলাকায় ঘুরিয়ে অটোরিকশাটি লালমাই-বাগমারা হয়ে জগতপুর এলাকার নির্জন সড়কে নিয়ে থামান।
এসময় তাজমিনকে ধর্ষণের চেষ্টা করলে দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে অটোরিকশাটি ধানক্ষেতে কাত হয়ে পড়ে যায়। এসময় পালানোর চেষ্টা করে তাজমিন। ধানক্ষেতের ওপর দিয়ে দৌড়াতে থাকলেও পেরে ওঠেনি শেষ পর্যন্ত। একটি ধানক্ষেতের আইলের পাশে গিয়ে তাজমিনকে ধরে ফেলেন সুমন। এতে দুর্বল হয়ে পড়ে ভিকটিম তাজমিন। এই সুযোগে তাজমিনকে ধর্ষণ করে পরে গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন সুমন।
মৃত্যু নিশ্চিত করতে মাথার ওপর পা দিয়ে চেপে ধরে রাখা হয়। পরে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন অটোরিকশা ফেলেই। যাওয়ার সময় তাজমিনের ভ্যানেটি ব্যাগে থাকা আইফোন সঙ্গে করে নিয়ে যান। পরে পাশের একটি মসজিদের সামনে পুকুরে গোসল করে বাখরাবাদ এলাকার একটি পুকুর পাড়ে আইফোনটি লুকিয়ে রেখে চট্টগ্রামের দিকে চলে যান সুমন। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) দুপুরে চট্টগ্রাম নগরীর অলংকার এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ।
প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের ধানক্ষেত থেকে জান্নাতুল তাজমিন (১৪) নামের এক স্কুলছাত্রীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত তাজমিন যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়াতলা গ্রামের আব্দুল আলিমের মেয়ে। সে কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তন স্কুলের ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সে আর স্কুলে যায়নি বলে জানিয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ।
তাজমিনের বাবা আব্দুল আলিম রেনেটা ওষুধ কোম্পানির কুমিল্লা রিজিয়নে চাকরি করছেন। তারা কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। গত ৪ অক্টোবর সকালে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয় তাজমিন। গত বুধবার (৭ অক্টোবর) রাত ১২টা ১৯ মিনিটের সময় তাকে সবশেষ কুমিল্লার হোটেল নূরজাহানের সামনে দেখা গেছে। ওইদিন রাত ২টা ৫৮ মিনিটে বাবার হোয়াটসঅ্যাপে তার লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে তাকে নিয়ে যেতে বলে একটি বার্তা দেয়।
তখন বাবা ঘুমিয়ে থাকায় সে বার্তাটি দেখতে পাননি তিনি। পরদিন সকালে অজ্ঞাত হিসেবে তার মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে পরিচয় শনাক্ত হয়। মরদেহের পাশে পড়ে থাকা সিএনজিচালিত অটোরিকশা জব্দ করে পুলিশ। ঘটনার পর নিহত তাজমিনের বাবা আব্দুল আলিম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। ঘটনায় জড়িত ঘাতক অটোরিকশাচালক সুমনকে চট্টগ্রামের অলংকার এলাকা থেকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ।
সময়ের আলো/আতা