কক্সবাজারে গিয়েছিল এক যুবকের ডাকে। চারদিন নিখোঁজ থাকার পর বাসে করে ফিরেছিল কুমিল্লায়। কিন্তু বাড়ি আর ফেরা হলো না সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের। বাড়ি ফেরার পথে ধর্ষণের পর তাকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে এক অটোরিকশাচালকের বিরুদ্ধে।
পুলিশ জানায়, ফেসবুকের মাধ্যমে কুমিল্লার রেসকোর্স এলাকার বাসিন্দা তাজমিনের সঙ্গে পরিচয় হয় কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে কর্মরত রাজু চৌধুরী (২০) নামে এক যুবকের। তাদের পরিচয় ও সম্পর্কের বয়স ছিল মাত্র ১৭ দিন। ওই যুবকের ডাকে সাড়া দিয়ে তাজমিন কক্সবাজারে গিয়েছিল।
চার দিন নিখোঁজ থাকার পর বুধবার (৭ অক্টোবর) রাতে কক্সবাজার থেকে বাসে করে কুমিল্লায় ফেরে সে। রাত সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পদুয়ারবাজার বিশ্বরোডের হোটেল নূরজাহানের সামনে আইকনিক এক্সপ্রেসের বাস থেকে নামতে দেখা যায় তাকে। সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে সেই দৃশ্য।
সেখান থেকে রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে তাজমিন। কিন্তু সেই যাত্রাই হয়ে ওঠে তার জীবনের শেষ যাত্রা।
পুলিশের ভাষ্য, অটোরিকশাচালক মো. সুমন মিয়া (৩৫) তাকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণের পর গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করেন। বৃহস্পতিবার সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে উদ্ধার করা হয় তাজমিনের মরদেহ। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সুমন আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তাজমিনের কক্সবাজার যাত্রার তথ্যও সামনে এসেছে। কক্সবাজারের একটি ট্রাভেল এজেন্সির কর্মী আবদুল্লাহ জানান, মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাতে তাজমিন ও রাজু বাসের টিকিট কাটতে তাদের কাউন্টারে আসেন। পরদিন বুধবার দুপুর ১২টার দিকে আইকনিক এক্সপ্রেসের বাসটি কুমিল্লার উদ্দেশে কক্সবাজার ছেড়ে যায়।
তাজমিন হত্যার ঘটনা আলোচনায় আসার পর সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে বাসে যাওয়া মেয়েটিকে শনাক্ত করেন আবদুল্লাহ। পরে তিনি জানতে পারেন, তাজমিনের সঙ্গে কক্সবাজার যাওয়া রাজু এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত নন। পুলিশও জানিয়েছে, এ ঘটনায় হত্যাকারী একজনই— অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া।
এদিকে তাজমিনের মা কেয়া খাতুন জানান, মেয়ের সঙ্গে তার শেষ কথা হয় বৃহস্পতিবার বিকেলে। তখন তাজমিন জানিয়েছিল, সে এক বান্ধবীর সঙ্গে আছে। মেয়েকে সেখান থেকে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন তিনি। এ জন্য বান্ধবীর নাম ও তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চাইলেও তাজমিন কিছু জানায়নি।
মেয়ের বন্ধুবান্ধব নিয়ে আগে থেকেই উদ্বিগ্ন ছিলেন কেয়া খাতুন। কোনো অঘটন ঘটতে পারে,এমন আশঙ্কায় প্রায় ছয় মাস মেয়েকে স্কুলে যেতে দেননি। মেয়ের চলাফেরা ও বন্ধুত্বের বিষয়ে খোঁজ রাখারও চেষ্টা করতেন। কিন্তু এত সতর্কতার পরও মেয়েকে রক্ষা করতে পারেননি তিনি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, তাজমিনের মা যে বান্ধবীকে নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন, তার বয়স তাজমিনের চেয়ে বেশি। তবে হত্যাকাণ্ডে ওই বান্ধবী বা তার পরিবারের সম্পৃক্ততার কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
তাজমিনের শিক্ষক সাদ বিন এরশাদ বলেন, আমি তাকে দীর্ঘদিন পড়িয়েছি। সে খুবই চঞ্চল স্বভাবের ছিল। তার মা অসুস্থ হলে দুই যমজ ছোট ভাইয়ের দেখভাল করত তাজমিন। তার বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন। এ কারণে তার বাবা সকালে বাসা থেকে বের হলে রাতে ফিরতেন। তবে বাবা তাজমিনকে খুব আদর করতেন। ঘরে রাগ হলে সে হুটহাট করে বাসা থেকে বের হয়ে যেত।
সময়ের আলো/আতা