কিশোর গ্যাং : বেড়ে উঠছে কি এক দস্যু প্রজন্ম!

সাইফুল ইসলাম

মতামত

একটি সমাজের ভবিষ্যৎ কোথায় লুকিয়ে থাকে? তার সংসদ ভবনে, সচিবালয়ে, আদালতের রায় কিংবা রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের পরিসংখ্যানে? এসবের মধ্যে ভবিষ্যতের কিছু

2026-10-11T20:52:13+00:00
2026-10-11T20:52:13+00:00
 
  রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬,
২৬ আশ্বিন ১৪৩৩
রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬
মতামত
কিশোর গ্যাং : বেড়ে উঠছে কি এক দস্যু প্রজন্ম!
সাইফুল ইসলাম
প্রকাশ: রোববার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:৫২ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
একটি সমাজের ভবিষ্যৎ কোথায় লুকিয়ে থাকে? তার সংসদ ভবনে, সচিবালয়ে, আদালতের রায় কিংবা রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের পরিসংখ্যানে? এসবের মধ্যে ভবিষ্যতের কিছু উপাদান নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু একটি সমাজের প্রকৃত ভবিষ্যৎ লুকিয়ে থাকে তার শিশু-কিশোরদের চোখে। সেই চোখে যদি স্বপ্নের পরিবর্তে প্রতিশোধ, বন্ধুত্বের পরিবর্তে আধিপত্য এবং সাহসের পরিবর্তে অন্যকে ভয় দেখানোর আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়, তাহলে বুঝতে হবে, সমাজের কোথাও একটি বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে গেছে। বিপর্যয়টি দৃশ্যমান হওয়ার আগেই তার বীজ বপন করা হয়েছিল পরিবারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, পাড়ার অলিগলিতে এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতাকাঠামোর গভীরে।

বাংলাদেশে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার নিয়ে সাম্প্রতিক উদ্বেগকে এই বৃহত্তর বাস্তবতার বাইরে রেখে বিচার করার উপায় নেই। প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে কিশোরেরা কেন অপরাধ করছে। প্রশ্নটি আরও গভীর : কোন সামাজিক ব্যবস্থা একটি কিশোরকে অপরাধের মধ্যে তার পরিচয়, ক্ষমতা ও আত্মপ্রতিষ্ঠার উপায় খুঁজে নিতে উৎসাহিত করছে?

১. সংবাদপত্রের পাতায় কিশোরের রক্ত

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশের কয়েকটি জেলার ঘটনা কিশোর গ্যাংয়ের সমস্যাটিকে আবারও সামনে নিয়ে আসে। ২৯ সেপ্টেম্বর দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, কিশোর গ্যাং-সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর ও নোয়াখালীতে পুলিশের অভিযানে ১,৩১০ জনকে আটক করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে অন্তত ৭৩০ জনকে অভিভাবকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—আটক হওয়া মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক কিশোর-তরুণকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা সমস্যাটির ব্যাপ্তি সম্পর্কে উদ্বেগ তৈরি করে। একই প্রতিবেদনে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের বরাত দিয়ে মে মাসে রাজধানীতে ১২৭টি কিশোর গ্যাং বা গ্যাংয়ের উপদলের কথা উল্লেখ করা হয়। ‘সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬’ 

এর পরদিন, ৩০ সেপ্টেম্বর, চট্টগ্রামে ১৬ বছর বয়সী সবজি বিক্রেতা মো. হৃদয় হত্যার ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, স্থানীয় দুটি গোষ্ঠীর ‘সিনিয়র-জুনিয়র’ বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। এ ঘটনায় আটজনকে আটক করার কথা জানায় পুলিশ, যাঁদের মধ্যে পাঁচজন অপ্রাপ্তবয়স্ক। তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ের এই বক্তব্যকে চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত হিসেবে নেওয়া যায় না। কিন্তু ঘটনাটি যে প্রশ্ন সামনে আনে, তা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই: কিশোর বয়সে বিরোধ মীমাংসার ভাষা যখন যুক্তি কিংবা কথোপকথন না হয়ে ছুরি ও চাপাতি হয়ে ওঠে, তখন সেই সহিংসতার সামাজিক উৎস কোথায়? ‘সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬’ 

একই মাসে কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ডও কিশোরদের নিরাপত্তা ও অপরাধপ্রবণতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে ২২ সেপ্টেম্বর দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পরিবার, বিদ্যালয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য প্রকাশ করে। ‘সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬’ 

এই ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি অপরাধ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আবার এগুলোর ভিত্তিতে দেশের সব কিশোরকে অপরাধী কিংবা একটি গোটা প্রজন্মকে দস্যু বলে চিহ্নিত করাও অন্যায়। বরং এসব ঘটনা আমাদের এমন একটি সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়, যেখানে কিশোর অপরাধের সঙ্গে কিশোরদের অপরাধের শিকার হওয়ার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হয়।

২. কিশোরেরা কি হঠাৎ অপরাধী হয়ে ওঠে?

কোনো শিশু একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধান্ত নেয় না যে সে একজন সন্ত্রাসী হবে। অপরাধপ্রবণতার পেছনে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত থাকে, কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের সামাজিক পটভূমিও থাকে। পরিবারের অবহেলা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সহিংস পরিবেশ, মাদকের সহজলভ্যতা, সুস্থ বিনোদনের অভাব, বিদ্যালয় থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং অপরাধের মাধ্যমে দ্রুত পরিচিতি অর্জনের প্রলোভন—সবকিছু মিলিয়ে কোনো কোনো কিশোরের সামনে একটি বিকৃত জীবনদর্শন তৈরি হয়।

তবে দারিদ্র্যকে অপরাধের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখাও ভুল। দরিদ্র পরিবারের অসংখ্য কিশোর কঠোর পরিশ্রম করে, পড়াশোনা করে, পরিবারের দায়িত্ব নেয় এবং মানুষের মতো মানুষ হয়ে ওঠে। অন্যদিকে সচ্ছল পরিবারের কিশোরও অপরাধে জড়াতে পারে। অতএব, কিশোর অপরাধের ব্যাখ্যা খুঁজতে গেলে অর্থনৈতিক অবস্থার পাশাপাশি পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিকীকরণ, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা, সমবয়সীদের প্রভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাকে বিবেচনায় নিতে হবে।

কিশোর গ্যাং অনেক সময় তার সদস্যকে এমন একটি অনুভূতি দেয়, যা সে পরিবারে কিংবা বিদ্যালয়ে পায় না—গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার অনুভূতি। সে মনে করে, কয়েকজন সঙ্গী তার পাশে আছে, তার কথার মূল্য আছে, তার উপস্থিতিতে অন্যেরা ভয় পায়। এই ভয়কে সে সম্মান বলে ভুল করে। তার কাছে ক্ষমতার অর্থ হয়ে ওঠে অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করা; স্বাধীনতার অর্থ হয়ে ওঠে নিয়ম ভাঙা; আর সাহসের অর্থ হয়ে ওঠে সংঘর্ষে এগিয়ে যাওয়া।

এই মানসিকতার বিরুদ্ধে কেবল নৈতিক উপদেশ দিয়ে জয়ী হওয়া যাবে না। কারণ যে সমাজে বৈধ পথে প্রতিষ্ঠা অর্জন কঠিন, অথচ অবৈধ পথে প্রভাব বিস্তার করতে পারলে দ্রুত পরিচিতি পাওয়া যায়, সেখানে কিছু কিশোর ভুল পথকে আকর্ষণীয় মনে করবেই। সমাজ যদি এই বিকৃত সাফল্যের ধারণা ভাঙতে না পারে, তাহলে গ্যাংয়ের নাম বদলাবে, সদস্য বদলাবে, কিন্তু অপরাধের সামাজিক ভিত্তি থেকে যাবে।

৩. কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে প্রাপ্তবয়স্কদের ছায়া

কিশোর গ্যাং নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি হলো, এই কিশোরেরা কার কাছ থেকে অপরাধের কৌশল শিখছে, কার কাছ থেকে আশ্রয় পাচ্ছে এবং কার স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে?

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদনে অপরাধবিজ্ঞানী অধ্যাপক ওমর ফারুকের বক্তব্যের সূত্রে বলা হয়, কিছু অপরাধী নেটওয়ার্কে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিরা কিশোরদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বা ব্যবহার করছেন। প্রতিবেদনে কিশোরদের দিয়ে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও জমি দখলের মতো কর্মকাণ্ডে সহায়তা নেওয়ার অভিযোগও উঠে আসে। এসব অভিযোগের প্রতিটি ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট প্রমাণ ও তদন্ত প্রয়োজন; তবু বৃহত্তর সমস্যাটি স্পষ্ট—কিশোর অপরাধের সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধী নেটওয়ার্কের যোগসূত্র থাকলে কেবল কিশোরদের আটক করে সেই নেটওয়ার্ক ভাঙা সম্ভব নয়। ‘সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬’ 

একজন কিশোর যদি অপরাধ করে এবং তার পেছনে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি তাকে ব্যবহার করে, তাহলে শাস্তির প্রশ্নে কিশোরকে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি সেই প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ভূমিকাও অনুসন্ধান করতে হবে। কিশোরের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া ব্যক্তি, অপরাধের অর্থ জোগানো ব্যক্তি, অপরাধের পর তাকে আশ্রয় দেওয়া ব্যক্তি কিংবা নিজের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জন্য তাকে ব্যবহার করা ব্যক্তি—কেউই দায়মুক্ত থাকতে পারেন না।

আমাদের সামাজিক জীবনে একটি বিপজ্জনক দ্বিচারিতা আছে। ক্ষমতাবান কোনো ব্যক্তি নিজের স্বার্থে তরুণদের ব্যবহার করলে তাকে অনেক সময় রাজনৈতিক কর্মী তৈরি করা, প্রভাব বিস্তার কিংবা প্রতিপক্ষকে মোকাবিলার কৌশল হিসেবে দেখা হয়। অথচ একই তরুণ যখন অপরাধের দায়ে ধরা পড়ে, তখন তার পরিচয় হয়ে যায় সন্ত্রাসী। এই দ্বিচারিতা অপরাধের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে।

কিশোরের অপরাধ অবশ্যই অপরাধ। কিন্তু তাকে অপরাধের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির দায়ও কম নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে সেই প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিই অপরাধের প্রকৃত সংগঠক। রাষ্ট্র যদি কেবল দৃশ্যমান কিশোরটিকে ধরে এবং অদৃশ্য পৃষ্ঠপোষককে আড়ালে থাকতে দেয়, তাহলে আইন প্রয়োগের দৃশ্য তৈরি হবে, কিন্তু অপরাধের কাঠামো অক্ষত থাকবে।

৪. পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজের অনুপস্থিতি 

একটি শিশুর প্রথম বিদ্যালয় তার পরিবার। সেখানে সে শেখে মানুষকে সম্মান করতে, নিজের ভুল স্বীকার করতে, রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে এবং অন্যের কষ্ট বুঝতে। কিন্তু পরিবার যদি কেবল পরীক্ষার ফল, ভালো চাকরি কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠাকে সাফল্যের মাপকাঠি বানায়, আর শিশুর ভয়, হতাশা ও একাকিত্বকে গুরুত্ব না দেয়, তাহলে তার মানসিক জগতে শূন্যতা তৈরি হতে পারে।

এখানে অভিভাবকদের সবাইকে অভিযুক্ত করা অন্যায় হবে। বাংলাদেশের বহু পরিবার সীমিত আয়, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, নগরজীবনের ব্যয় এবং নানা সামাজিক চাপের মধ্যে সন্তানকে বড় করছে। অনেক অভিভাবক সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগই পান না। আবার অনেক পরিবারে শাসনের নামে অপমান, মারধর কিংবা ভয় দেখানোর চর্চা রয়েছে। এসব পরিস্থিতি কিশোরের আচরণ ও সম্পর্ক গঠনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বিদ্যালয়ের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যালয় যদি শুধু পাঠ্যবই শেষ করা, পরীক্ষায় নম্বর পাওয়া এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, তাহলে শিক্ষার্থীর আবেগ, সামাজিক দক্ষতা, নৈতিক বোধ ও মানসিক সংকট চিহ্নিত করার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। যে কিশোর নিয়মিত বিদ্যালয় থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, হঠাৎ আচরণ বদলাচ্ছে, সহিংস বন্ধুমহলে জড়িয়ে পড়ছে কিংবা মাদকাসক্তির ঝুঁকিতে রয়েছে, তাকে শনাক্ত করার জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা প্রয়োজন।

এমনকি পাড়ার সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও একসময় একটি ভূমিকা ছিল। খেলার মাঠ, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক সংগঠন, বিতর্কের আসর, নাটকের দল, স্থানীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা—এসবের মধ্যে দিয়ে কিশোরেরা দলবদ্ধ হতে শিখত, প্রতিযোগিতার নিয়ম মানত এবং পরাজয় মেনে নিতে শিখত। আজ অনেক এলাকায় মাঠ নেই, পাঠাগার নিষ্ক্রিয়, সাংস্কৃতিক আয়োজন সীমিত। শূন্যস্থানটি কখনো দখল করে নেয় মাদক, কখনো অনলাইন উত্তেজনা, কখনো গ্যাংয়ের তথাকথিত ভ্রাতৃত্ব।

সমাজ কিশোরদের জন্য কী ধরনের জায়গা তৈরি করছে, সেই প্রশ্ন না করে শুধু কিশোরদের চরিত্র নিয়ে আলোচনা করা আত্মপ্রবঞ্চনার নামান্তর।

৫. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অপরাধের প্রদর্শনী 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিশোর অপরাধের একমাত্র কারণ নয়। প্রযুক্তি মানুষকে জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও যোগাযোগের অসাধারণ সুযোগও দিয়েছে। কিন্তু এর অপব্যবহার কিশোর গ্যাং সংস্কৃতিকে নতুন মাত্রা দিতে পারে।

অস্ত্র হাতে ছবি তোলা, প্রতিপক্ষকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া, সংঘর্ষের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা অপরাধের দৃশ্যকে সাহসিকতার প্রদর্শনীতে পরিণত করার মাধ্যমে সহিংসতা কখনো কখনো একধরনের সামাজিক স্বীকৃতি পায়। অনলাইনে অনুসারী, প্রতিক্রিয়া কিংবা পরিচিতি অর্জনের আকাঙ্ক্ষা বাস্তব জীবনের সংঘর্ষকে আরও উসকে দিতে পারে। অপরাধ তখন শুধু একটি ঘটনা থাকে না; তা হয়ে ওঠে পরিচয় প্রদর্শনের মাধ্যম।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো সহিংস ভিডিও দেখা মানেই কেউ অপরাধে জড়িয়ে পড়বে, এমন সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। প্রয়োজন হলো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অনলাইন প্রভাব কীভাবে বাস্তব আচরণের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, তা বোঝা। অভিভাবক ও শিক্ষকদের ডিজিটাল সচেতনতা বাড়াতে হবে, কিশোরদের অনলাইন নিরাপত্তা শেখাতে হবে এবং অপরাধমূলক হুমকি বা সহিংসতার প্রচার মোকাবিলায় আইনসম্মত ব্যবস্থা নিতে হবে।

একই সঙ্গে গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব রয়েছে। অপরাধের বিবরণ প্রকাশ করা প্রয়োজন, কিন্তু অপরাধী গোষ্ঠীকে রোমাঞ্চকর নাম, অতিরঞ্জিত বর্ণনা কিংবা অযাচিত প্রচারের মাধ্যমে আকর্ষণীয় করে তোলা উচিত নয়। সংবাদে অপরাধের প্রকৃতি যেমন থাকবে, তেমনি থাকবে ভুক্তভোগীর ক্ষতি, সামাজিক পরিণতি এবং প্রতিরোধের উপায়।

৬. শুধু অভিযান নয়, চাই ন্যায়সংগত প্রতিরোধ 

কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান প্রয়োজন হতে পারে। কোনো কিশোর সহিংস অপরাধে জড়ালে কিংবা কারও জীবন বিপন্ন করলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে দায়িত্ব পালন করতেই হবে। কিন্তু অভিযানকে স্থায়ী সমাধান বলে ধরে নেওয়া ভুল।

২০২৬ সালের আগস্টের শেষে ঢাকার জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্যের বরাত দিয়ে জানানো হয়, রাজধানীর ৫০টি থানায় ১১৮টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে; মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও উত্তরায় এসব গোষ্ঠীর ঘনত্ব বেশি বলে উল্লেখ করা হয়। ‘সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬’।

উল্লিখিত পরিসংখ্যানকে নির্দিষ্ট সময়ের পুলিশি হিসাব হিসেবে বুঝতে হবে; এটি দেশের সব কিশোরের অপরাধপ্রবণতার পরিমাপ নয়।

সংখ্যাটি কমাতে হলে প্রথমে জানতে হবে, গ্যাংগুলোর সদস্য কারা, তারা কী ধরনের অপরাধে যুক্ত, কারা তাদের পরিচালনা করছে, কোন এলাকায় তারা সক্রিয় এবং কোন সামাজিক পরিস্থিতি তাদের সংগঠিত হতে সাহায্য করছে। প্রমাণভিত্তিক তথ্য ছাড়া নির্বিচারে আটক করলে নিরপরাধ কিশোরও হয়রানির শিকার হতে পারে। আর কোনো অপরাধের প্রমাণ না পেয়ে কাউকে শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

কিশোরদের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পুনর্বাসন ও সংশোধনের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশের শিশু আইন, ২০১৩ শিশুদের বিচার ও সুরক্ষার জন্য পৃথক আইনি কাঠামো দিয়েছে। সেই কাঠামোর আলোকে বয়স, অপরাধের প্রকৃতি, ব্যক্তিগত পরিস্থিতি এবং পুনর্বাসনের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, কিন্তু কিশোরকে এমনভাবে অপরাধীর পরিচয়ে আটকে রাখা যাবে না, যাতে তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।

অভিযানের পাশাপাশি প্রয়োজন স্থানীয় পর্যায়ে কিশোর সুরক্ষা কমিটি, বিদ্যালয়ভিত্তিক কাউন্সেলিং, ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের শনাক্তকরণ, খেলাধুলার মাঠ ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র পুনরুজ্জীবিত করা, মাদক সরবরাহের উৎস দমন এবং অপরাধে কিশোরদের ব্যবহারকারী প্রাপ্তবয়স্কদের বিরুদ্ধে কার্যকর তদন্ত। পুনর্বাসনের ফলাফলও পরিমাপ করতে হবে—কতজন কিশোর বিদ্যালয়ে ফিরল, কতজন প্রশিক্ষণ পেল, কতজন পুনরায় অপরাধে জড়াল না। শুধু কতজনকে আটক করা হলো, সেটি দিয়ে সাফল্য বিচার করা যাবে না।

৭. আমরা কেমন প্রজন্ম রেখে যেতে চাই?

একটি দেশের উন্নয়ন কেবল সড়ক, সেতু, উড়ালপথ কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে মাপা যায় না। উন্নয়নের একটি মৌলিক পরীক্ষা হলো, সেই দেশের কিশোরেরা কতটা নিরাপদে বড় হচ্ছে, তারা কতটা মর্যাদা পাচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য কতটা সুযোগ পাচ্ছে।

আমরা যদি কিশোরদের হাতে শুধু নিষেধাজ্ঞা তুলে দিই, কিন্তু বিকল্প না দিই, তাহলে তাদের একটি অংশ ভুল পথের দিকে ঝুঁকতেই পারে। আমরা যদি বলি, অপরাধ করো না, কিন্তু খেলাধুলার মাঠ না রাখি; মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলি, কিন্তু মাদক ব্যবসার পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিই; নৈতিকতার শিক্ষা দিই, কিন্তু ক্ষমতাবানদের অন্যায়কে প্রশ্রয় দিই—তাহলে আমাদের বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার বিরোধ তৈরি হবে।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব অপরাধ দমন করা। পরিবারের দায়িত্ব সন্তানের পাশে থাকা। বিদ্যালয়ের দায়িত্ব মানুষ গড়ে তোলা। সমাজের দায়িত্ব ভুলকে ভুল বলা এবং সঠিক পথে ফেরার সুযোগ তৈরি করা। গণমাধ্যমের দায়িত্ব সমস্যাটিকে অনুসন্ধান করা, আর রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বের দায়িত্ব নিজেদের স্বার্থে তরুণদের ব্যবহার না করা। 

এই দায়িত্বগুলোর কোনো একটিকে অন্যটির বিকল্প ভাবার অবকাশ নেই। কিশোর গ্যাংয়ের সমস্যা মোকাবিলায় আইন ও মানবিকতা পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়। বরং ন্যায়সংগত আইন প্রয়োগ এবং কার্যকর পুনর্বাসন একে অপরের পরিপূরক।

পরিশেষ : দস্যু প্রজন্ম, নাকি ব্যর্থ সমাজের প্রতিচ্ছবি?

‘দস্যু প্রজন্ম’ কথাটি ক্ষোভ থেকে জন্ম নিতে পারে, কিন্তু একে যদি আমরা পুরো কিশোরসমাজের পরিচয় বানিয়ে ফেলি, তাহলে সমস্যার সমাধান আরও কঠিন হবে। অপরাধে জড়িত কিশোরের দায় আছে; তার ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। একই সঙ্গে অপরাধে প্ররোচনা দেওয়া, কিশোরদের ব্যবহার করা কিংবা অপরাধের পরিবেশ তৈরি করার সঙ্গে যাঁদের যোগসূত্র রয়েছে, তাঁদেরও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি কিশোর যখন অপরাধ করে, তখন তার দায় ব্যক্তিগত। কিন্তু একই ধরনের অপরাধ যখন বারবার ঘটতে থাকে, তখন তার সামাজিক কারণ অনুসন্ধান করাও জরুরি হয়ে পড়ে। যে সমাজ অপরাধের শাস্তি দিতে জানে, কিন্তু অপরাধের জন্মস্থান শনাক্ত করতে পারে না, সে সমাজের সাফল্য অসম্পূর্ণ।

আজ যে কিশোরটি অন্যের হাতে ছুরি তুলে দিচ্ছে, সে হয়তো একদিন নিজেও ছুরির আঘাতে প্রাণ হারাবে। যে কিশোরটি অন্যকে ভয় দেখিয়ে ক্ষমতা অর্জন করছে, একদিন সে আরও বড় কোনো অপরাধী গোষ্ঠীর হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। এই চক্র ভাঙতে হলে অপরাধকে রোমাঞ্চের জায়গা থেকে সরিয়ে তার প্রকৃত পরিণতি দেখাতে হবে, আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার পথটিও উন্মুক্ত রাখতে হবে।

প্রশ্ন তাই শুধু কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারছি, যেখানে একজন কিশোরকে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য অপরাধী হতে হবে না? যেখানে তার সাহসের স্বীকৃতি মিলবে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য, ক্ষমতার স্বীকৃতি মিলবে জ্ঞান ও সৃজনশীলতায়, আর বন্ধুত্বের অর্থ হবে বিপদে কাউকে বাঁচানো—বিপদে ঠেলে দেওয়া নয়?

এই প্রশ্নের উত্তর পুলিশের একার কাছে নেই, পরিবারের একার কাছেও নেই। উত্তরটি নিহিত আছে আমাদের সামগ্রিক সামাজিক আচরণে, রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিতে এবং ন্যায়বিচারের প্রতি আমাদের অঙ্গীকারে।

কিশোর গ্যাংকে দমন করা জরুরি। কিন্তু তার চেয়েও জরুরি এমন একটি সমাজ নির্মাণ করা, যেখানে কিশোরদের অপরাধের দিকে ঠেলে দেওয়া হয় না, অপরাধের জন্য ব্যবহার করা হয় না এবং অপরাধে জড়িয়ে পড়লেও সংশোধনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয় না। কারণ, একটি প্রজন্মকে হারিয়ে ফেলা সহজ; তাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই সভ্যতার প্রকৃত পরীক্ষা। 

সময়ের আলো/জেডি 
  বিষয়:   কিশোর গ্যাং  দস্যু প্রজন্ম  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: