ব্যাংকে টাকা রাখার চেয়ে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করাকেই এখন তুলনামূলক নিরাপদ মনে করছেন নেত্রকোনার কলমাকান্দার অবসরপ্রাপ্ত প্রাথমিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক মোক্তার হোসেন। দীর্ঘদিন সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করলেও একসময় বেশি সুদের আশায় ব্যাংকে টাকা রেখেছিলেন তিনি। তবে ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগে আবারও ফিরেছেন সঞ্চয়পত্রে। তার মতো অনেকের কাছেই এখন নিরাপত্তা ও মুনাফা বিবেচনায় নতুন করে বিনিয়োগের আকর্ষণীয় মাধ্যম হয়ে উঠেছে সঞ্চয়পত্র। এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বিক্রির পরিসংখ্যানে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি বেড়েছে প্রায় ৫৭ শতাংশ। জুলাই ও আগস্টে এ খাতে নিট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৬৩ কোটি ১২ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৫৭২ কোটি ২৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নিট বিনিয়োগ বেড়েছে ৮৯০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।
সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বাড়ার পেছনে তুলনামূলক আকর্ষণীয় মুনাফার পাশাপাশি ব্যাংক খাত নিয়ে আমানতকারীদের উদ্বেগও ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাওয়ার সরাসরি প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ব্যাংকের বদলে সঞ্চয়পত্রে কেন : মোক্তার হোসেনের সঞ্চয়ের অভিজ্ঞতায় ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্রের মধ্যে বিনিয়োগের পালাবদল দেখা যায়। দীর্ঘদিন সঞ্চয়পত্রে টাকা রাখার পর ব্যাংকে বেশি সুদ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলে তিনি সঞ্চয়পত্র ভেঙে ব্যাংকে টাকা জমা রেখেছিলেন। কিন্তু এখন ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ থেকে আবারও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেছেন।
মোক্তার হোসেন বলেন, ‘চাকরি থেকে অবসর নেয়ার প্রতি মাসের যে সংসার খরচ, সেটা মেটাতে পেনশনের টাকাসহ জমি বিক্রির কিছু টাকা ব্যাংকে রেখেছিলাম। কিন্তু এখন ব্যাংকগুলোর যে অবস্থা দেখছি, তাতে আর সেখানে টাকা রাখার সাহস হচ্ছে না। তাই সরকারি সঞ্চয়পত্র কিনেই প্রতি মাসের খরচ ও অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছি।’
ব্যাংক খাত নিয়ে উদ্বেগের কারণে ফের সঞ্চয়পত্রের প্রতি মানুষের আগ্রহ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরাও। তাদের মতে, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বাড়ার অর্থ এই নয় যে মানুষের সঞ্চয় সক্ষমতা বেড়েছে। বরং ব্যাংকের প্রতি আস্থা কমায় অনেকে টাকা সরিয়ে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছেন। শুধু ব্যক্তি নয়, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও ব্যাংক নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
মুনাফার হারও বড় আকর্ষণ : সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বাড়ার আরেকটি কারণ হিসেবে বর্তমান মুনাফার হারকে বিবেচনা করছেন সংশ্লিষ্টরা। চলতি জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদের জন্য সঞ্চয়পত্রের বিদ্যমান মুনাফার হার বহাল রেখেছে সরকার। বর্তমানে সঞ্চয়পত্রের সর্বোচ্চ মুনাফার হার ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত। ফলে নির্দিষ্ট শর্তে এ হারে মুনাফা পাওয়ার সুযোগ বিনিয়োগকারীদের কাছে সঞ্চয়পত্রকে আকর্ষণীয় করে তুলছে।
ব্যাংকের আমানতের সুদহার, অর্থের নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগের মেয়াদ— সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে সাধারণত মানুষ সঞ্চয়ের সিদ্ধান্ত নেন। সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে সরকারের দায় থাকার বিষয়টিও অনেক বিনিয়োগকারীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
দুই মাসে নিট বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ৫৭ শতাংশ : কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রানুসারে, চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস আগস্টে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি হয়েছে ৪০৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। আগের বছরের একই মাসে এ পরিমাণ ছিল ২৭৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আগস্টে নিট বিক্রি বেড়েছে ১২৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এর আগে অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়েও সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রিতে বড় উল্লম্ফন দেখা যায়। ওই মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ সুদ ও আসল বাবদ পরিশোধের চেয়ে ২ হাজার ৫৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা বেশি ছিল।
ফলে জুলাই ও আগস্ট মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৬৩ কোটি ১২ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৫৭২ কোটি ২৯ লাখ টাকা। সে হিসেবে নিট বিনিয়োগ বেড়েছে ৫৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি বলতে নির্দিষ্ট সময়ে নতুন বিক্রির বিপরীতে আগের বিনিয়োগের আসল পরিশোধের হিসাব সমন্বয়ের পর অবশিষ্ট অর্থকে বোঝানো হয়। এ হিসাব ইতিবাচক হলে সরকার এ খাত থেকে নিট অর্থ পায়। আর পরিশোধের পরিমাণ বিক্রির চেয়ে বেশি হলে নিট বিক্রি ঋণাত্মক হয়।
তবে চলতি অর্থবছরের আগের মাস জুনে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ছিল ঋণাত্মক। ওই মাসে নতুন বিক্রির তুলনায় আগের আসল ও সুদ বাবদ পরিশোধের পরিমাণ ৩৬৮ কোটি ৯৯ লাখ টাকা বেশি ছিল।
সব মিলিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি হয়েছে মাত্র ৪৩৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ আগের অর্থবছরে এ খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ সংগ্রহের পরিমাণ ছিল তুলনামূলক কম। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসের চিত্রে সেই প্রবণতা থেকে পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
সঞ্চয়পত্রে সরকারের ঋণ ৩ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে : সঞ্চয়পত্রে নতুন বিনিয়োগ বাড়ার পাশাপাশি এ খাত থেকে সরকারের ঋণস্থিতিও বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট শেষে সঞ্চয়পত্রের বিপরীতে সরকারের ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৪৬৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।
জুলাই শেষে এ পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৬১ কোটি ৮২ লাখ টাকা। আর গত জুন শেষে সরকারের ঋণস্থিতি ছিল ৩ লাখ ৩৪ হাজার ২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার সাধারণত ব্যাংকব্যবস্থা এবং সঞ্চয়পত্রসহ বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিয়ে থাকে। তবে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ সংগ্রহ নির্ভর করে নতুন বিক্রির পাশাপাশি আগের বিনিয়োগের আসল ও মুনাফা বাবদ পরিশোধের ওপর।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা করা হয়।
ওই অর্থবছরে মোট ৯২ হাজার ৬১৭ কোটি ৭০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল। এর বিপরীতে সুদ ও আসল বাবদ সরকারকে পরিশোধ করতে হয়েছে ৯২ হাজার ৭৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর মধ্যে শুধু মুনাফা বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ৪৭ হাজার ৫১০ কোটি ৩০ লাখ টাকা। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা আরও কমিয়ে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সময়ের আলো/কেএইচও