মাত্র ৮ রানে নেই ৩ উইকেট। ব্যাটিং বিপর্যয়ে তখন দিশাহারা বাংলাদেশ। সেখান থেকে এক প্রান্ত আগলে রেখে লড়াই, অধিনায়কের সঙ্গে রেকর্ড গড়া জুটি, আর শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ইতিহাস গড়া এক সেঞ্চুরি। সোবহানা মোস্তারি দেখালেন, চাপের মুখেও কীভাবে মাথা উঁচু করে লড়তে হয়। তবে তার ১১৮ রানের দুর্দান্ত ইনিংসও শেষ পর্যন্ত দলকে জেতাতে পারেনি।
বাংলাদেশের মেয়েদের গড়া ২২০ রানের লক্ষ্য মাত্র ২৮.১ ওভারে এক উইকেট হারিয়ে টপকে গেছে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া। তবু সোবহানার ব্যাটে লেখা হলো বাংলাদেশের নারী ওয়ানডে ক্রিকেটের নতুন এক অধ্যায়।
ব্রিজবেনে রোববার টস হেরে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই বিপর্যয়ে পড়ে বাংলাদেশ। মাত্র ৮ রানের মধ্যে টপ অর্ডারের তিন ব্যাটারকে হারিয়ে চাপে পড়ে দল। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে ক্রিজে এসে হাল ধরেন সোবহানা। অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতিকে সঙ্গে নিয়ে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। তাদের ব্যাটে শুধু ইনিংসের মেরামতই হয়নি, গড়ে উঠে রেকর্ডের এক জুটি।
সোবহানার ব্যাটিংয়ে ছিল আত্মবিশ্বাস, নিয়ন্ত্রণ আর পরিস্থিতি বুঝে খেলার দারুণ ক্ষমতা। পাঁচ নম্বরে নেমে শুরু থেকেই সাবলীল ছিলেন তিনি। অন্য প্রান্তে জ্যোতিও ফিরে পান নিজের ছন্দ। দুজনের দৃঢ়তায় বাংলাদেশের স্কোর এগিয়ে যায়। ৮ রানে ৩ উইকেট হারানোর পর এই জুটিই হয়ে ওঠে দলের মূল ভরসা।
জ্যোতির সঙ্গে ব্যাটিংয়ের পরিকল্পনা নিয়ে সোবহানা বলেন, ‘আমি যখন ব্যাটিংয়ে যাই, জ্যোতি আমাকে বলেছিল উইকেটে টিকে থাকতে হবে এবং আমরা যেন ৪০ ওভার পর্যন্ত একসঙ্গে খেলতে পারি। এরপর নিজেদের পছন্দের শট খেলার সুযোগ আসবে। বাজে বল পেলে শাস্তি দিতে হবে, আর ভালো বলকে সম্মান করতে হবে। জ্যোতি সবসময় আমাকে বলেছে আমার সেঞ্চুরি করার সামর্থ্য আছে।’
সেই পরিকল্পনাতেই এগিয়ে যান সোবহানা। ৯টি চারে ৬৬ বলে ক্যারিয়ারের চতুর্থ ফিফটি পূর্ণ করেন তিনি। এরপর আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন ২৪ বছর বয়সি এই ব্যাটার। ফিফটি থেকে সেঞ্চুরিতে পৌঁছাতে খেলেন মাত্র ৫৭ বল। তার ব্যাটিংয়ে ভর করে বাংলাদেশের ইনিংস পায় লড়াই করার মতো ভিত। সেঞ্চুরির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে সোবহানার ব্যাটে যেন আরও ধার বাড়ে। অ্যানাবেল সাদারল্যান্ডের শর্ট ডেলিভারিতে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট দিয়ে দারুণ নিয়ন্ত্রিত শটে বাউন্ডারি মেরে ৯৫ থেকে ৯৯ রানে পৌঁছান তিনি। কাঙ্ক্ষিত মাইলফলক ছুঁতে অপেক্ষা করতে হয় আর মাত্র এক বল।
পরের বলেই একই জায়গায় খেলে এক রান নিয়ে তিন অঙ্কের ঘরে পৌঁছে যান সোবহানা। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটারের এটিই প্রথম সেঞ্চুরি। শুধু তাই নয়, এই ইনিংসেই দেশের নারী ওয়ানডে ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের রেকর্ড গড়েন তিনি। ব্রিজবেনে ১৩৪ বলে ১১৮ রান করেন সোবহানা। তার ইনিংসে ছিল ১৮টি চার। চরম চাপের মুখে শুরু হওয়া লড়াইকে তিনি রূপ দেন ব্যক্তিগত অর্জন ও দলীয় রেকর্ডে। এর আগে বাংলাদেশের নারী ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ ইনিংসের রেকর্ড ছিল ফারজানা হকের। ২০২৩ সালে ভারতের বিপক্ষে ১৬০ বলে ১০৭ রান করেছিলেন তিনি। তিন বছর পর সেই রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতায় পৌঁছালেন সোবহানা।
সব মিলিয়ে নারী ওয়ানডেতে বাংলাদেশের হয়ে এটি চতুর্থ সেঞ্চুরি। এর আগে তিন অঙ্কের দেখা পেয়েছিলেন শুধু ফারজানা হক, দুবার এবং নিগার সুলতানা।
ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি পেয়ে উচ্ছ্বসিত সোবহানা বলেন, ‘আমি খুবই খুশি। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেঞ্চুরি করতে পেরেছি। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এটি আমার প্রথম সেঞ্চুরি, তাও তাদের মাটিতে। সব মিলিয়ে আমি সত্যিই আনন্দিত।’
সোবহানার সেঞ্চুরির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজের ছন্দও ফিরে পান অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতি। দুজন মিলে চতুর্থ উইকেটে গড়েন ১৯৫ রানের বিশাল জুটি। ওয়ানডেতে যেকোনো উইকেটে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ জুটি এটি। একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে যেকোনো দলের সর্বোচ্চ জুটির রেকর্ডও গড়েছেন তারা।
সোবহানার ইনিংসের সমাপ্তি ঘটে মেগান শুটের ফুল টসে বোল্ড হয়ে। তার বিদায়ের সঙ্গে ভেঙে যায় বাংলাদেশের রেকর্ড গড়া জুটি। তবে ততক্ষণে নিজের নাম ইতিহাসের পাতায় তুলে ফেলেছেন এই তরুণ ব্যাটার।
সোবহানার ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি এবং বাংলাদেশের রেকর্ড গড়া জুটি শেষ পর্যন্ত জয়ের আনন্দ এনে দিতে পারেনি। তবু অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে এমন ইনিংস বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের জন্য বড় প্রাপ্তি।
দলের হার হয়তো স্কোরবোর্ডে লেখা থাকবে, কিন্তু সোবহানা মোস্তারির ১১৮ রানের ইনিংস, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম সেঞ্চুরি এবং জ্যোতির সঙ্গে গড়া ১৯৫ রানের জুটি দীর্ঘদিন মনে রাখার মতোই।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি