কৃষিজ বর্জ্যের একটি পরিচিত উপাদান ‘ধানের তুষ’—যা সহজে পচে না বা নষ্ট হয় না। এটি বর্তমানে এক মজবুত ও টেকসই নির্মাণসামগ্রী হিসেবে নতুন রূপ পাচ্ছে। ২০২৩ সালের কথা, ড্যানিয়েল ফাইন এক কঠিন সমস্যায় পড়েন। যুক্তরাষ্ট্রের ইউটার পার্ক সিটিতে একটি বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্প নতুন করে সাজানোর দায়িত্ব পান তিনি। কিন্তু ভবন নির্মাণের নির্দিষ্ট শর্তাবলি ও প্রয়োজনীয়তা মেনে কাজ করা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ে। বাড়ির মালিকদের সমিতি এমন একটি উপাদানের খোঁজে পুরো একটি বছর পার করে দেয়, যা একদিকে আর্দ্রতা বা পানি শুষে নেবে, অন্যদিকে গ্রীষ্মকালে পাহাড়ি এলাকাগুলোতে প্রায়ই ছড়িয়ে পড়া দাবানল প্রতিরোধে সক্ষম হবে। তারা এক্সট্রুডেড অ্যালুমিনিয়ামের মতো সামগ্রীর কথা ভেবেছিলেন—যা ভবনকে আগুন থেকে রক্ষা করলেও দেখতে কৃত্রিম মনে হয়। অন্যদিকে সিডার কাঠের মতো প্যানেলগুলো দেখতে দৃষ্টিনন্দন হলেও এর অগ্নিপ্রতিরোধ ক্ষমতা ছিল বেশ কম।
অবশেষে তারা এক অদ্ভুত সমাধানের পথ খুঁজে পান। চাল বা ধান চাষের উপজাত ‘ধানের তুষ’ দিয়ে তৈরি প্যানেল বোর্ড। ফাইন বলেন, তাদের মূল লক্ষ্য ছিল কাঠের মতো দেখতে সুন্দর এমন কিছু খুঁজে পাওয়া, যার অগ্নিনিরোধক ক্ষমতা প্রথাগত কাঠের প্যানেলের চেয়ে কিছুটা ভালো হবে। পরে দেখা গেল, ধানের তুষের তৈরি প্যানেলগুলো তাদের সব শর্তই হুবহু পূরণ করেছে। পূর্বে কেবল বর্জ্য এবং পরিবেশের জন্য দূষক হিসেবে বিবেচিত ধানের তুষ এখন এক বহুমুখী ও টেকসই নির্মাণসামগ্রী হিসেবে নজর কাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে শত শত নতুন বাড়ি তৈরিতে ধানের তুষের তৈরি প্যানেল ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ছাড়া বারান্দার মেঝের তক্তা থেকে শুরু করে শিশুদের খেলার মাঠের নানা সামগ্রী তৈরিতে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু প্রথাগত উপাদানের পরিবর্তে আবাসন নির্মাতারা কেন এই কৃষিজ বর্জ্যকে বেছে নিচ্ছেন?
ধানের তুষ দিয়ে তৈরি ঘরবাড়ি: মাঠে শস্য বর্ধনশীল অবস্থায় ধানের তুষ চালের দানাকে আর্দ্রতা এবং পোকামাকড়ের হাত থেকে রক্ষা করে। কিন্তু ফসল কাটার পর এই তুষই সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও ঝামেলাপূর্ণ কৃষিজ বর্জ্যে পরিণত হয়। বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর প্রায় ১৫ কোটি টন (৩৩১ বিলিয়ন পাউন্ড) ধানের তুষ উৎপাদিত হয়, যার একটি বড় অংশই ক্ষেতে বা রাস্তার পাশে পুড়িয়ে ফেলা হয়—যা মানবস্বাস্থ্য এবং পরিবেশ উভয়ের জন্যই হুমকিস্বরূপ। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর প্রায় ৯০ লাখ টন (২০ বিলিয়ন পাউন্ড) ধান উৎপাদিত হয়।
সেখানে তুষকে কখনো কখনো বায়োমাস শক্তিতে রূপান্তরিত করা হয়, যদিও এরপর যে ছাই অবশিষ্ট থাকে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যবহার থাকে না। তবে এই কৃষিজ বর্জ্যকে ভবিষ্যতের জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই নির্মাণসামগ্রী হিসেবে নতুন করে কাজে লাগানো হচ্ছে। প্যানেলিং ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীতে ধানের তুষের ব্যবহারের পাশাপাশি বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ধানের তুষের ছাই সিমেন্টের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে—যা বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণের ৮ শতাংশের জন্য দায়ী। ক্রিস্টোফার গিমন্ড প্রথম ধানের এই উপজাতগুলো সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠেন, যখন তিনি জানতে পারেন যে যুক্তরাষ্ট্রের ধান উৎপাদনকারীরা এই বর্জ্য মাটির নিচে পচতে দেন, যা থেকে শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস মিথেনের দূষণকারী মেঘ তৈরি হয়।
প্রকৌশলের ছাত্র গিমন্ড তখন বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে বৃহৎ পরিসরে গৃহনির্মাণে ধানের তুষ একটি চমৎকার উপাদান হতে পারে। তিনি বলেন, মূল আকর্ষণ ছিল ফেলনা হিসেবে পরিচিত এই জিনিসটিকে বেছে নেওয়া এবং এর গুণাবলিকে কাজে লাগানো। গিমন্ড এখন ‘মডার্ন মিল’-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কোনো কোম্পানি হিসেবে বৃহৎ পরিসরে ধানের তুষ থেকে নির্মাণসামগ্রী তৈরি করছে। ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে কোম্পানিটি জানিয়েছে যে তারা ড্যানিয়েল ফাইনের স্কি কন্ডোর প্যানেলিংসহ প্রায় ৯০ লাখ কেজি (২ কোটি ৫ লাখ পাউন্ড) ধানের তুষকে ময়লার ভাগাড়ে ফেলা থেকে রক্ষা করেছে। বিশ্বের অন্যান্য স্থানেও জার্মানির ‘রেসিস্টা’ এবং ইতালির ডিজাইন ফার্ম রাইসহাউসসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান ধানের তুষ থেকে বারান্দার মেঝের তক্তা (ডেকিং) থেকে শুরু করে রং পর্যন্ত নানা ধরনের নির্মাণসামগ্রী তৈরি ও ব্যবহার করছে। ‘মডার্ন মিল’ এমনকি শিশুদের খেলার মাঠের উপকরণ তৈরিতেও এটি ব্যবহার করছে।
ধানের তুষ বাতাস ও বৃষ্টি থেকে চালের মূল্যবান দানাকে রক্ষা করে। এর ভেতরে থাকা উচ্চমাত্রার সিলিকা আর্দ্রতা ও পচন প্রতিরোধে সাহায্য করে—যার অর্থ হলো ঐতিহ্যবাহী বহু নির্মাণসামগ্রীর মতোই প্রাকৃতিক গুণাবলি এতে বিদ্যমান। গিমন্ড বলেন, ধানের তুষের পুরো কাজটাই হলো বাড়ন্ত ধানকে রক্ষা করা। আর্দ্রতা, পোকামাকড়, পচন—এই সবকিছুর হাত থেকে রক্ষা করে। ফাইনের মতে, আর্দ্রতা থেকে রক্ষার পাশাপাশি সিলিকার উচ্চমাত্রার কারণে ধানের তুষ আগুনের বিরুদ্ধেও অবিশ্বাস্য রকমের সহনশীল। মডার্ন মিলের তৈরি পণ্য ‘ওয়াইল্ডল্যান্ড আরবান ইন্টারফেস’ অনুসৃত হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। যার অর্থ, এটি ক্যালিফোর্নিয়ার কঠোর অগ্নিসুরক্ষা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে।
ধানের তুষের নানা উপকারিতা: কাঠ দীর্ঘকাল ধরেই এক টেকসই নির্মাণসামগ্রী হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। মহাদেশীয় জলবায়ুর অঞ্চলগুলোতে এটি প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায় এবং কংক্রিট বা ইস্পাতের মতো উপাদানের তুলনায় এতে কার্বন নিঃসরণের মাত্রাও তুলনামূলকভাবে কম। তবে প্রথাগত কাঠেরও কিছু পরিবেশগত ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যেমন বাজারদরের আকস্মিক ওঠানামা, প্রাচীন বনাঞ্চলের দ্রুত অবক্ষয় এবং সেসব বনের জমা রাখা ও শুষে নেওয়া কার্বন বায়ুমণ্ডলে মুক্ত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি। অবশ্য বিকল্প গৃহনির্মাণসামগ্রী হিসেবে কেবল চাল বা ধানের তুষই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে না; বৈশ্বিক দক্ষিণে (গ্লোবাল সাউথ) কংক্রিট ও অপেক্ষাকৃত ব্যয়বহুল, ধীরে বেড়ে ওঠা ট্রপিক্যাল শক্ত কাঠের বিকল্প হিসেবে বাঁশের ব্যবহার উত্তরোত্তর বাড়ছে। তবে সর্বত্র সহজলভ্যতা ও কম খরচের পাশাপাশি এটি একটি ফেলনা বর্জ্য হওয়ায় ধানের তুষের একটি বিশেষ সুবিধা রয়েছে।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ধান, গম ও ভুট্টার মতো শস্যের আঁশযুক্ত বর্জ্য পুড়িয়ে না ফেলে ভবনে ব্যবহার করা হলে তা এক বিশাল ‘কার্বন সিঙ্ক’ (কার্বন জমানোর ক্ষেত্র) তৈরি করতে পারে। কারণ এসব বর্জ্যে আটকে থাকা কার্বন বহু দশক ধরে বাইরে আসতে পারবে না। তবে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ডেভিসের সিভিল ও এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক এবং টেকসই নির্মাণসামগ্রী বিশেষজ্ঞ সাবি মিলার সতর্ক করে বলেন, কোনো নির্দিষ্ট গৃহনির্মাণ উপাদান সত্যিই কম কার্বন নিঃসরণকারী কি না, তা নির্ভর করে অনেক সূক্ষ্ম বিষয়ের ওপর এবং এর জন্য বিস্তারিত জীবনচক্র মূল্যায়নের (লাইফ সাইকেল অ্যাসেসমেন্ট) প্রয়োজন হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ (থার্মাল) ও শব্দদূষণ প্রতিরোধের (অ্যাকোস্টিক) ক্ষেত্রে ধানের তুষের তৈরি প্যানেলগুলো প্রথাগত সামগ্রীর মতোই নিখুঁতভাবে কাজ করে। উদাহরণস্বরূপ, ইতালিতে রাইসহাউসের তৈরি সাম্প্রতিক প্রকল্প ‘কাসা এলএইচ’-এর শব্দ নিয়ন্ত্রণ ও তাপমাত্রা ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়াতে তুষের প্যানেল ব্যবহার করা হয়েছে। পুরোনো একটি অবকাঠামোর জায়গায় নির্মিত এই বাড়িটিতে দক্ষিণে মুখ করা বড় বড় জানালা ও একটি খোলা রান্নাঘর রয়েছে, যা ঘরে প্রচুর সূর্যালোক ও বাতাস আনার পাশাপাশি ঋতুভিত্তিক উত্তাপ ও শব্দের প্রতিধ্বনিও তৈরি করে।
রাইসহাউসের যোগাযোগ কর্মকর্তা ভ্যালেন্টিনা সাভিওলি বলেন, আমাদের ঘরটিকে বাড়তি ইনসুলেট (তাপ নিরোধক) করার এবং শব্দের আরামদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করার উপায় খুঁজে বের করতে হয়েছিল। ইনসুলেশনের জন্য ধানের তুষকে বেছে নেওয়া ছিল একেবারেই সহজ সিদ্ধান্ত, কারণ এটিতে প্রচুর পরিমাণে উপাদান ও বায়োমাস রয়েছে।
তবে সাভিওলি জানান, ইতালীয় ঠিকাদাররা সাধারণত কম প্রচলিত বা অপ্রচলিত নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারে কিছুটা কুণ্ঠাবোধ করেন। যার ফলে এর ব্যাপক প্রসার পাওয়া কিছুটা কঠিন হতে পারে। অধ্যাপক মিলারের মতে, যুক্তরাষ্ট্রেও একই ধরনের উদ্বেগ এবং খরচের মতো কিছু বাধা রয়েছে। তিনি বলেন, বিকল্প উপকরণের ব্যবহারে কিছুটা ইতস্তত ভাব থেকে যায়; কারণ ধরুন, কোনো উপাদান যদি ব্যর্থ হয়, তবে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী তাঁর লাইসেন্স বা ভবিষ্যতে কাজ পাওয়ার সক্ষমতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েন।
তবে অধ্যাপক মিলার আরও জানান, ভার বহন না করা ধানের তুষের তৈরি পণ্যগুলো (যেমন মডার্ন মিলের প্যানেল) ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাধা তুলনামূলক কম। কারণ কাঠামোগত ভার বহনকারী পণ্যে অপ্রচলিত উপাদান ব্যবহারে বাধা অনেক বেশি থাকে। একটি প্রধান বিম বা কড়িকাঠের জন্য নতুন উপাদান বেছে নেওয়ার চেয়ে নতুন মেঝের টাইলসের উপাদান গ্রহণ করা বহুলাংশে সহজ।
সিমেন্টের বিকল্প: অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে ইতিমধ্যেই মাটির ব্লক (মাটি, পানি ও রাসায়নিক সংমিশ্রণে তৈরি) বা হেম্পের মতো বিকল্প কাঠামোগত উপাদান ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। গবেষকেরা সিমেন্টের বিকল্প হিসেবে ধানের তুষের ছাই ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা করেছেন—তা সিমেন্টের মিশ্রণে যোগ করেই হোক কিংবা সিমেন্টকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করেই হোক; বিশেষ করে মাটির ব্লকে বাইন্ডার বা বাঁধাইকারী উপাদান হিসেবে। এটি নির্মাণকাজে প্রয়োজনীয় সিমেন্টের পরিমাণ কমিয়ে আনবে, যা কার্বন নিঃসরণ ও উপাদানের খরচ কমানোর পাশাপাশি ধানের তুষকে কাঠামোগত নির্মাণের অংশ হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করবে।
২০২৫ সালের একটি গবেষণায় ধানের তুষের ছাই, কাঠের ছাই এবং ধানের খড় একত্রিত করে একটি সাশ্রয়ী ও কার্বন-নেগেটিভ (পরিবেশ থেকে কার্বন শুষে নেয় এমন) উপাদান তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে, যা সিমেন্টের প্রয়োজনীয়তাই সম্পূর্ণ দূর করতে পারে। এ ধরনের ধানের তুষভিত্তিক উপাদান উদ্ভাবন ও বিকাশ করা গেলে, তা বিশ্বের দক্ষিণের দেশগুলোর জন্য বিশেষভাবে কার্যকর হবে—যেখানে অধিকাংশ ধানের বর্জ্য পুড়িয়ে ফেলা হয়।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ