ইয়েমেন-সৌদি জোটের বিধ্বংসী হামলার মুখেও অপ্রতিরোধ্য হুথি বিদ্রোহীরা। ইরানসমর্থিত এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ভয়ে প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে সৌদি আরব। রাজধানী রিয়াদের স্কুলগুলোতে অনলাইনে পাঠদান চালু করা হয়েছে। হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবজুড়ে নতুন করে বিমান হামলার হুমকি দেওয়ার পর রোববার এ পদক্ষেপ নেয় দেশটির কর্তৃপক্ষ। এর আগে হুথিদের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১২ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হন।
শনিবার (১০ অক্টোবর) রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এ হামলার ঘটনা ইয়েমেনের ইরানসমর্থিত হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের চলমান যুদ্ধে বড় ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধের ক্ষীণ প্রচেষ্টাও আরও জটিল হয়ে পড়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রও যোগ দেবে কি না, তা বিবেচনা করছেন তিনি। এমন পরিস্থিতিতে হুথিরা গুরুত্বপূর্ণ বাবেল মান্দেব নৌপথে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিতে পারে, যা পারস্য উপসাগর থেকে তেল সরবরাহ আরও সীমিত করার আশঙ্কা তৈরি করবে।
রোববার হুথিরা জানিয়েছে, ইয়েমেনের রাজধানী সানায় দুটি বিমান হামলা হয়েছে। এ জন্য তারা সৌদি আরবকে দায়ী করেছে। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। হামলায় হতাহতের খবরও পাওয়া যায়নি। হুথিদের নিয়ন্ত্রণাধীন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি, গত পাঁচ সপ্তাহে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের হামলায় ইয়েমেনে ৯১ জন নিহত এবং ১৬৮ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের ৬০ শতাংশ নারী ও শিশু বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়টি।
সৌদি কর্তৃপক্ষ রোববার জানিয়েছে, রাজধানীর স্কুলগুলোতে সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত অনলাইনে ক্লাস চলবে। এদিকে ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের চলমান বন্ধের মেয়াদ রোববার রাত ৯টা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। শনিবারের হামলার দায় হুথিরা তাৎক্ষণিকভাবে স্বীকার না করলেও অতীতে সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় হামলার কথা স্বীকার করেছে তারা।
হুথি বিদ্রোহীদের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারি সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও আকাশসীমা ব্যবহার না করতে সব বিমান সংস্থা, বিশেষজ্ঞ, কর্মী, শ্রমিক ও যাত্রীদের সতর্ক করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, ‘সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও আকাশসীমা ব্যবহার না করার জন্য সব বিমান সংস্থা, বিশেষজ্ঞ, কর্মী, শ্রমিক ও যাত্রীদের সতর্ক করা হচ্ছে। এগুলো হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে এবং আমাদের বাহিনীর অভিযানের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।’ তবে পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনার বিমানবন্দর এ সতর্কতার আওতামুক্ত বলে জানান তিনি।
আঞ্চলিক এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিমানবন্দরের যে কমপ্লেক্সে হামলা হয়েছে, সেখানে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত ৩ ও ৪ নম্বর টার্মিনাল রয়েছে। গণমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি এ তথ্য জানান। সৌদি কর্তৃপক্ষের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নিহতদের মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক, দুজন বাংলাদেশি, একজন ফিলিস্তিনি, একজন মার্কিন নাগরিক, একজন মিসরীয়, একজন জর্ডানীয়, একজন সিরীয় ও একজন সুদানি নাগরিক রয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের কয়েকটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
মিসরীয় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্য অনুযায়ী, নিহত মিসরীয় নারী আজ্জা রামজি ছিলেন ২৮ বছর বয়সি একজন ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট। তিনি সৌদি বিমান সংস্থা ফ্লাইনাসে কর্মরত ছিলেন। নিহত সিরীয় নারী চার সন্তানের জননী ও বিধবা ছিলেন।
পাঁচ বছর ধরে তিনি সৌদি আরবে বসবাস করছিলেন বলে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) জানিয়েছেন তার এক আত্মীয়। রিয়াদে অবস্থিত সিরীয় দূতাবাস তার নাম জানিয়েছে বুসাইনা আহমাদ ওবেইদা। তার ভাইঝি নিসরিন ওবেইদা জানান, বুসাইনার বয়স ছিল ৫৬ বছর। তিনি সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় ইদলিব প্রদেশের বাসিন্দা ছিলেন। দেশটির গৃহযুদ্ধের সময় তিনি সিরিয়া ছেড়ে চলে যান। তিনি মক্কায় বসবাস করতেন। রিয়াদে বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে সেখান থেকে ফেরার পথে বিমানবন্দরে হামলায় নিহত হন তিনি।
হুথিদের বিরুদ্ধে হামলার কথা ভাবছেন ট্রাম্প : বিমানবন্দরে হামলার পর সৌদি আরব তার মিত্র দেশগুলোর ওপর সামরিক সহায়তা দেওয়ার চাপ আরও বাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হামলার কিছুক্ষণ পর ট্রাম্প বলেন, হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র যোগ দেবে কি না, তা মূল্যায়ন করছেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, আমরা বিষয়টি বিবেচনা করব। আমরা এইমাত্র সর্বশেষ হামলার খবর পেয়েছি। তাই সিদ্ধান্ত নেব। আমরা খুব দ্রুত পদক্ষেপ নিই।
শনিবার ট্রাম্প জানান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে কথা বলার পরিকল্পনা রয়েছে তার। যুক্তরাষ্ট্র এ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা দেখব। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হামলায় অংশ নিলে একটি অজনপ্রিয় আঞ্চলিক যুদ্ধে দেশটির সম্পৃক্ততা আরও বাড়বে। এ যুদ্ধ আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করেছে। তবে ট্রাম্প ও ইরান— উভয় পক্ষই বলেছে, সাত মাস ধরে চলা সংঘাত কীভাবে শেষ করা হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে মার্কিন নির্বাচনের সময়সূচি কোনো প্রভাব ফেলছে না।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার দায় স্বীকার করেছিল হুথিরা। ওই হামলায় একজন পাইলটসহ তিন সৌদি নাগরিক নিহত হন। বিমানবন্দরটিতে কোনো সামরিক স্থাপনা নেই। সৌদি আরবের অন্যান্য বিমানবন্দর, সামরিক স্থাপনা ও তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা বেড়েছে। এর এক সপ্তাহ আগে হুথিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট।
হুথিদের ব্যবহার করতে পারে ইরান : সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে সর্বশেষ সংঘাত এমন সময়ে তীব্র হয়েছে, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে চলমান আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে অনেকটা আড়ালে ছিল হুথিরা। কিন্তু এখন তারা যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র সৌদি আরবের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ইরানকে সহায়তা করছে। হুথিদের হামলার পাশাপাশি বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণও এ অঞ্চল থেকে তেল সরবরাহে নতুন বিঘ্ন সৃষ্টির আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।
২০১৫ সালে সৌদি আরব ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিতে হস্তক্ষেপ করলে দেশটির সঙ্গে হুথিদের সংঘাত শুরু হয়। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতির পর দুই পক্ষের মধ্যে আপেক্ষিক শান্তি বজায় ছিল। তবে গত জুলাইয়ে তা ভেঙে পড়ে। হুথিদের দাবি, ইরান থেকে আসা একটি বিমান সানার বিমানবন্দরে অবতরণের চেষ্টা করার সময় সৌদি বাহিনী গুলি চালায়। এরপর হুথিদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে রাখা সৌদি নেতৃত্বাধীন অবরোধ নিয়ে নতুন করে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
বর্তমানে সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। লোহিত সাগর উপকূলে হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি ঠেকাতে চেষ্টা চালানো ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীকে আকাশপথে সহায়তা দিচ্ছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। হুথিদের এই অগ্রগতির ফলে বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর নজরদারির সক্ষমতা বেড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি হরমুজ প্রণালির বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। হরমুজ প্রণালিতে ইরান জাহাজে হামলা চালিয়ে আসছে।
গত মাসে আঞ্চলিক কর্মকর্তারা এপিকে জানিয়েছিলেন, সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ কমে আসছে। এ কারণে দেশটি ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান ও মিসরের কাছে ওই অঞ্চলে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েনের সহায়তা চেয়েছে। এক কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদও কমে এসেছে।
তবে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইয়েমেনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগি মনে করেন, হুথিদের চাপ সৃষ্টির কৌশল উল্টো ফল দিতে পারে। তিনি বলেন, ‘রিয়াদকে অভিযান থেকে সরে আসতে বাধ্য করার পরিবর্তে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলা দেশটিকে সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে তুলতে পারে।’
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে