বিভেদের আঁধারে ঐক্যের আলো

মুফতী সাইফুল্লাহ আজহারী

ইসলাম

মানব সভ্যতার ইতিহাসে মতপার্থক্য নতুন কোনো বিষয় নয়। মানুষের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও চিন্তা পদ্ধতির ভিন্নতার কারণে মতের পার্থক্য থাকবে এটাই

2026-10-13T13:00:52+00:00
2026-10-13T13:00:52+00:00
 
  মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬,
২৮ আশ্বিন ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
ইসলাম
বিভেদের আঁধারে ঐক্যের আলো
মুফতী সাইফুল্লাহ আজহারী
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১:০০ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
মানব সভ্যতার ইতিহাসে মতপার্থক্য নতুন কোনো বিষয় নয়। মানুষের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও চিন্তা পদ্ধতির ভিন্নতার কারণে মতের পার্থক্য থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মতপার্থক্য যখন যুক্তি ও প্রজ্ঞার সীমা অতিক্রম করে বিদ্বেষ, অপবাদ ও ব্যক্তিগত আক্রমণে রূপ নেয়, তখন তা সমাজের শান্তি ও পারস্পরিক সম্প্রীতিকে দুর্বল করে। বিশেষত মুসলিম সমাজে ধর্মীয় পরিচয়ের আড়ালে বিভেদ ও অসহিষ্ণুতা ছড়িয়ে পড়া উম্মাহর নৈতিক শক্তির জন্য উদ্বেগজনক। 

ইসলাম সত্য অনুসন্ধান, ন্যায়বিচার ও উত্তম আচরণের শিক্ষা দেয়। অথচ আজ অনেক ক্ষেত্রে যুক্তির পরিবর্তে আবেগ, জ্ঞানচর্চার পরিবর্তে ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং সত্য অনুসন্ধানের পরিবর্তে গোষ্ঠীগত আনুগত্য প্রাধান্য পাচ্ছে। কারও বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত হলেই তাকে অপমান করা কিংবা একটি বিচ্ছিন্ন বক্তব্যের কারণে তার সামগ্রিক অবদান অস্বীকার করা সুস্থ চিন্তার পরিচায়ক নয়।

কুরআনের আহ্বান— বিভাজন নয়, ঐক্য : আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না (সুরা আলে ইমরান : ১০৩)’। এ নির্দেশ মুসলিমদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব, নৈতিক ঐক্য ও সম্মিলিত কল্যাণের ভিত্তিতে জীবন গড়ার আহ্বান জানায়। তবে ঐক্যের অর্থ সত্য-মিথ্যা কিংবা ন্যায়-অন্যায়কে এক করে দেওয়া নয়। ভুলের সংশোধন ও অন্যায়ের প্রতিবাদ অবশ্যই করতে হবে কিন্তু পদ্ধতি হতে হবে দলিলনির্ভর, প্রজ্ঞাপূর্ণ ও শালীন। সত্য প্রতিষ্ঠার নামে ন্যায় ও শিষ্টাচার বিসর্জন দেওয়া যায় না।

মতপার্থক্য জ্ঞানের, বিদ্বেষ অবক্ষয়ের : ইসলামের ইতিহাসে পূর্বসূরি মনীষী আলেমদের মধ্যেও মতভেদ ছিল; তবে তা বিদ্বেষ নয়, বরং জ্ঞানের মতপার্থক্য ছিল। ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফিঈ ও ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (রহ.)-এর ফিকহি ঐতিহ্য মুসলিম জ্ঞানভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। তাদের মধ্যে বহু মাসআলায় মতপার্থক্য ছিল কিন্তু সেই পার্থক্যকে ব্যক্তিগত শত্রুতায় রূপ দেওয়া জ্ঞানচর্চার উদ্দেশ্য নয়। বর্তমানে দেওবন্দি, আহলে হাদিস, বেরলভি কিংবা অন্যান্য ইসলামি ধারার অনুসারীদের মধ্যেও বিভিন্ন বিষয়ে মতভেদ থাকতে পারে। কোনো মতের সমালোচনা করা আর সেই মতের অনুসারীদের হেয় করা এক বিষয় নয়। যুক্তিনির্ভর সমালোচনায় বক্তব্য ও দলিল মূল্যায়ন করা হয়; বিদ্বেষমূলক সমালোচনায় ব্যক্তির মর্যাদা ক্ষুণ্ন করাই মুখ্য হয়ে ওঠে। প্রকৃত জ্ঞানীর পরিচয় শুধু পাণ্ডিত্যে নয়; ভিন্নমতকে ন্যায্যভাবে মূল্যায়ন, নিজের ভুল সংশোধন এবং সত্য প্রকাশে সংযম বজায় রাখার মধ্যেও তা প্রকাশ পায়।

ডিজিটাল যুগে বিভ্রান্তির চ্যালেঞ্জ : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জ্ঞান ও দাওয়াহর ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে যাচাইহীন সংবাদ, সম্পাদিত ভিডিও, ভুয়া উদ্ধৃতি ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচার ছড়ানোর পথও সহজ হয়েছে। প্রেক্ষাপটবিচ্ছিন্ন একটি বক্তব্য মুহূর্তেই মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে। মানুষের পূর্বধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য সহজে গ্রহণ করার প্রবণতাকে মনোবিজ্ঞানে নিশ্চিতকরণ— পক্ষপাত বলা হয়। এ প্রবণতা সত্য অনুসন্ধানকে বাধাগ্রস্ত করে। কুরআনের নির্দেশ, ‘তোমরা যাচাই করে নাও (সুরা হুজুরাত : ৬)’। তাই কোনো সংবাদ বা বক্তব্য প্রচারের আগে মূল উৎস, পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট ও তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা নৈতিক দায়িত্ব। যাচাইহীন অভিযোগ অন্যের সম্মান ও অধিকার ক্ষুণ্ন করতে পারে।

বিজ্ঞানমনস্কতা ও ন্যায়বিচার : বিজ্ঞানমনস্কতা মানে ধর্মীয় বিশ্বাসকে অস্বীকার করা নয় বরং প্রমাণ, যৌক্তিক বিশ্লেষণ এবং ভুল হলে ধারণা সংশোধনের মানসিকতাকে গুরুত্ব দেওয়া। ইসলামি বিধান বোঝার ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহ ও স্বীকৃত জ্ঞানপদ্ধতি অনুসরণ জরুরি; আর সামাজিক বাস্তবতা বিশ্লেষণে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও গবেষণার মূল্যায়ন প্রয়োজন। কোনো বক্তব্যের জবাব না দিয়ে বক্তার চরিত্রে আঘাত করা যুক্তিগত দুর্বলতা। নিজের গোষ্ঠীর ভুল আড়াল করে প্রতিপক্ষের ভুলকে অতিরঞ্জিত করাও দ্বৈত মানদণ্ড। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা ন্যায়বিচার করো; এটিই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী (সুরা আল-মায়িদা, ৫:৮)’। অতএব মতবিরোধের সময়ও ন্যায়ের মানদণ্ড অটুট রাখতে হবে।

ঐক্য প্রতিষ্ঠায় করণীয় : মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব আলেম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষ সবার। আলেমদের উচিত দলিলনির্ভর আলোচনা ও মতপার্থক্যের শিষ্টাচার জোরদার করা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভিন্নমত বোঝার যোগ্যতা গড়ে তুলতে হবে। গণমাধ্যমকে তথ্য যাচাইয়ে সতর্ক হতে হবে, আর সাধারণ মানুষকে গুজব, অপবাদ ও অশালীন মন্তব্য থেকে বিরত থাকতে হবে। ফিকহি মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও শিক্ষা, দরিদ্রসেবা, দুর্যোগ মোকাবিলা ও মানবিক সহায়তার মতো কাজে সম্মিলিতভাবে কাজ করা সম্ভব। পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতাই বিভেদের দেয়াল ভেঙে সম্প্রীতির সেতু নির্মাণ করতে পারে।

মুসলিম উম্মাহর প্রকৃত শক্তি প্রতিপক্ষকে অপমান করার দক্ষতায় নয়, সত্য ও ন্যায়ের প্রতি অবিচলতায়। মতপার্থক্য সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই। প্রয়োজন মতভেদকে জ্ঞানচর্চার শক্তিতে রূপান্তর করা এবং বিদ্বেষকে সংলাপ ও সহযোগিতার মাধ্যমে প্রতিহত করা। আসুন, বিভেদের তিমিরে ঐক্যের আলোকশিখা প্রজ্বলিত করি। মতের পার্থক্য থাকুক, বিদ্বেষ নয়; যুক্তির দৃঢ়তা থাকুক, অশালীনতা নয়; অন্যায়ের প্রতিবাদ থাকুক, প্রমাণহীন অপবাদ নয়। জ্ঞান, ন্যায় ও মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে গড়ে উঠুক ঐক্যবদ্ধ মুসলিম সমাজ।

লেখক : পরিচালক, জামিয়া ইসলামিয়া ফারুক্বিয়া, ঢাকা উদ্যান, মোহাম্মদপুর

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও
  বিষয়:   বিভেদ  আঁধার  ঐক্যের আলো  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: