গ্রাফিক : সময়ের আলো২৩ অক্টোবর বাংলাদেশের বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক চাষী নজরুল ইসলামের জন্মদিন। সবার কাছে তিনি চাষী নজরুল ইসলাম কিন্তু চলচ্চিত্রের সবাই তাকে বলতেন চাষী ভাই। আমাদের সবার প্রিয় চাষী ভাই। চাষী ভাই আপনাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা।
জানি না ইহলোক থেকে পাঠানো শুভেচ্ছা পরলোকে পৌঁছায় কি না, তবু যতদিন আমরা বেঁচে আছি, ততদিন আকাশের ঠিকানায় চিঠি লেখার মতো শুভেচ্ছাবাণী পাঠিয়েই যাব, আর ভালো থাকুক আপনার রেখে যাওয়া স্বজনরা এবং ভালোবাসার মানুষগুলো।
কাজ না থাকলেও আমরা প্রায়শই বিএফডিসিতে যাই। পরিচালক সমিতির ভেতরে তিনটে কক্ষ। সেখানে অন্তত জনাপঞ্চাশেক লোক বসতে পারে। আর সমিতির বারান্দাটা তো খুবই সুন্দর এবং শৈল্পিক। সেখানে দুই পাশে অন্তত ২০-২২ জন লোক বসে আড্ডা মারতে পারে। আমাদের মূল আড্ডাটা বারান্দাতেই জমে। আমার সেখানে আড্ডায় মশগুল, আর এ সময়ে বজ্রকণ্ঠে ভেসে এলো ‘এই কী করছিস তোরা দলবেঁধে’?
কণ্ঠটি ঝমঝম করত। আদর আর ধমকের মিশ্র সুর থাকত কণ্ঠে। আমরা অনুজ যারা, দাঁড়িয়ে পড়তাম। আমাদের সবচেয়ে ডানপিটে ছেলেটি প্রবেশ করছে পরিচালক সমিতিতে। আমাদের সবার প্রিয় চাষী ভাই, চাষী নজরুল ইসলাম। আমরা সালাম দিয়ে তাকে আমাদের সঙ্গে বসার জন্য চেয়ার ছেড়ে দিতাম। কিছুক্ষণ আড্ডা দিতেন তারপর উঠে যেতেন মূল কক্ষের দিকে। সাধারণত যেখানে অগ্রজরা আড্ডা দেন।
কখনো হয়তো কোন ফ্লোরে শুটিং করছি, নানা ঝামেলা নিয়ে গলদঘর্ম। হঠাৎ বাইরে থেকে একটি উচ্চকণ্ঠ ভেসে এলো, ‘এই— কে শুটিং করছে, কীসের শুটিং হচ্ছে?’ কণ্ঠ শুনেই আমরা সবাই বুঝতে পারতাম আমাদের চাষীয় ভাই। ভেতরে প্রবেশ করেই হাসিমুখে বলতেন, ‘ও! তোর শুটিং তা হলে তো কিছুক্ষণ আড্ডা মারতেই হয়।’ আমরা বলতাম, ‘আড্ডা তো অবশ্যই মারবেন আর লাঞ্চ না করে যেতে পারবেন না।’ চাষী ভাই হাসতেন তারপর শিল্পী-কুশলীদের সঙ্গে আড্ডায় বসে যেতেন। চাষী ভাইকে আমি ডানপিটে ছেলে বলেছি, কারণ তার চলার গতি ছিল দুরন্ত। বয়সে আমাদের চেয়ে অনেক বড় ছিলেন চাষী ভাই, অথচ তার সঙ্গে আমরা হয়ে পারতাম না। চলা, বলা এবং কাজকর্ম, সবক্ষেত্রেই চাষী ভাই ছিলেন ভীষণ গতিশীল। একেবারে তরতাজা যুবকের মতো। আর এই জন্য আমি চাষী ভাইকে আমি সবসময় বলতাম ‘The youngest man of the industry’. দেখা হলেই আমি এই সম্বোধন করতাম। চাষী ভাইও খুব এনজয় করতেন। তিনি চিরতরে চলে গেছেন, সশরীরে তিনি আর ফিরবেন না। কিন্তু তাকে ভুলে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিনিও এমন সব কর্ম রেখে গেছেন যে, তাকেও ভুলে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
চাষী ভাইয়ের প্রথম সিনেমা ওরা ১১ জন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মিত প্রথম সিনেমাও এটি। এই চলচ্চিত্রটি নিয়ে বিকল্প ধারার চলচ্চিত্রের কারও কারও মুখে বিরূপ কথাবার্তা শুনেছি। চলচ্চিত্রের মান নিয়ে যে যাই বলুন না কেন, সমালোচকরা যে সমালোচকই করুন না কেন, যদি প্রশ্ন করা হয় যে, মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র কোনটি তা হলে বলতে হবে চাষী নজরুল ইসলামের ওরা ১১ জন। এটি ইতিহাস আর ইতিহাসকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। চাষী ভাই নিজেও মুক্তিযুদ্ধ করেছেন যে কারণে মুক্তিযুদ্ধের ওপর ছিল তারা অগাধ ভালোবাসা। তাই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তিনি আরও নির্মাণ করেছেন ‘সংগ্রাম’, সেলিনা হোসেনের উপন্যাস নিয়ে নির্মাণ করেছেন ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার ওপর প্রামাণ্য চিত্র ‘কামালপুরের যুদ্ধ’। রাবেয়া খাতুনের উপন্যাস নিয়ে বানিয়েছেন ‘মেঘের পরে মেঘ’, ‘ধ্রুবতারা’।
বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন চাষী ভাই, কিন্তু সাহিত্যের প্রতি ছিল তার অসীম দুর্বলতা। তাই যখনই সুযোগ পেয়েছেন, তখনই ছুটে গেছেন সাহিত্যের দুয়ারে। শরৎচন্দ্রের কালজয়ী উপন্যাস নিয়ে নির্মাণ করেছেন ‘দেবদাস’, ‘চন্দ্রনাথ’, ‘শুভদা’। বঙ্কিমের বিষবৃক্ষ নিয়ে বানিয়েছেন ‘বিরহ ব্যথা’, রবীন্দ্রনাথের লেখা নিয়ে বানিয়েছেন ‘শাস্তি’ এবং ‘শুভা’। তার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ছবিগুলোর বেশিরভাগই সাহিত্যনির্ভর। সাহিত্য নিয়ে বাংলাদেশের আর কোনো চলচ্চিত্রকার এত চলচ্চিত্র নির্মাণ করেননি। ভবিষ্যতেও কেউ করবেন কি না সন্দেহ। চাষী ভাই তার কাজের স্বীকৃতিও পেয়েছেন। বহু সংগঠনের পুরস্কারসহ শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে একাধিকবার পেয়েছেন জাতীয় পুরস্কার, পেয়েছেন একুশে পদক।
শুধু চলচ্চিত্র নির্মাণের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি চাষী ভাই। চলচ্চিত্রের দরদী সংগঠন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির হাল ধরেছেন বহুবার। পরপর এই সংগঠনের সভাপতি হয়েছেন এবং চলচ্চিত্রের নানা সংকটে সরব থেকেছেন চলচ্চিত্রের ভেতর, বাইরে। চলচ্চিত্রের মঙ্গলের দাবি নিয়ে নেমেছেন রাজপথে এবং দেনদরবার করেছেন সরকারের উচ্চতর মহলে।
চাষী ভাইকে নিয়ে ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ করলে শেষ হবে না। শুধু একটা স্মৃতির কথা দিয়েই শেষ করব। চ্যানেল নাইনে একটা অনুষ্ঠান হতো প্রখ্যাত সাংবাদিক সৈকত সালাউদ্দিনের উপস্থাপনায়। একটি অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন চাষী ভাই এবং আমি। দুই প্রজন্মের দুই নির্মাতা। অনেক কথা বলেছি চাষী ভাই সম্পর্কে। কিন্তু চাষী ভাই আরও বেশি বলেছেন আমার সম্পর্কে। ওই অনুষ্ঠানের আগে আমার একটা চলচ্চিত্র সাতটি ক্যাটাগরিতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিল— ১. শ্রেষ্ঠ কাহিনি; ২. শ্রেষ্ঠ সংলাপ; ৩. শ্রেষ্ঠ নায়ক; ৪. শ্রেষ্ঠ নায়িকা; ৫. শ্রেষ্ঠ গায়ক; ৬. শ্রেষ্ঠ গায়িকা এবং ৭. শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক। চাষী ভাই সেই প্রসঙ্গ টেনে বললেন, ‘আশ্চর্য ঘটনা, একজন বাবুর্চি ১০ রকমের রান্না করলেন, সব আইটেম অপূর্ব, কিন্তু বাবুর্চিটা ভালো না কেন?’
তিনি বুঝিয়েছেন যে, আমার চলচ্চিত্রটি এতগুলো ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠ হয়েছে পরিচালক এবং ছবিটা কেন শ্রেষ্ঠ নয়! ওই বছর (২০১০) শ্রেষ্ঠ ছবি এবং শ্রেষ্ঠ পরিচালকের পুরস্কার নিয়ে গেছে চ্যানেল আই। চাষী ভাই কিন্তু চ্যানেল আইয়ের অনেক ছবি বানিয়েছেন, চ্যানেল আইয়ের সঙ্গে তার অনেক ভালো সম্পর্ক অথচ তিনি ন্যায্য কথাটা বলতে একটুও দ্বিধা করলেন না। এমনই ছিলেন চাষী ভাই। দোষ-গুণেই নাকি মানুষ। কিন্তু কোনো দিন আমাদের চলচ্চিত্রের মানুষকে চাষী ভাইয়ের কোনো দোষ বলতে শুনিনি।
পরপারে ভালো থাকুন চাষী ভাই। আবারও আপনাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা।
লেখক : চলচ্চিত্র পরিচালক
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে