সংগৃহীত ছবিবিশ্বজুড়ে বহুল ব্যবহৃত ওয়েব প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপিতে (PHP) দুটি অত্যন্ত গুরুতর নিরাপত্তাত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক সাইবার অঙ্গনে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সম্ভাব্য হ্যাকিং ও ডেটা চুরি ঠেকাতে নেদারল্যান্ডস, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স ও ডেনমার্কসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গুরুত্বপূর্ণ পোটাল ও অনলাইন সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
সাইবার বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রাথমিক পর্যায়ের সাইবার হামলা শুরু হয়েছে।
গত মঙ্গলবার পিএইচপি কর্তৃপক্ষ এই মারাত্মক ত্রুটির কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে এবং বুধবার (২১ অক্টোবর) তা সংশোধনে হালনাগাদ (Updated) সংস্করণ প্রকাশ করে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসএ) ও যুক্তরাজ্যের জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্রসহ ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের শীর্ষ নিরাপত্তা সংস্থাগুলো তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা হালনাগাদ ইনস্টল করার পরামর্শ দিয়েছে।
সংস্থাগুলোর মতে, দ্রুত সময়ের মধ্যে ত্রুটি সংশোধন করা সম্ভব না হলে সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট ও অনলাইন ব্যবস্থা পুরোপুরি বন্ধ রাখা উচিত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কম্পিউটার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম (CERT-EU) জানিয়েছে, এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দূর থেকেই ক্ষতিকর কোড চালিয়ে সার্ভারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া, ডেটাবেজে অননুমোদিত প্রবেশ কিংবা ক্ষতিকর সফটওয়্যার ইনস্টল করা সম্ভব।
নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি এড়াতে নেদারল্যান্ডসে সরকারি পোর্টাল ‘ওভারহেইড.এনএল’ রটারডাম বন্দর, জাতীয় ফুটবল সংস্থা (কেএনভিবি), কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও কয়েকটি হাসপাতালের ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। ফিনল্যান্ডের সরকারি তথ্যপ্রযুক্তি সেবা প্রদানকারী সংস্থা ‘ভালতোরি’ তাদের নেটওয়ার্কের বিভিন্ন ওয়েবসেবা স্থগিত করেছে।
একইভাবে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্থানীয় প্রশাসনের ওয়েবসাইটগুলো বন্ধ রেখেছে এবং ডেনমার্কের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘কমবিট’ তাদের জাতীয় স্কুল যোগাযোগ প্ল্যাটফর্মসহ বেশ কিছু অনলাইন সেবা স্থগিত করেছে। এমনকি যুক্তরাজ্যের এডিনবরা কাউন্সিল এবং বিবিসির ‘ডক্টর হু’ ও ‘দ্য ট্রেইটরস’ অনুষ্ঠানের নির্দিষ্ট কিছু ওয়েবপেজেও সাময়িক বিভ্রাট দেখা গেছে।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ‘ক্যালিফ’ ও ‘উইজ’-এর গবেষকেরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তায় পিএইচপির এই দীর্ঘদিনের গোপন দুর্বলতা শনাক্ত করেন। প্রতিষ্ঠান দুটির দাবি, এ ত্রুটিগুলো এক দশকেরও বেশি সময় ধরে শনাক্তহীন অবস্থায় ছিল।
‘উইজ’ জানিয়েছে, উন্নত এআই মডেল ব্যবহার করে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে হামলার কৌশল তৈরি করা সম্ভব। তারা ধারণা করছে, বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেটের প্রায় ৭০ শতাংশ অবকাঠামো এই ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। প্রযুক্তি জায়ান্ট ওপেনএআই এক ব্লগ পোস্টে বিষয়টিকে বর্তমান সময়ের অন্যতম ভয়াবহ নিরাপত্তা সংকট বলে অভিহিত করেছে।
ওয়েব প্রযুক্তি পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান ডব্লিউথ্রিটেকস এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে যেসব ওয়েবসাইটের প্রোগ্রামিং ভাষা শনাক্ত করা যায়, তার প্রায় ৭৫ শতাংশই পিএইচপি-নির্ভর। বহুল জনপ্রিয় কন্টেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ‘ওয়ার্ডপ্রেস’ দিয়ে পরিচালিত বিশ্বের প্রায় ৪৩ শতাংশ ওয়েবসাইটও পিএইচপির ওপর ভিত্তি করে নির্মিত।
এছাড়া দ্রুপাল, জুমলা ও ম্যাজেন্টার মতো প্ল্যাটফর্মগুলো পিএইচপি ব্যবহার করায় বিশ্বের অধিকাংশ সরকারি পোর্টাল, সংবাদমাধ্যম, ই-কমার্স ও করপোরেট সাইট এখন সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সোফোসের কাউন্টার থ্রেট ইউনিটের বিশেষজ্ঞ ডন স্মিথ জানান, হ্যাকারদের কাছে এখন এটি প্রধান লক্ষ্যবস্তু। শুধু নিরাপত্তা হালনাগাদ ইনস্টল করাই যথেষ্ট নয়, কোনো প্রতিষ্ঠানের কোন কোন জায়গায় পিএইচপি ব্যবহৃত হচ্ছে তা শনাক্ত করাও বড় চ্যালেঞ্জ।
ক্লাউডফ্লেয়ারের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ডেন কেইনেখট জানিয়েছেন, ক্ষতিকর ট্রাফিক ঠেকাতে তারা ফায়ারওয়ালের সুরক্ষাব্যবস্থা হালনাগাদ করছেন।
সিইআরটি-ইউ সতর্ক করেছে যে ২০০৪ সালে প্রকাশিত পিএইচপি ৫ থেকে শুরু করে পরবর্তী সংস্করণগুলোও ঝুঁকিতে রয়েছে। পিএইচপি ফাউন্ডেশন ৮ দশমিক ১ বা তার আগের সংস্করণ ব্যবহারকারীদের অবিলম্বে সর্বশেষ সংস্করণে উন্নীত হতে এবং সার্ভারে ইতোমধ্যেই কোনো অনুপ্রবেশ ঘটেছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছে।
সময়ের আলো/জোই