মঙ্গলের চাঁদ থেকে মাটি আনবে জাপান

সময়ের আলো ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে ফিরবে মাত্র ১০ গ্রাম ধুলো, মাটি আর পাথরের টুকরা। পরিমাণে এক চিমটির চেয়ে কিছুটা বেশি মনে হলেও

2026-10-22T02:27:01+00:00
2026-10-22T02:28:26+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬,
৬ কার্তিক ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
মঙ্গলের চাঁদ থেকে মাটি আনবে জাপান
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ২:২৭ এএম  আপডেট: ২২.১০.২০২৬ ২:২৮ এএম
মঙ্গলের উপগ্রহ ফোবোস থেকে নমুনা সংগ্রহের লক্ষ্যে জাপানের এমএমএক্স অভিযানে যুক্ত বিজ্ঞানী ও গবেষকরা। ছবি : জাক্সা
মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে ফিরবে মাত্র ১০ গ্রাম ধুলো, মাটি আর পাথরের টুকরা। পরিমাণে এক চিমটির চেয়ে কিছুটা বেশি মনে হলেও এই সামান্য নমুনাই খুলে দিতে পারে সৌরজগতের শুরুর দিকের ইতিহাসের নতুন অধ্যায়। নমুনাগুলো আসবে মঙ্গলগ্রহের উপগ্রহ ফোবোস থেকে। উপগ্রহটি দেখতে অনেকটা আলুর মতো— আকারে ছোট, পৃষ্ঠজুড়ে গর্ত আর এবড়োখেবড়ো ভূপ্রকৃতি। কিন্তু বিজ্ঞানীদের কাছে এর গুরুত্ব বিপুল। কারণ, ফোবোসের জন্ম কীভাবে হয়েছিল, তা নিয়ে এখনও নিশ্চিত কোনো উত্তর নেই। সূত্র : জাক্সা, আরস টেকনিকা।

সেই রহস্যের সন্ধানেই জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা জাক্সা ২০ অক্টোবর মঙ্গল উপগ্রহ অনুসন্ধান অভিযান বা এমএমএক্স মহাকাশযান উৎক্ষেপণ করেছে। দক্ষিণ জাপানের তানেগাশিমা মহাকাশকেন্দ্র থেকে এইচথ্রি রকেটে চড়ে যাত্রা শুরু করে প্রায় পাঁচ মেট্রিক টন ওজনের যানটি। ৫৭ কোটি ৮০ লাখ ডলারের এই আন্তর্জাতিক অভিযানের লক্ষ্য শুধু মঙ্গলের দুই উপগ্রহ ফোবোস ও ডেইমোসকে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করা নয়; ফোবোসের মাটি সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনাও। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩১ সালে সেই নমুনা পৃথিবীতে পৌঁছানোর কথা।

এখন পর্যন্ত মঙ্গলগ্রহ কিংবা তার উপগ্রহ থেকে কোনো নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। গ্রহাণু থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ফেরানোর অভিজ্ঞতা অবশ্য জাপানের রয়েছে। হায়াবুসা ও হায়াবুসা-২ অভিযানে গ্রহাণুর নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনেছিল দেশটি। এবার সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আরও দূরের ও জটিল এক অভিযানে নামছে জাক্সা। সফল হলে মঙ্গলের উপগ্রহ থেকে নমুনা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে এটি হবে বিশ্বের প্রথম অভিযান।

দুটি উপগ্রহের জন্মরহস্য : মঙ্গলের দুটি প্রাকৃতিক উপগ্রহ— ফোবোস ও ডেইমোস। এদের মধ্যে ফোবোস বড়, তবে সেটিও পৃথিবীর চাঁদের তুলনায় অতি ক্ষুদ্র। এর দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচ্চতা আনুমানিক ২৭, ২২ ও ১৮ কিলোমিটার। মঙ্গলের পৃষ্ঠ থেকে মাত্র ছয় হাজার কিলোমিটারের মতো ওপরে ঘুরছে এটি। পৃথিবীর চাঁদ পৃথিবীকে যে গতিতে প্রদক্ষিণ করে, তার তুলনায় ফোবোসের গতি অনেক দ্রুত; মঙ্গলকে দিনে প্রায় তিনবার প্রদক্ষিণ করে উপগ্রহটি।


এই দুই উপগ্রহের উৎপত্তি নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মূলত দুটি ধারণা রয়েছে। প্রথমটি হলো, ফোবোস ও ডেইমোস একসময় গ্রহাণুপুঞ্জের অংশ ছিল। মঙ্গলের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় গ্রহটির মহাকর্ষীয় টানে সেগুলো আটকে পড়ে কক্ষপথে চলে আসে। দ্বিতীয় ধারণা অনুযায়ী, সুদূর অতীতে বড় কোনো মহাজাগতিক বস্তু মঙ্গলে আছড়ে পড়েছিল। সেই ভয়াবহ সংঘর্ষে ছিটকে যাওয়া পাথর ও ধুলাবালু থেকে পরে তৈরি হয় উপগ্রহ দুটি।

দূর থেকে তোলা ছবি, পৃষ্ঠের রং, গঠন ও অন্যান্য পরিমাপ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা কিছু সূত্র পেয়েছেন। কিন্তু তাতে বিতর্কের অবসান হয়নি। ফোবোস দেখতে গ্রহাণুর মতো হলেও এর কক্ষপথ ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে এমন প্রশ্ন রয়েছে, যার উত্তর শুধু দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করে পাওয়া কঠিন। পৃথিবীর গবেষণাগারে নমুনা এনে তার খনিজ, রাসায়নিক উপাদান ও গঠন বিশ্লেষণ করতে পারলে কোন ধারণাটি বেশি গ্রহণযোগ্য, তা বোঝা সহজ হবে।

অতি কম মাধ্যাকর্ষণে কঠিন পরীক্ষা : মঙ্গলকে কেন্দ্র করে মহাকাশযানটি ২০২৭ সালের আগস্টে পৌঁছানোর কথা। এরপর প্রায় তিন বছর মঙ্গলের আশপাশে থেকে দুই উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ করবে এমএমএক্স। তবে ফোবোসের কাছে যাওয়া সহজ হলেও সেখানে স্থিতিশীল কক্ষপথে থাকা কঠিন। এর মহাকর্ষ অত্যন্ত দুর্বল, আবার কাছেই থাকা মঙ্গলের টানও প্রভাব ফেলে। তাই মহাকাশযানটিকে এমন কক্ষপথে চালানো হবে, যেখান থেকে ফোবোসের কাছাকাছি গিয়ে পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় কাজ করা সম্ভব।

অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শুরু হবে ২০২৮ সালের শেষ দিকে অথবা ২০২৯ সালের শুরুতে। তখন মূল মহাকাশযান থেকে নামানো হবে ছোট চার চাকার রোভার আইডেফিক্স। এটি তৈরি করেছে ফ্রান্সের মহাকাশ সংস্থা সিএনইএস ও জার্মান মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ডিএলআর। বড় মাইক্রোওয়েভ ওভেনের কাছাকাছি আকারের এই রোভার ফোবোসের পৃষ্ঠে নেমে প্রায় ১০০ দিন চলাচল ও পরীক্ষা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

পৃথিবীর তুলনায় ফোবোসের মাধ্যাকর্ষণ এক হাজার ভাগের এক ভাগেরও কম। ফলে সেখানে গাড়ির মতো রোভার চালানোও বড় চ্যালেঞ্জ। ধাক্কা খেয়ে সেটি উল্টে যেতে পারে, আবার চলার সময় সামান্য বলেও প্রত্যাশার চেয়ে বেশি দূরে সরে যেতে পারে। তাই আইডেফিক্সের কাজ শুধু ছবি তোলা নয়; পৃষ্ঠের গঠন, মাটির বৈশিষ্ট্য ও চলাচলের উপযোগী জায়গা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে মূল মহাকাশযানের অবতরণের ঝুঁকি কমাতেও সাহায্য করা।

এরপর ফোবোসে নামার চেষ্টা করবে মূল মহাকাশযান। প্রয়োজনে দুটি অবতরণের মাধ্যমে নমুনা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এ কাজে থাকবে দুটি পৃথক ব্যবস্থা। একটি যন্ত্র মাটির ভেতরে ঢুকে সরু নলাকার নমুনা তুলবে। অন্য ব্যবস্থায় উচ্চচাপের গ্যাস ছুড়ে পৃষ্ঠের ধুলো ও ছোট কণা সংগ্রহের পাত্রে নেওয়া হবে। লক্ষ্য, অন্তত ১০ গ্রাম নমুনা সংগ্রহ করা। ফোবোসের অসম পৃষ্ঠ ও দুর্বল মহাকর্ষের কারণে অবতরণ এবং আবার মহাকাশে উঠে আসা— দুটিই হবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ।

ফোবোসের মাটিতে মিলতে পারে মঙ্গলের চিহ্ন : অভিযানটির আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হলো, ফোবোসের নমুনায় মঙ্গলেরই কিছু উপাদান পাওয়া যেতে পারে। মঙ্গলে গ্রহাণু আঘাত করলে সেখান থেকে পাথর ও ধুলো মহাকাশে ছিটকে পড়তে পারে। তার কিছু অংশ কাছের ফোবোসের গায়ে গিয়ে জমে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে নমুনাগুলো পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা শুধু ফোবোসের গঠন নয়, মঙ্গলের অতীত সম্পর্কেও কিছু সূত্র পেতে পারেন।

জাপানের নেতৃত্বাধীন এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থা নাসাসহ ইউরোপের বিভিন্ন সংস্থা প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি ও বৈজ্ঞানিক সহায়তা দিচ্ছে। নমুনা পরীক্ষা করা হবে জাপানের গবেষণাগারে; নাসার গবেষকরাও গবেষণার জন্য নমুনার অংশ পাবেন। ২০৩০ সালে পৃথিবীর উদ্দেশে ফেরার যাত্রা শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে মহাকাশযানটির। এক বছর পর অস্ট্রেলিয়ার নির্ধারিত এলাকায় একটি ক্যাপসুলে নমুনাগুলো অবতরণের কথা।

এত দীর্ঘ যাত্রার শেষে ১০ গ্রাম নমুনা হাতে পাওয়া মানেই সব প্রশ্নের উত্তর মিলে যাওয়া নয়। তবে তা ফোবোসের উৎপত্তি নিয়ে বিতর্ক মেটানোর পাশাপাশি মঙ্গলগ্রহ ও তার আশপাশের পরিবেশের ইতিহাস বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে। আরও বড় পরিসরে, গ্রহ ও উপগ্রহ কীভাবে তৈরি হয়, প্রাচীন সৌরজগতে বস্তু কীভাবে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে— এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেও কাজে আসতে পারে এই অভিযান।

দূরের এক ক্ষুদ্র উপগ্রহ থেকে সামান্য কিছু মাটি ফিরিয়ে আনার এই চেষ্টা তাই শুধু মহাকাশে নতুন জায়গায় পৌঁছানোর গল্প নয়। এটি সৌরজগতের জন্মের সময়কার ঘটনাগুলোর দিকে ফিরে তাকানোর এক সুযোগ— যেখানে কয়েক গ্রাম ধুলোর মধ্যেও লুকিয়ে থাকতে পারে কয়েকশ কোটি বছরের ইতিহাস।


সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে
  বিষয়:   মঙ্গল  চাঁদ  মাটি  জাপান 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: