সংগৃহীত ছবি মাদারীপুরের শিবচরে ২০২৫ সালে ২ হাজার ৪৩১টি বিয়ে নিবন্ধিত হয়েছে। একই সময়ে নিবন্ধিত হয়েছে ১ হাজার ২৩৭টি বিবাহবিচ্ছেদ। বিয়ে ও বিচ্ছেদের এই পরিসংখ্যানের পাশাপাশি দাম্পত্য সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পেছনে উঠে আসছে পারিবারিক কলহ, অবিশ্বাস, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক এবং প্রবাসজীবনের দূরত্বের মতো নানা বিষয়। স্থানীয় ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যেও এসব কারণের কথা উঠে এসেছে।
জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাদারীপুর জেলায় মোট ৮ হাজার ১০৬টি বিয়ে নিবন্ধিত হয়েছে। একই সময়ে বিবাহবিচ্ছেদ নিবন্ধিত হয়েছে ৫ হাজার ৫২১টি। উপজেলা অনুযায়ী, মাদারীপুর সদরে ২ হাজার ২২৬টি বিয়ে ও ২ হাজার ১৭৭টি বিচ্ছেদ, শিবচরে ২ হাজার ৪৩১টি বিয়ে ও ১ হাজার ২৩৭টি বিচ্ছেদ, কালকিনিতে ১ হাজার ৮২৮টি বিয়ে ও ৯২১টি বিচ্ছেদ এবং রাজৈরে ১ হাজার ৬২১টি বিয়ে ও ১ হাজার ৯৬টি বিচ্ছেদ নিবন্ধিত হয়েছে।
শিবচরের এক প্রবাসী ব্যক্তি জানান, দীর্ঘদিন বিদেশে থাকায় স্ত্রীর সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। দেশে ফিরে স্ত্রীর অন্য সম্পর্কে জড়ানোর প্রমাণ পেয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। এরপর তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি বলে জানান ওই ব্যক্তি।
এক নারী জানান, তার বিয়ের মাত্র ১৪ মাসের মাথায় সংসার ভেঙে যায়। স্বামীর অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি জানার পর তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক আর এগোয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
শিবচর সুজনের সভাপতি মো. আবুল খায়ের খান বলেন, বাল্যবিবাহ ও স্বামী-স্ত্রীর বয়সের বড় ব্যবধান দাম্পত্য সম্পর্কে জটিলতা তৈরি করতে পারে। শিবচরে প্রবাসী মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে কম বয়সী মেয়েদের সঙ্গে তুলনামূলক বেশি বয়সী প্রবাসী পুরুষের বিয়ে হয়। পরে স্বামী বিদেশে থাকায় দূরত্ব তৈরি হয়। বয়স ও মানসিক পরিপক্বতার পার্থক্য থেকেও সম্পর্কে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
হাফেজ মাওলানা রেজাউল করিম বলেন, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার অভাব, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ঘাটতি এবং দায়িত্ব পালনে অনীহা দাম্পত্য সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁর মতে, সংসার টিকিয়ে রাখতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিশ্বাস, ধৈর্য, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক সম্মান থাকা জরুরি।
মাদারীপুর জেলা জজ আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট হাবিবুর রহমান বলেন, বিবাহবিচ্ছেদসংক্রান্ত আইনি সহায়তা নিতে আসা অনেকের কাছ থেকেই পারিবারিক কলহ ও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কথা জানা যায়। তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এ ধরনের আইনি সহায়তা নিতে আসা মানুষের সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে। বিষয়টিকে উদ্বেগজনক বলে মনে করেন তিনি।
শিবচর উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা পূর্ণিমা কবিরাজ বলেন, বাল্যবিবাহ ও নারীর শিক্ষার অভাব দাম্পত্য জীবনে সংকট তৈরির অন্যতম কারণ হতে পারে। মেয়েদের দ্রুত বিয়ে দিয়ে দায়িত্ব শেষ করার মানসিকতা থেকে অভিভাবকদের বেরিয়ে আসতে হবে। নারীদের শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী করে তোলার পাশাপাশি বিয়ের ক্ষেত্রে বয়স, মানসিক পরিপক্বতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে বিয়ের আগে দুজনের সম্মতি, বয়স ও মানসিক পরিপক্বতা বিবেচনার পাশাপাশি বিয়ের পর পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও দায়িত্বশীল আচরণ গুরুত্বপূর্ণ। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নারীর শিক্ষা এবং পারিবারিক সমস্যার সমাধানে সচেতনতা বাড়ানোও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
সময়ের আলো/জোই