কুয়াশার মায়াবী চাদরে কাঞ্চনজঙ্ঘা। ছবি : সময়ের আলো ভোরের আলো ফোটার আগেই তেঁতুলিয়া ডাকবাংলোর পিকনিক কর্নারে অপেক্ষমাণ হাজার হাজার মানুষ। সবার চোখ স্থির উত্তরের দিগন্তে—যদি একবার দেখা মেলে তুষারশুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘার! কিন্তু শরতের মেঘ আর কুয়াশার মায়াবী চাদর যেন কিছুতেই সরছে না। গত এক সপ্তাহ ধরে এভাবেই পর্যটকদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ এই পর্বতশৃঙ্গ। বহুল প্রতীক্ষিত পাহাড়টি অধরা থেকে যাওয়ায় কিছুটা বিষণ্নতা থাকলেও, তেঁতুলিয়ার সীমান্তঘেঁষা প্রকৃতি আর সবুজের সমারোহে মুগ্ধ হয়ে ফিরছেন ভ্রমণপিপাসুরা।
শারদীয় দুর্গাপূজা আর সাপ্তাহিক ছুটির লম্বা অবসর কাটাতে এখন পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হিমালয় কন্যা পঞ্চগড়। কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার মূল মৌসুম শুরু হওয়ায় দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসছেন উত্তরের এই শেষ জনপদে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকালে তেঁতুলিয়ার বিভিন্ন পর্যটন স্পটে গিয়ে দেখা যায় তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ফজরের আজানের পর থেকেই পর্যটকরা জড়ো হচ্ছেন ডাকবাংলো, বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট, শালবাহান ও মাঝিপাড়া এলাকায়। তবে গত সাত দিন ধরে কুয়াশার ঘন স্তরে ঢাকা পড়ে আছে কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপালি চূড়া। আকাশ পরিষ্কার না হওয়ায় এবার পূজার ছুটিতে আসা অনেককেই ফিরতে হচ্ছে কিছুটা আক্ষেপ নিয়ে।
তুষারশুভ্র পাহাড় দেখা না গেলেও তেঁতুলিয়ার অন্যান্য রূপ পর্যটকদের মন ভরিয়ে দিচ্ছে। দিগন্তজোড়া সমতলের সবুজ চা বাগান, স্বচ্ছতোয়া মহানন্দা নদী থেকে পাথর উত্তোলনের দৃশ্য আর ওপারে ভারতের কাঁটাতারের ওপারের প্রকৃতি—সব মিলিয়ে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। শারিয়ালজোত, দর্জিপাড়া বা কাজীপাড়ার নিরিবিলি গ্রাম্য মেঠো পথগুলো পর্যটকদের দিচ্ছে অনাবিল প্রশান্তি।
রাজশাহী থেকে আসা পর্যটক দম্পতি আলমাস ও রেবেকা জানান, কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতেই এসেছিলাম। প্রকৃতি সহায় না হওয়ায় পাহাড় দেখা হয়নি, কিন্তু তেঁতুলিয়ার শান্ত পরিবেশ আর মানুষের আতিথেয়তা আমাদের মুগ্ধ করেছে। পরিবার নিয়ে বেশ ভালো সময় কাটছে।
নীলফামারী থেকে আসা মিলন রহমান বলেন, ‘হালকা আবছা দেখা গেলেও পূর্ণ তৃপ্তি মেলেনি। তবে মহানন্দার তীরে দাঁড়িয়ে ওপারে ভারতের পাহাড় আর ওপারের মানুষের জীবন দেখাটাও এক দারুণ রোমাঞ্চ।’
পর্যটকদের এই উপচে পড়া ভিড়ে তেঁতুলিয়ার অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। এলাকার প্রায় প্রতিটি রিসোর্ট, হোটেল ও হোমস্টে এখন কানায় কানায় পূর্ণ। ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় ভ্যান ও অটোরিকশা চালকরা। রেস্তোরাঁগুলোতেও সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভিড় লেগেই আছে। সব মিলিয়ে পর্যটনকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলে এক বিশাল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্র নাথ রায় জানান, বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগে মেঘের ঘনঘটা এবং কুয়াশার উপস্থিতির কারণে কাঞ্চনজঙ্ঘা দৃশ্যমান হচ্ছে না। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, নভেম্বরের শুরুতে আকাশ মেঘমুক্ত ও ঝকঝকে হলে টানা কয়েক দিন ধরে কাঞ্চনজঙ্ঘার মোহনীয় রূপ আবারও পর্যটকদের তৃষ্ণা মেটাবে।
তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আনোয়ার হোসাইন জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ সর্বদা সজাগ রয়েছে। কোনো ধরনের হয়রানি বা প্রতারণা রোধে এবং পর্যটন স্পটগুলোতে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।
প্রকৃতির মর্জির ওপর নির্ভর করা এই শৈল্পিক দৃশ্য দেখার জন্য পর্যটকদের অপেক্ষা এখন নভেম্বরের সেই উজ্জ্বল রোদেলা সকালের জন্য। কাঞ্চনজঙ্ঘার মায়াবী হাতছানি দেখার আশা নিয়েই শেষ হচ্ছে এবারের পূজার পর্যটন উৎসব।
সময়ের আলো/জোই