পাবনার গাজনার বিল এখন কচুরিপানায় ছেয়ে গেছে। ছবি : সংগৃহীতপাবনার ‘শস্যভান্ডার’ হিসেবে পরিচিত গাজনার বিলজুড়ে এখন শুধুই কচুরিপানার জটলা। ফলে চলতি মৌসুমে বোনা আমন ধানের কাঙ্ক্ষিত ফলন না পাওয়ার শঙ্কায় ভুগছেন স্থানীয় কৃষকরা। কচুরিপানার এই আগ্রাসন শুধু ধানই নয়, আসন্ন শুকনো মৌসুমে পেঁয়াজ চাষেও বাধা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন তারা। সংকট নিরসনে কীটনাশক প্রয়োগের মতো সাময়িক পদক্ষেপ না নিয়ে স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
কচুরিপানা সরানোর বিষয়ে সুজানগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে সরকারিভাবে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় সংসদ সদস্যের নির্দেশনায় কৃষক, ছাত্র ও যুবসমাজ স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে কচুরিপানা সরানোর কাজ চলছে। ফসল উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তবে বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার কচুরিপানা কম রয়েছে বলে দাবি করেছেন সুজানগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মীর রাশেদুজ্জামান। তিনি বলেন, আমরা শুরু থেকেই কীটনাশক ব্যবহার করে কচুরিপানা ধ্বংসের চেষ্টা করেছি। অবশিষ্ট কচুরিপানা শুকনো মৌসুমে অপসারণ করা হবে।
এ বিষয়ে পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম প্রামাণিক বলেন, গাজনার বিলের কচুরিপানা অপসারণে কৃষি বিভাগের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি জমির মালিক ও স্থানীয়দেরও এগিয়ে আসতে হবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১০ হাজার হেক্টর আয়তনের গাজনার বিলে এ বছর আড়াই হাজার হেক্টর জমিতে বোনা আমন ধান আবাদ করা হয়েছে। বর্ষায় বিলে পানি বেশি থাকায় শুরুতেই ভালো ফলনের আশা করেছিলেন কৃষকরা। সাধারণত পানির গভীরতা বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমন ধানের গাছ বাড়ে। তবে একই সঙ্গে কচুরিপানার বংশ বাড়ায় ধানের স্বাভাবিক বৃদ্ধি থমকে গেছে। বর্তমানে বিলের প্রায় ৬ হাজার হেক্টর অংশের জমি কচুরিপানায় ছেয়ে গেছে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, প্রতি বছর বর্ষার আগে সরকারিভাবে কীটনাশক বা বিষ প্রয়োগ করে কচুরিপানা মারার চেষ্টা করা হয়। এতে সাময়িকভাবে কিছু এলাকার কচুরিপানা পচে নষ্ট হলেও বর্ষা নামলেই তা আবার আগের রূপ নেয়।
গাজনার বিল এলাকার সাধুপুর গ্রামের আমন চাষি গফুর বলেন, জমিতে এত কচুরিপানা জমেছে যে, আমরা নিজেরা চেষ্টা করেও সরাতে পারছি না। ধান গাছের ক্ষতি হচ্ছে। ফলন কম হওয়ার আশঙ্কায় আছি।
খয়রান এলাকার কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, কচুরিপানার কারণে বছরের পর বছর ধান ও পেঁয়াজ আবাদ ব্যাহত হচ্ছে। কৃষি বিভাগের উচিত এই সমস্যার স্থায়ী কোনো সমাধান বের করা।
একই উপজেলার উলাট গ্রামের কৃষক আলতাফ হোসেন পরামর্শ দিয়ে বলেন, বিষ দিয়ে সাময়িকভাবে না মেরে শুকনো মৌসুমে সরকারি প্রকল্প নিয়ে শ্রমিকের মাধ্যমে যদি বিল থেকে কচুরিপানা পুরোপুরি তুলে ফেলা হতো, তবে কৃষকের এই ভোগান্তি থাকত না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কচুরিপানা ধ্বংস করতে বিলে ব্যাপকভাবে কীটনাশক বা বিষ প্রয়োগের ফলে পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমতে পারে। এতে বিলের দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রজনন ও জৈববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ার শঙ্কা থেকে যায়। এ ক্ষেত্রে রাসায়নিক প্রয়োগের চেয়ে যান্ত্রিক বা কায়িক উপায়ে অপসারণই পরিবেশবান্ধব সমাধান।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, কচুরিপানা সম্পূর্ণ অপসারণ না করে এটিকে জৈব সার (কম্পোস্ট) বানানোর প্রক্রিয়ায়ও কাজে লাগানো যেতে পারে। শুকনো মৌসুমে বিলের কচুরিপানা তুলে স্তূপ করে রাখলে তা পচে ভালো মানের জৈব সার হতে পারে, যা পরবর্তী মৌসুমে পেঁয়াজ ও অন্যান্য সবজি চাষে সারের খরচ অনেক কমিয়ে দেবে।
এ বিষয়ে দোতলা কৃষি পদ্ধতির আবিষ্কারক কৃষিবিদ জাফর সাদেক বলেন, কচুরিপানা নিধনে নিয়ম মেনে যদি বিষ প্রয়োগ করা হয়, তবে মাছ বা জলজ প্রাণীর ক্ষতি হওয়ার তেমন আশঙ্কা নেই। তিনি বলেন, এই কচুরিপানা কৃষি ও কৃষকের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে। জমি ঢেকে থাকা কচুরিপানাগুলো তুলে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় জৈব সার তৈরি করা যেতে পারে। ভারতসহ বিভিন্ন দেশে এটি করা হয়।
সময়ের আলো/আতা