প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৩০ পিএম
ছাদবাগানে জাহিদ চৌধুরী। ছবি : সময়ের আলোচট্টগ্রামে ছাদবাগানে বিদেশি ও মিষ্টি জাতের ফলমূল চাষ করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন শৌখিন কৃষি উদ্যোক্তা সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের লতিফপুর এলাকার জাহিদ চৌধুরী। তার ভবনের ছাদে শোভা পাচ্ছে রাশিয়া, ইউক্রেন ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশের ১০ জাতের আঙুর, ৭ জাতের বিশ্বমানের আনার, ৪ জাতের মালবেরি এবং ২ জাতের ব্যতিক্রমী ট্যাং ফল। মূলত আঙুর ও আনারের উন্নত জাত সম্প্রসারণ নিয়েই তিনি বর্তমানে সবচেয়ে বেশি কাজ করছেন। পাশাপাশি তার ছাদে আরও হরেক রকমের দেশি-বিদেশি গাছপালা সমৃদ্ধ এক সুবিশাল সবুজ বাগান গড়ে উঠেছে। তার এই নিরলস প্রচেষ্টা ও অভাবনীয় সফলতা দেখে এলাকার অনেক সচেতন নাগরিকই এখন ছাদবাগান তৈরিতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন।
নিজের পথচলার শুরুর দিকের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়ে উদ্যোক্তা জাহিদ চৌধুরী জানান, শুরুতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানীয় নার্সারি থেকে চারা কিনে তিনি বারবার প্রতারণার শিকার হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে চারা বিক্রেতারা গাছের সঠিক জাত বা ফলন সম্পর্কে কিছুই বলতে পারত না। নার্সারি থেকে সংগ্রহ করা চারা থেকে ফল আসলে দেখা যেত আঙুরগুলো অত্যন্ত টক এবং আনারের ভেতরের বীজ বা দানা এত শক্ত ছিল যে, তা খাওয়ার উপযোগী থাকত না। তবে এই ব্যাবসায়িক প্রতারণায় থেমে না গিয়ে তিনি রাজশাহী ও নাটোরের নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে খাঁটি ও উন্নত জাতের কয়েকটি আঙুর ও আনারের চারা স্যাম্পল হিসেবে নিয়ে আসেন। টবে লাগানোর মাত্র এক বছরের মাথায় গাছে আসা ফলন ও তার দারুণ মিষ্টতা দেখে তিনি নিজেই তাজ্জব হয়ে যান। পরবর্তীতে আরও ব্যাপকভাবে এসব উন্নত চারা সংগ্রহ করতে শুরু করেন।
বাজার থেকে চড়া দামে রাসায়নিকযুক্ত ফল কিনে খাওয়ার কষ্ট দূর করতেই তিনি মূলত ঘরে ঘরে এই সুস্বাদু জাতগুলো ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। জাহিদ চৌধুরী বলেন, বর্তমানে খোলা বাজারে ৫০০ টাকা কেজি দরে আনার বা আঙুর অথবা মালটা কিনে খাওয়া সাধারণ পরিবারের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তবে প্রত্যেকের বসতবাড়ির আঙিনায় বা ছাদের ওপর যদি ২-৩টি ভালো জাতের আঙুর বা আনারের গাছ থাকে, তাহলে পরিচ্ছন্ন তাজা ফলের পুষ্টি চাহিদা মিটে যাবে এবং বাজার থেকে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে ফল কিনে খেতে হবে না।
বর্তমানে তার সংগ্রহে থাকা উন্নত মাতৃগাছ থেকে তিনি নিজেই সফলভাবে কলম চারা তৈরি করছেন এবং ইতোমধ্যেই বহু ছাদবাগানপ্রেমী তার কাছ থেকে জাত নিশ্চিত হয়ে চারা নিয়ে গিয়ে ছাদবাগান গড়ে তুলেছেন।
ছাদবাগানের এই ব্যতিক্রমী সফলতা ও গুরুত্ব সম্পর্কে সীতাকুণ্ডের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুমন দাস বলেন, জাহিদ চৌধুরীর এই ছাদবাগানটি আধুনিক নগর ও গ্রামীণ কৃষির জন্য একটি দারুণ অনুপ্রেরণা। তিনি যেভাবে ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগী হয়ে রাজশাহী-নাটোর থেকে খাঁটি জাত এনে নিজ ছাদে মানসম্পন্ন আঙুর ও আনারের ফলন ঘটিয়েছেন, তা প্রশংসনীয়। শহরাঞ্চলে দ্রুত সবুজ কমে যাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে ছাদবাগান কেবল পুষ্টিকর ও বিষমুক্ত ফলের চাহিদাই মেটায় না, বরং ভবনের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা, অক্সিজেন সরবরাহ বৃদ্ধি করা এবং সার্বিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের পক্ষ থেকে আমরা তার এই মানসম্মত চারার কলম তৈরি ও নতুনদের মাঝে চারা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রশংসনীয় উদ্যোগকে সর্বাত্মক কারিগরি পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করে যাচ্ছি।
ছাদ বাগানের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে এ ধরনের মিষ্টি ফলের চাষ যে সম্পূর্ণ সম্ভব, তা নিজের উদ্ভাবনী প্রচেষ্টায় প্রমাণ করে দিয়েছেন জাহিদ চৌধুরী। বর্তমানে নতুন উদ্যোক্তারা কেবল শখের বশে নয়, বরং পরিবারের পুষ্টির নিরাপত্তা ও সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করতেই তার পরামর্শে ছাদবাগানে ঝুঁকে পড়ছেন। জাহিদ চৌধুরীর মতো উদ্যোক্তাদের কারণে সীতাকুণ্ডজুড়ে ছাদবাগান আন্দোলন এখন নতুন দিগন্তে রূপ লাভ করছে।
সময়ের আলো/এনএন