সড়ক-মহাসড়কের কোথাও না কোথাও দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন মানুষ। ছবি : সংগৃহীত ময়মনসিংহের মহাসড়কগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনা কোনোভাবেই থামছে না। প্রায় প্রতিদিন সড়ক-মহাসড়কের কোথাও না কোথাও দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন মানুষ। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়ে অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করছেন। আবার প্রাণহানির ঘটনায় স্বজন হারাচ্ছে বহু পরিবার। কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না সড়ক দুর্ঘটনা। গত দেড় বছরে এ জেলায় ৩৭৪টি দুর্ঘটনায় ৩৬৩ জন নিহত ও ৪১০ জন আহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় হতাহতদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে সরকারের তহবিল থেকে ১০ কোটি ৮১ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।
মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচল নিষিদ্ধ হলেও বিভিন্ন সড়কে নিয়মিত চলছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও অন্যান্য তিন চাকার যানবাহন। ময়মনসিংহের ত্রিশালের বালিপাড়া, বইলর চেলেরঘাট, শম্ভুগঞ্জ-মনতলা এবং ভালুকাসহ বিভিন্ন এলাকা দুর্ঘটনাপ্রবণ হয়ে উঠেছে।
গত ২ অক্টোবর শুক্রবার দুপুরে ময়মনসিংহ নগরীর আকুয়া বাইপাস এলাকায় বাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে সাতজন নিহত হন। চালকসহ নিহত সবাই অটোরিকশাটির যাত্রী ছিলেন। চলতি বছরে জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় এটিই সর্বোচ্চ প্রাণহানির ঘটনা। মহাসড়কে বেপরোয়া যান চলাচলের পাশাপাশি তিন চাকার সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মাহিন্দ্র অটোরিকশা, ইজিবাইক ও রিকশার অবাধ চলাচল সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়ের তথ্যমতে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ময়মনসিংহে ১৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ১৪৩ জন নিহত ও ১৪১ জন আহত হয়েছেন। এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে ১২৫টি দুর্ঘটনায় ২২০ জন নিহত ও ২৬৯ জন আহত হয়েছিলেন। আহতদের মধ্যে অনেকে এখনো নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন। আবার অনেকেই পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। এসব দুর্ঘটনার বেশির ভাগের জন্যই দায়ী মহাসড়কে অটোরিকশা চলাচল। এসব যানবাহনের অধিকাংশেরই ফিটনেস সনদ নেই। চালকদেরও নেই বৈধতা।
পরিবহণ
দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে বিআরটিএর ময়মনসিংহ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আনিছুর রহমান বলেন, অটোরিকশাগুলোর লাইসেন্স এক বছরের জন্য দেওয়া হয়। কিন্তু নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেলেও বিভিন্ন জটিলতা ও সীমাবদ্ধতার কারণে সেগুলোর ফিটনেস পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না। এ ছাড়া একটি অটোরিকশায় তিনজন যাত্রী বহনের নিয়ম থাকলেও চালকেরা আইন অমান্য করে পাঁচ থেকে ছয়জন যাত্রী বহন করেন।
এসব সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতদের পরিবারের মধ্যে বিআরটিএ ট্রাস্টি বোর্ডের ময়মনসিংহ সার্কেল থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ১০ কোটি ৮১ লাখ টাকার চেক বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালে ৮০ লাখ, ২০২৫ সালে এক কোটি ৭৭ লাখ এবং ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত আট কোটি ২৪ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
জেলার বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, আঞ্চলিক সড়ক ও জাতীয় মহাসড়কে বাস-ট্রাকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দ্রুতগতিতে চলছে লাইসেন্স ও ফিটনেসবিহীন থ্রি-হুইলার, ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইঞ্জিনচালিত ভ্যানসহ বিভিন্ন অবৈধ যানবাহন। এসব যানবাহন সড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) ময়মনসিংহ শাখার সভাপতি আব্দুল কাদের চৌধুরী বলেন, মহাসড়কে এ ধরনের অটোরিকশা চলাচল নিষিদ্ধ হলেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে পুরো সড়কই এখন এসব নিষিদ্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনের দখলে। এসব যানবাহনের চালকদের দক্ষতারও অভাব রয়েছে। কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সড়ক দুর্ঘটনা আরও বাড়বে।
জেলায় মাত্র সাড়ে চার হাজার অটোরিকশার লাইসেন্স দেওয়া হলেও বাস্তবে মহাসড়কগুলোতে এর কয়েক গুণ বেশি যানবাহন চলছে। চলাচলকারী এসব যানবাহনের ৮০ শতাংশই ফিটনেসবিহীন। তবে অচিরেই জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় সচেতনতামূলক প্রচারাভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। পাশাপাশি চালক ও অটোরিকশার লাইসেন্স নবায়নের বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বিআরটিএর এক কর্মকর্তা।
পাটগুদাম ব্রিজ মোড়, টাউন হল ও বাইপাস মোড়ের সিএনজি স্ট্যান্ডে কয়েকজন অটোরিকশাচালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দিন দিন অটোরিকশার সংখ্যা বাড়ায় চালকদের মধ্যে ভাড়া নিয়ে প্রতিযোগিতা করতে হয়। এ কারণে তাঁরা মহাসড়কে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানোর চেষ্টা করেন। অনেক সময় বেপরোয়া গতিতে চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। চালক কিংবা গাড়ির লাইসেন্সের বিষয়ে জানতে চাইলে তাঁরা জানান, মাসোহারা দেওয়ার মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের ‘ম্যানেজ’ করে গাড়ি চালান।
সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধের বিষয়ে সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল আলম বলেন, মহাসড়কগুলোতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে একটানা অভিযান চালানো গেলে চালক ও মালিকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ত। এ ছাড়া সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের মাধ্যমে মহাসড়কগুলোতে সাইনবোর্ড ও রোড সাইন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থান ও বাঁকগুলোতে বিশেষ সতর্কতামূলক নির্দেশনাও স্থাপন করা হয়েছে।
ময়মনসিংহ জেলা ট্র্যাফিক পরিদর্শক মো. গোলাম মাওলা তালুকদার বলেন, ‘লোকবল সংকট ও গণসচেতনতার অভাবে মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া ডাম্পিং ইয়ার্ড না থাকায় জব্দ করা যানবাহন রাখারও সংকট রয়েছে।’
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘মহাসড়কে অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে আমাদের চেষ্টা চলছে। আইন না মেনে চলাচলের কারণে নিয়মিত মামলা দেওয়া হচ্ছে। মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোসহ অবৈধ যানবাহনের চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করতে আমাদের চেষ্টার কোনো কমতি নেই।’
সময়ের আলো/এনএন